বৃহস্পতিবার ২রা জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৮ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

Advertise with us

কাউন্সেলিংয়ে সমাধান খুঁজছে পুলিশ

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ২ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

কাউন্সেলিংয়ে সমাধান খুঁজছে পুলিশ

সাদা কিংবা কালো কাপড়ের ওপর আরবি লেখা পতাকা কিছুদিন ধরে ছড়িয়ে পড়েছে দেশের বেশ কিছু এলাকায়। সেতু, সড়ক ও বিভিন্ন উঁচু ভবনের ওপর এই পতাকা উড়তে দেখা যায়। দেশের বিভিন্ন জায়গায় পতাকা হাতে এবং মোটরসাইকেলে করে মিছিল করা হচ্ছে। অনেকে সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে এ ধরনের পতাকা বিক্রির ঘোষণা দেন। হঠাৎ একযোগে দেশের বিভিন্ন জায়গায় সাদা ও কালো পতাকা ওড়ানোর বিষয়টি বহির্বিশ্বে ভুল বার্তা যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ফলে যারা পতাকা লাগাচ্ছেন, কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে বুঝিয়ে তাদের মাধ্যমে পতাকা সরিয়ে ফেলার উদ্যোগ নিয়েছে পুলিশ।

এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট তরুণ বা যুবক যে প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করছেন, সেই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকের মাধ্যমে কাউন্সেলিং করানো হচ্ছে। মাদ্রাসার ছাত্র হলে ওই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক তাঁর ছাত্রকে দেশের স্বার্থে এর নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে ধারণা দিচ্ছেন।

এরই মধ্যে মাদ্রাসার শিক্ষক, মসজিদের ইমাম ও ধর্মীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করেছে পুলিশ। নিজেদের শিক্ষার্থীদের সচেতন করে পতাকা নামিয়ে ফেলার অনুরোধ জানিয়েছে। পুলিশের দাবি, নমনীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অনেক জায়গা থেকে এরই মধ্যে পতাকা সরিয়ে ফেলা হয়েছে।

এদিকে, সামাজিক মাধ্যমের যেসব আইডি থেকে আরবি লেখা পতাকা ওড়াতে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে, তার পেছনে বড় ধরনের কোনো চক্রান্ত রয়েছে কিনা তাও তদন্ত করছে পুলিশ। সাইবার অপরাধ বিভাগ এই তদন্ত করছে। গত রোববার পুলিশ সদরদপ্তরের অপরাধ সভায় পতাকার বিষয়টি আলোচনায় আসে। ভার্চুয়াল এই সভায় ৬৪ জেলার পুলিশ সুপার ছাড়াও ইউনিটপ্রধানরা যুক্ত ছিলেন। সভায় পুলিশপ্রধান মো. আলী হোসেন ফকির বলেন, কারা কেন কী উদ্দেশ্যে সাদা-কালো পতাকা ওড়াচ্ছে, তা চিহ্নিত করতে হবে।

ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম। গতকাল বুধবার তিনি সমকালকে বলেন, দেশের কোন জায়গায় সাদা-কালো পতাকা ওড়ানো হয়েছে, তার তালিকা আমাদের কাছে রয়েছে। এসবে যারা যুক্ত ছিল, শিক্ষকদের মাধ্যমে তাদের এর নেতিবাচক দিক সম্পর্কে বোঝানো হয়। আটক বা মামলা দিয়ে আমরা এই বিষয়টির সমাধান করতে চাই না। কাউন্সেলিং করার পর অনেকে পতাকা খুলে নিয়েছে। কোথাও পুলিশ স্থানীয় ধর্মীয় শিক্ষকদের সঙ্গে বসেছে।

অতিরিক্ত আইজিপি বলেন, যারা পতাকা টানিয়েছেন, তাদের কারও ভাষ্য– ব্রাজিল, আর্জেন্টিনার পতাকা থাকলে কেন তারা এই ধরনের পতাকা ওড়াতে পারবে না? তবে এই ধরনের কর্মকাণ্ডে বিদেশে ভুল বার্তা যেতে পারে– এটি তাদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছি। এর বাইরে উগ্রপন্থি চিন্তা থেকে কেউ এটি করছেন কিনা, তা আমরা তদন্ত করছি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কাউন্সেলিং করা গেলে ভুল ধারণা সংশোধন করা যায়। ভুল ব্যাখ্যাগুলো বিশেষজ্ঞদের দ্বারা যৌক্তিকভাবে খণ্ডন করা হয়। এ ছাড়া মনস্তাত্ত্বিক সহায়তায় করা হয়ে থাকে। এর মধ্য দিয়ে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা সম্ভব। পতাকা ইস্যুতে পুলিশ এই কৌশল ব্যবহার করছে।

এদিকে, দেশের বিভিন্ন এলাকায় আরবি হরফসংবলিত সাদা পতাকা টানানোর বিষয়টি সরকারের নজরে আছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। গত মঙ্গলবার সচিবালয়ে তিনি বলেন, এটি সরকার খতিয়ে দেখছে। কারণ, এটি নিয়ে বৈশ্বিকভাবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভুল বার্তা যাওয়ার আশঙ্কা আছে। এ সম্পর্কে আমরা সচেতন আছি। এ ব্যাপারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা আছে। সেটিই আমরা খতিয়ে দেখছি।

