বৃহস্পতিবার ৩০শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

Advertise with us

আধুনিকতার ছোঁয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে আঞ্চলিক ভাষা

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ১৯৮ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

আধুনিকতার ছোঁয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে আঞ্চলিক ভাষা

একসময় গ্রামবাংলার পথে-ঘাটে, হাটে-বাজারে, উঠানের আড্ডায় শোনা যেত নিজস্ব টানে বলা কথা। আঞ্চলিক ভাষা, শব্দ আর উচ্চারণে ভরা ছিল মানুষের দৈনন্দিন জীবন। আজ সেই জায়গা দখল করছে প্রমিত বাংলা আর ইংরেজি মেশানো আধুনিক ভাষা। স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও নগরমুখী সংস্কৃতির প্রভাবে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে আঞ্চলিক ভাষার স্বকীয়তা। প্রশ্ন উঠছে—এই হারিয়ে যাওয়ার পথে আমরা কতটা সচেতন?

আগে পরিবারের ভেতরে, পাড়ার আড্ডায় কিংবা মাঠে-ঘাটে স্বাভাবিকভাবেই ব্যবহৃত হতো আঞ্চলিক শব্দ। এখন শিশু-কিশোরদের মুখে শোনা যায় প্রমিত বাংলা কিংবা ইংরেজি মেশানো ভাষা। অনেকেই আঞ্চলিক টানে কথা বলতে সংকোচ বোধ করছেন—ভেবে নিচ্ছেন, এতে ‘গ্রাম্য’ মনে হতে পারে। বরেন্দ্র অঞ্চলের এক প্রবীণ বলেন, ‌‘আগে নাতি-নাতনিরা আমাদের ভাষায় কথা বলতো। এখন তারা টিভি আর মোবাইল দেখে শিখছে অন্য ভাষা। আমাদের কথাগুলো বুঝলেও ব্যবহার করে না।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিকতা গ্রহণ করাই স্বাভাবিক। কিন্তু সমস্যাটা তৈরি হয় তখনই; যখন আধুনিকতার নামে শেকড়কে অস্বীকার করা হয়। আঞ্চলিক ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এতে জড়িয়ে আছে ইতিহাস, লোকজ জ্ঞান, হাসি-কান্না ও জীবনবোধ। টেলিভিশন অনুষ্ঠান, সামাজিক মাধ্যমের কনটেন্ট এবং শিক্ষাব্যবস্থায় প্রমিত ভাষার আধিপত্য বাড়ার ফলে আঞ্চলিক ভাষাগুলো ক্রমেই কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। নতুন প্রজন্ম আঞ্চলিক ভাষাকে দেখছে ‘অপ্রয়োজনীয়’ বা ‘পিছিয়ে থাকা’ হিসেবে।

স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ এখন শহুরে ভাষাভঙ্গি অনুসরণ করছেন। অনলাইন কনটেন্ট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকেই তারা গড়ে তুলছেন ভাষার অভ্যাস। ফলে বাড়িতে আঞ্চলিক ভাষা শুনলেও নিজেরা তা ব্যবহার করছেন কম। কলেজ শিক্ষার্থী লামিয়া বলেন, ‘বন্ধুদের সঙ্গে আঞ্চলিক ভাষায় কথা বললে অনেকে হাসাহাসি করেন। তাই আমরা প্রমিত ভাষায় কথা বলতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি।’ এই মানসিকতাই আঞ্চলিক ভাষাকে ধীরে ধীরে ঠেলে দিচ্ছে বিস্মৃতির দিকে।

এই পরিস্থিতির দায় শুধু তরুণ প্রজন্মের নয়। পরিবারে আঞ্চলিক ভাষা চর্চার ঘাটতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লোকজ সংস্কৃতির অনুপস্থিতি এবং গণমাধ্যমে আঞ্চলিক ভাষার সীমিত ব্যবহার—সব মিলিয়েই সংকট গভীর হচ্ছে। একদিকে অভিভাবকেরা সন্তানদের ‘স্মার্ট’ করে গড়ে তুলতে গিয়ে আঞ্চলিক ভাষা বাদ দিচ্ছেন; অন্যদিকে গণমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে স্থানীয় ভাষার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা তৈরি হচ্ছে না।

ভাষাবিদরা সতর্ক করছেন, আঞ্চলিক ভাষা হারিয়ে গেলে হারাবে একটি অঞ্চলের পরিচয়। লোককথা, প্রবাদ, গান, ছড়া—সবই টিকে আছে আঞ্চলিক ভাষার ভেতর দিয়ে। ভাষা হারালে সেই সাংস্কৃতিক ভান্ডারও ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আঞ্চলিক ভাষা টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন সচেতন উদ্যোগ। পরিবারে শিশুদের সঙ্গে আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলা, স্কুলে লোকজ সংস্কৃতি ও ভাষার চর্চা বাড়ানো, গণমাধ্যমে স্থানীয় ভাষাভিত্তিক অনুষ্ঠান এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আঞ্চলিক ভাষার ইতিবাচক ব্যবহার বাড়ানো জরুরি।

আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা অবশ্যই প্রয়োজন কিন্তু নিজের শেকড় ভুলে নয়। প্রমিত ভাষা শিখবো, ইংরেজিও ব্যবহার করবো। তবু পাশাপাশি আঞ্চলিক ভাষাকেও বাঁচিয়ে রাখবো সব সময়। কারণ ভাষাই আমাদের পরিচয়, ভাষাতেই বেঁচে থাকে একটি জনপদের আত্মা।

লেখক: শিক্ষার্থী, রাজশাহী কলেজ।

Facebook Comments Box
Advertise with us

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

Advertise with us
আরও
Advertise with us
সম্পাদক ও প্রকাশক
মো: সামসুদ্দীন চৌধুরী
সম্পাদকীয় কার্যালয়