
নিজস্ব প্রতিবেদক | বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬ | প্রিন্ট | ১৭ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

দেশের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ ও নৃশংস জঙ্গি হামলা হিসেবে পরিচিত রাজধানীর গুলশানের ‘হলি আর্টিজান বেকারি’ হামলা মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। বহুল আলোচিত এ মামলায় বিচারিক আদালতের (নিম্ন আদালত) দেওয়া সাত জঙ্গির মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে তাদের ‘আমৃত্যু কারাদণ্ড’ দেন হাইকোর্ট। পরবর্তীতে হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হয়। মামলাটি এখন দেশের সর্বোচ্চ আদালত তথা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
এদিকে, রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল জানিয়েছেন, জাতীয় নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক গুরুত্ব বিবেচনা করে এ মামলাটি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানির উদ্যোগ নেওয়া হবে। আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায়ের মাধ্যমে এই মামলায় দণ্ডিতদের সাজা বহাল থাকবে, নাকি কোনো পরিবর্তন আসবে— এখন সেদিকেই নজর দেশের আইন অঙ্গন, ভুক্তভোগী পরিবার এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের।
আইনি জটিলতা ও রাষ্ট্রপক্ষের তৎপরতা
এ বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ‘মামলাটি বর্তমানে আপিল বিভাগে বিচারাধীন (পেন্ডিং) আছে। আপিল বিভাগের মামলাগুলোর শুনানি দ্রুত নিষ্পত্তি করার জন্য আমরা নিয়মিতই বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে থাকি। এই মামলার ক্ষেত্রেও আমাদের আন্তরিকতা বা উদ্যোগের কোনো ঘাটতি হবে না। তবে, কিছু ব্যবহারিক সীমাবদ্ধতা (প্র্যাক্টিক্যাল ডিফিকাল্টি) রয়েছে। আমাদের দেশে যেকোনো মামলার শুনানি দ্রুত শেষ করার ক্ষেত্রে অন্যতম বড় প্রতিবন্ধকতা হলো— আপিল বিভাগে বর্তমানে মাত্র পাঁচজন মাননীয় বিচারপতি রয়েছেন। এর বিপরীতে সারা দেশের মামলার যে বিপুল চাপ, তাতে প্রত্যেকের কাছেই তার নিজের মামলাটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘রাষ্ট্রে কোনো সংগঠিত অপরাধ ঘটলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তার বিচার সুনিশ্চিত করা এবং যেকোনো রায় কার্যকর করা রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব। আমি মনে করি, রাষ্ট্র এ বিষয়ে সম্পূর্ণ সচেতন ও গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। হলি আর্টিজানের এই নির্মম ঘটনায় শুধুমাত্র বাংলাদেশের নাগরিকরাই নন, বেশ কয়েকজন বিদেশি নাগরিকও হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন। সুতরাং, এই বিচারটির সঙ্গে শুধুমাত্র বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় জড়িত নয়, বরং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও এর একটি বিশাল গুরুত্ব রয়েছে। আমরা সে বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই দ্রুত শুনানির জন্য উদ্যোগী হব।’
অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, হলি আর্টিজান ছাড়াও বাংলাদেশের আরও বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর মামলা বর্তমানে আপিল বিভাগে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। এর মধ্যে মেজর সিনহা হত্যা মামলা, বিডিআর ট্র্যাজেডি মামলা এবং নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুন মামলা অন্যতম। রাষ্ট্রপক্ষ অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে এই সবগুলো মামলা নিষ্পত্তির জন্য কাজ করে যাচ্ছে।
হাইকোর্টের রায় ও সাজা কমানোর আইনি ব্যাখ্যা
২০২৩ সালের ৩০ অক্টোবর বিচারপতি সহিদুল করিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে সন্ত্রাসী হামলা মামলায় সাত জঙ্গির মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ডের রায় ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ১৮ জুন এই বহুল আলোচিত মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। রায়ে আদালত স্পষ্ট করে বলেন, ‘সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা স্বাভাবিক মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত কারাগারেই বন্দি থাকবেন।’
আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত সাত আসামি হলেন— জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী, আসলাম হোসেন ওরফে র্যাশ, আব্দুস সবুর খান, রাকিবুল হাসান রিগ্যান, হাদিসুর রহমান, শরিফুল ইসলাম ওরফে খালেদ ও মামুনুর রশিদ।
নিম্ন আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের সাজা উচ্চ আদালতে কমে যাওয়ার আইনি কারণ প্রসঙ্গে আসামিপক্ষের আইনজীবী আমিমুল এহসান জুবায়ের জানান, মূলত ধারার জটিলতার কারণেই সাজা পরিবর্তিত হয়েছে। তিনি বলেন, “বিচারিক আদালত আসামিদের যে নির্দিষ্ট ধারায় মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন, আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে সেই ধারায় তাদের অপরাধটি সংঘটিত হয়নি। আসামিরা মূলত ‘সন্ত্রাস বিরোধী আইন-২০০৯’ এর ৬ নম্বর ধারার (১)-এর ‘আ’ উপ-ধারায় অপরাধ করেছে। এই নির্দিষ্ট উপ-ধারায় অপরাধের সর্বোচ্চ সাজাই হলো যাবজ্জীবন বা আমৃত্যু কারাদণ্ড। কিন্তু বিচারিক আদালত ভুলবশত ‘অ’ উপ-ধারার অধীনে তাদের মৃত্যুদণ্ডের সাজা দিয়েছিলেন। হাইকোর্ট বিভাগ তাদের রায়ে বলেছেন যে, বিচারিক আদালত ভুল ধারায় সাজা দিয়েছিলেন। এই আইনি ত্রুটির কারণেই উচ্চ আদালত নিম্ন আদালতের রায়ে হস্তক্ষেপ করে আসামিদের আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন।”
এর আগে, ২০২৩ সালের ১১ অক্টোবর এই মামলায় সাতজনের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ডাদেশ অনুমোদন) ও আসামিদের আপিল শুনানি শেষ হয়েছিল। আইন অনুযায়ী, ফৌজদারি মামলায় বিচারিক আদালত যখন কোনো আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন, তখন ওই দণ্ড কার্যকরের জন্য হাইকোর্টের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৪ ধারা মোতাবেক মামলার সব নথি হাইকোর্টে পাঠানো হয়, যা ‘ডেথ রেফারেন্স’ নামে পরিচিত। নথি আসার পর হাইকোর্টের ডেথ রেফারেন্স শাখা তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মামলার ‘পেপারবুক’ (নথিপত্র সংবলিত বই) প্রস্তুত করে এবং এর পরই চূড়ান্ত শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
ফিরে দেখা: দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জঙ্গি হামলা
২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় (বেকারি) আকস্মিক হামলা চালিয়ে বিদেশি নাগরিকসহ ২০ জনকে জিম্মি ও নির্মমভাবে হত্যা করে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন ‘নব্য জেএমবি’র আত্মঘাতী সদস্যরা। জিম্মিদের উদ্ধার করতে গিয়ে সন্ত্রাসীদের ছোড়া গ্রেনেডের আঘাতে সেদিন রাতেই প্রাণ হারান বনানী থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালাউদ্দিন আহমেদ এবং সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) রবিউল ইসলাম।
দেশের ইতিহাসে অন্যতম নৃশংস এই হামলায় নিহতদের মধ্যে ছিলেন নয়জন ইতালীয়, সাতজন জাপানি, একজন ভারতীয়, একজন বাংলাদেশি-আমেরিকান দ্বৈত নাগরিক এবং দুইজন বাংলাদেশি।
রাতভর জিম্মি দশা চলার পর পরদিন সকালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’ নামের কমান্ডো অভিযান পরিচালনা করে। ওই অভিযানে নিহত হয় হামলায় সরাসরি অংশ নেওয়া পাঁচ জঙ্গি। তারা হলেন— মীর সামেহ মোবাশ্বের, রোহান ইবনে ইমতিয়াজ ওরফে মামুন, নিবরাস ইসলাম, খায়রুল ইসলাম পায়েল ও শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল।
এছাড়া, পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন জঙ্গিবিরোধী অভিযানে নব্য জেএমবির আরও আট সদস্য নিহত হওয়ায় তাদের মামলার অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। অন্যদিকে, দীর্ঘ তদন্তে উগ্রবাদের সঙ্গে কোনো সম্পৃক্ততা ও অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক আবুল হাসনাত রেজা করিমও মামলা থেকে অব্যাহতি পান।
হলি আর্টিজানের ওই নৃশংস ঘটনার পর সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গুলশান থানায় একটি মামলা দায়ের করেন ওই থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) রিপন কুমার দাস। দীর্ঘ তদন্ত শেষে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের পরিদর্শক হুমায়ুন কবির ২০১৮ সালের ১ জুলাই আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন।
২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মজিবুর রহমান একজনকে খালাস দিয়ে বাকি সাত আসামিকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছিলেন, যা পরবর্তীতে উচ্চ আদালতে আমৃত্যু কারাদণ্ডে রূপান্তরিত হয়।