গতকাল দুই জেলার এসপি ও একজন ডিআইজির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পুলিশ সদরদপ্তর থেকে পতাকা ব্যাপারে পাওয়া নির্দেশনা অনুসারে তারা কাজ করছেন। জেলা গোয়েন্দা পুলিশ সতর্ক আছে। সামাজিক মাধ্যমে নজর রাখা হচ্ছে। কিছু আইডি তারা শনাক্ত করেছেন। এ বিষয়টি এখন পর্যন্ত কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে সমাধান করতে অগ্রাধিকার পুলিশের।

ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন বলেন, ‘পতাকার বিষয়ে আমাদের গোয়েন্দারা কাজ করছে। এখনও বলার মতো তথ্য পাইনি।’

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বিক্ষোভ, মিছিল ও সমাবেশে কয়েকজনকে কালেমাখচিত পতাকা প্রদর্শন করতে দেখা যায়। তবে সম্প্রতি ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় সেতু ও ফ্লাইওভার এই পতাকা দিয়ে সাজানো হয়েছে।

কয়েক দিন ধরে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, কক্সবাজার, বগুড়াসহ বিভিন্ন জেলায় কালেমার পতাকা দিয়ে রাস্তা ও সেতু শোভিত করা বা পতাকা হাতে মোটরসাইকেল মিছিল করতে দেখা গেছে লোকজনকে। কোথাও কোথাও মিছিলকারীরা নিজেদের ‘তৌহিদি জনতা’ হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। রাজধানীর যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভার থেকে ‘কালেমার পতাকা অপসারণ ও অবমাননার’ প্রতিবাদে শুক্রবার বগুড়ার শেরপুরে ‘তৌহিদি জনতা’র ব্যানারে কালেমাখচিত পতাকা হাতে মিছিল করেছে একদল লোক।

ফেসবুকের কিছু পেজে পতাকা ওড়ানোর পক্ষে যুক্তি হিসেবে হেফাজতে ইসলামের শীর্ষ নেতা মুফতি হারুন বিন ইজহারকে উদ্ধৃত করা হচ্ছে। মাসুক মিডিয়া নামে একটি ফেসবুক চ্যানেলে প্রচারিত মুফতি ইজহারের ভিডিওতে তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘এই যে আর্জেন্টিনা, তারপরে এই যে বদমায়েশি শুরু হইছে। আলহামদুলিল্লাহ আমাদের তরুণেরা কালেমার পতাকা লাগানো শুরু করছে। আপনারা সব জায়গায় কালেমার পতাকা লাগাই দিবেন। যদি এটা জঙ্গিবাদ হয়ে থাকে তাহলে আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল এগুলো সব পতাকা নামাইতে হবে। এগুলো থাকবে তো আমাদের কালেমার পতাকাও থাকবে।’

হারুন ইজহারের একটি ভিডিও তাঁর নিজের পেজেও শেয়ার করা হয়েছে। সেখানে পতাকার বিষয়ে বলেন, কিছু কৌশলগত বিষয় আছে, এটি একটু বোঝার চেষ্টা করবেন। এই কালেমার পতাকা মানেই কি আইএস, তালেবান নাকি? তাঁর ভাষায়, কালেমার পতাকার বিষয়ে কেউ কেউ ‘অযথা আতঙ্কিত’ হচ্ছেন এবং এটি ‘মানসিক রোগ’।

অন্যদিকে কালেমার পতাকা ওড়ানো নিয়ে ইসলামী লেখক ফারুক ফেরদৌস ফেসবুকে এক পোস্টে লেখেন, কালেমা নিয়ে কিন্তু প্রশ্ন না। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীও কালেমা বা আয়াতখচিত পতাকা ব্যবহার করে। প্রশ্ন হচ্ছে কালেমাসহ পতাকার নির্দিষ্ট ডিজাইন নিয়ে, যা বাইরের কোনো কোনো গোষ্ঠীর পতাকার সঙ্গে মিলে যায় এবং এটি নিয়ে বিপজ্জনক অপপ্রচারের আশঙ্কা তৈরি হয়।

পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের একজন কর্মকর্তা বলেন, উগ্রপন্থি চিন্তা থেকে এসব পতাকা না ওড়ালেও দেশের ভাবমূর্তির জন্য ভালো নয়। তবে এটি বিশ্বে ভুল বার্তা যাওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। বিষয়টির ওপর গভীর নজর রাখা হচ্ছে।

Facebook Comments Box
Advertise with us

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

Advertise with us
আরও
Advertise with us

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

রবিসোমমঙ্গলবুধবৃহশুক্রশনি
 
১০১১
১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭৩০৩১ 

ফলো করুন দেশবার্তা-এর খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক
মো: সামসুদ্দীন চৌধুরী
সম্পাদকীয় কার্যালয়