
নিজস্ব প্রতিবেদক | মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬ | প্রিন্ট | ০ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

একটি সিরিঞ্জ, একাধিক ব্যবহারকারী আর সেই অসতর্কতাই বাড়িয়ে দিচ্ছে হেপাটাইটিস বি সংক্রমণের ঝুঁকি। মাদক গ্রহণের মুহূর্তের অসতর্কতা অনেকের জীবনে ডেকে আনছে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি। কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় একই সিরিঞ্জ একাধিক ব্যক্তি ব্যবহার করায় রক্তের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এই ভাইরাস। চিকিৎসকরা বলছেন, নিরাপদ পদ্ধতি অনুসরণ না করা ও চিকিৎসায় অনীহা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হেপাটাইটিস ‘বি’ একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা মূলত রক্ত ও শরীরের বিভিন্ন তরলের মাধ্যমে ছড়ায়। একই সিরিঞ্জ একাধিক ব্যক্তি ব্যবহার করলে একজন আক্রান্ত ব্যক্তির রক্তের মাধ্যমে অন্যদের শরীরে সহজেই ভাইরাস প্রবেশ করতে পারে।
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হেপাটোলজি বিভাগের চিকিৎসকদের ভাষ্যমতে, ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারীদের মধ্যে হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ সংক্রমণের হার সাধারণ মানুষের তুলনায় অনেক বেশি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা দীর্ঘদিন রোগটি সম্পর্কে জানতে পারেন না। পরে লিভারের জটিলতা, এমনকি লিভার সিরোসিস বা লিভার ক্যান্সারের মতো মারাত্মক সমস্যাও দেখা দেয়।
মো. আনিস (ছদ্মনাম) একজন গার্মেন্টসকর্মী ছিলেন। বাড়ি লাকসাম উপজেলায়। একটি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় পা ভেঙে যায় তার। পরে কুমিল্লা শহরের একটি হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি। সেখানে অপারেশন হয় তার। এরপর থেকে পেথেডিনের প্রতি আগ্রহ বেড়ে যায় তার। পরে স্থানীয়ভাবে মাদক সংগ্রহ করে সেটি সিরিঞ্জের মাধ্যমে নিতে শুরু করেন। একপর্যায়ে একই মাদকে আসক্ত কুমিল্লা নগরীর এক যুবকের সঙ্গে পরিচয় হয় তার। পরে দুজনে ভাগাভাগি করে মাদক নিতেন তারা। এভাবে অনেকদিন চলার পর একপর্যায়ে পেটব্যথায় ভোগা শুরু করেন আনিস। বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসেন চিকিৎসার জন্য। চিকিৎসক তাকে হেপাটাইটিস ‘বি’ পজিটিভ রোগী হিসেবে শনাক্ত করেন। এখন নিয়মিত চিকিৎসা ও পরামর্শ নিচ্ছেন আনিস।
আনিস বলেন, পরীক্ষায় জানতে পারি আমি হেপাটাইটিস ‘বি’-তে আক্রান্ত। আগে বিষয়টি সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না। ইনজেকশন ভাগাভাগি করে মাদক নেওয়ার ফলে এমনটা হয়েছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, সিরিঞ্জে মাদক গ্রহণকারীর সংখ্যা কম হলেও তাদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি। কারণ একটি অনিরাপদ সিরিঞ্জ একাধিক মানুষের শরীরে ভাইরাস ছড়িয়ে দিতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রায় ২৪ কোটির বেশি মানুষ দীর্ঘমেয়াদি হেপাটাইটিস ‘বি’ সংক্রমণে আক্রান্ত। প্রতি বছর ১১ লাখ মানুষ হেপাটাইটিস ‘বি’ জনিত লিভারের জটিলতায় মারা যান। এদের মধ্যে ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারীরা উচ্চ ঝুঁকির জনগোষ্ঠী হিসেবে বিবেচিত।
কুমিল্লার মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. শহীদুল্লাহর মতে, চিকিৎসকদের পরামর্শ হলো কোনো কারণেই একই সিরিঞ্জ ব্যবহার করা যাবে না। হেপাটাইটিস ‘বি’ টিকা গ্রহণ করতে হবে। মাদকাসক্তদের দ্রুত চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের আওতায় আনতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়মিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন। শুধু আইন প্রয়োগ নয়, জনসচেতনতা, সহজলভ্য চিকিৎসা, টিকাদান এবং মাদকাসক্তদের পুনর্বাসনের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এ রোগ সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।
কুমিল্লার সিভিল সার্জন ডা. আলী নূর বশির বলেন, হেপাটাইটিস ‘বি’ রোগের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে সবাইকে সচেতন হতে হবে। একই ব্লেডে ব্যবহারও কিন্তু খুব বিপজ্জনক। তাই সবাইকে সচেতন হতে হবে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর কুমিল্লার উপপরিচালক মো. বজলুর রশিদ বলেন, কুমিল্লা একটি মাদকপ্রবণ এলাকা। সিরিঞ্জের মাধ্যমে মাদক সেবনের সংখ্যাটা তুলনামূলকভাবে কম হলেও যেহেতু আক্রান্তরা রোগটি ছড়িয়ে দিতে পারে তাই আমরা এসব মাদকসেবনকারী এবং ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় আনতে সতর্ক আছি।
মাদক সেবনকারীদের নিয়ে কাজ করে পপুলেশন সার্ভিস অ্যান্ড ট্রেইনিং সেন্টার (পিএসটিসি) নামক একটি প্রতিষ্ঠান। সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. মো. মাসুদ রানা বলেন, সিরিঞ্জের মাধ্যমে মাদক সেবনে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত রোগীদের আমরা ওষুধ, স্বাস্থ্যের ব্যায়াম, ইনজেকশন দিয়ে থাকি। খুব কমসংখ্যক রোগীই আসে আমাদের কাছে। তবুও কেউ এমন রোগী থাকলে তারা যেন অবশ্যই আমাদের কাছে আসে। আমরা তাদের পরিচয় গোপন রেখে চিকিৎসা প্রদান করে থাকি।
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. নিশাত সুলতানা বলেন, এইডসের ওপর বিভিন্ন বরাদ্দ থাকায় সেটির সঠিক পরিসংখ্যান রাখা সহজ হয়। কিন্তু হেপাটাইটিস ‘বি’ রোগের জন্য তেমন ফান্ড নেই। তাই পরিসংখ্যান রাখা দুষ্কর। তবে আমাদের এখানে পর্যাপ্ত চিকিৎসা ও পরীক্ষা বিনামূল্যে দেওয়া হয়। আক্রান্ত ব্যক্তিরা কোনো সংকোচ ছাড়াই চিকিৎসা নিতে আসতে পারেন।
