রবিবার ২৬শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১১ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

Advertise with us

বৈঠক করতে ধর্মমন্ত্রী নিজে গেলেন সৌদি দূতাবাসে!

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ৯ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

বৈঠক করতে ধর্মমন্ত্রী নিজে গেলেন সৌদি দূতাবাসে!

হজ ইস্যুতে আলোচনার জন্য সম্প্রতি ঢাকাস্থ সৌদি দূতাবাসে গিয়ে দেশটির রাষ্ট্রদূত আব্দুল্লাহ জাফর এইচ বিন আবিয়াহর সঙ্গে বৈঠক করেছেন ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ। স্বাগতিক দেশের একজন মন্ত্রীর সরাসরি বিদেশি দূতাবাসে গিয়ে রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠক করার এ ঘটনায় কূটনৈতিক অঙ্গনে অলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। বর্তমান ও সাবেক কূটনীতিকরা বলছেন প্রটোকল ও কূটনৈতিক শিষ্টাচার অনুযায়ী এটি ‘নজিরবিহীন’ ঘটনা।

তারা বলছেন, কূটনৈতিক রীতি অনুযায়ী কোনো দাপ্তরিক বা স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনার প্রয়োজন হলে বিদেশি রাষ্ট্রদূতদেরই মন্ত্রীর কার্যালয়ে আসার কথা; মন্ত্রীর রাষ্ট্রদূতের কাছে যাওয়ার রীতি নেই। ‘মহৎ উদ্দেশ্যে’ হলেও প্রথা ভেঙে এভাবে বিদেশি দূতাবাসে গিয়ে সাক্ষাৎ করা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে দেশের অবস্থান দুর্বল করে।

ধর্ম মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৭ সালের হজে বাংলাদেশের জন্য ‘ব্যাকআপ আবাসন’ ১ শতাংশ বহাল রাখার অনুরোধ জানাতে গত ২০ জুলাই রাজধানীর গুলশানে অবস্থিত সৌদি দূতাবাসে যান ধর্মমন্ত্রী কায়কোবাদ। সৌদি হজ ও ওমরাহ মন্ত্রণালয় আবাসন ২ শতাংশ নির্ধারণ করায় হজের খরচ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, যা রোধ করতে মন্ত্রী সৌদি রাষ্ট্রদূত আবিয়াহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

প্রচলিত কূটনৈতিক প্রথা অনুযায়ী, বিশেষ প্রয়োজনে বৈঠকের প্রয়োজন হলে স্বাগতিক দেশের মন্ত্রীর দপ্তরে বিদেশি দূতদের আমন্ত্রণ জানানো বা ডেকে পাঠানোই নিয়ম। বিশেষ ক্ষেত্রে তৃতীয় কোনো নিরপেক্ষ ভেন্যুতে আলোচনা হতে পারে। কিন্তু কোনো বিদেশি দূতাবাসে গিয়ে স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করা একচন মন্ত্রীর জন্য কূটনৈতিক প্রটোকল অনুযায়ী শোভন নয়।

এ ছাড়া ‘রুলস অব বিজনেস’ অনুযায়ী কোনো বিদেশি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠক বা সাক্ষাতের বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানাতে হয়। এরপর মন্ত্রণালয় কূটনৈতিক শিষ্টাচার বজায় রেখে প্রাসঙ্গিক যোগাযোগ কীভাবে সম্পাদন করা যায় সে সিদ্ধান্ত নেয়।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ধর্মমন্ত্রী সৌদি দূতাবাসে যাবেন বা রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলাপ করবেন, এ ধরনের কোনো তথ্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়নি। মন্ত্রণালয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে জানতে পেরেছে, এ ধরনের একটি বৈঠক হয়েছে এবং হজ সংক্রান্ত বিষয়ে আলাপ হয়েছে।

ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ বর্তমানে দেশের বাইরে থাকায় এ বিষয়ে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কয়েকজন কর্মকর্তার কাছে বক্তব্য জানতে চাইলে তারাও কেউ মন্তব্য করতে রাজি হননি।

সরকারের এক কূটনীতিক বলেন, একজন মন্ত্রী যখন বিদেশি দূতাবাসে গিয়ে রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে দেখা করেন, সেটা প্রটোকল অনুযায়ী শোভন নয়। কূটনৈতিক একটি প্রটোকল আছে, সেটা মানা উচিত। যত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই হোক, রাষ্ট্রদূত যদি মন্ত্রীর অফিস বা অন্য কোনো ভেন্যুতে দেখা করতেন, তবে সমস্যা হতো না। অফিশিয়াল বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনার জন্য মন্ত্রীর রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে দূতাবাসে গিয়ে বৈঠক করা খুবই বেমানান এবং কূটনৈতিক যে প্রটোকল আছে তার বিচ্যুতি। মন্ত্রী গিয়ে রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে দেখা করেছেন, লবিং করছেন, এটা তো নজিরবিহীন ঘটনা!

এ কূটনীতিক আরও বলেন, একজন মন্ত্রী চাইলে বিদেশি দূতাবাসের জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠানে যেতে পারেন, শোক বইয়ে স্বাক্ষর করতে যেতে পারেন, চ্যান্সারি ভবন উদ্বোধন বা কোনো রাষ্ট্রদূতের বাসায় আমন্ত্রণ জানালেও যেতে পারেন। কিন্তু দূতাবাসে গিয়ে দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে বৈঠক করতে পারেন না। এগুলো কূটনৈতিকভাবে আমাদের দুর্বল করে।

আরেক কূটনীতিক বলেন, মন্ত্রী হাজিদের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে কথা বলতে গেছেন। বাংলাদেশিদের স্বার্থ নিয়ে আলাপ করতে দূতাবাসে গেছেন। এই আলাপটা ওনার দপ্তরে হতে পারত। মন্ত্রী হয়তো মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে গেছেন, কিন্তু আমাদের প্রটোকলটা মাথায় রাখতে হবে। একজন মন্ত্রী যখন বিদেশি দূতাবাসে গিয়ে রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে দেখা করেন, সেটা প্রটোকল অনুযায়ী শোভন নয়। সংশ্লিষ্টরা মন্ত্রীকে এই বার্তা দিতে পারতেন, মনে করিয়ে দিতে পারতেন।

নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করে সাবেক এক রাষ্ট্রদূত বলেন, সাধারণত নিয়ম হলো, যে দেশে রাষ্ট্রদূতরা থাকবেন তারা এসে মন্ত্রী বা সচিবের সঙ্গে দেখা করবেন। যদি অফিশিয়াল কোনো বিষয় হয় তাহলে রাষ্ট্রদূতরা এসে দেখা করবেন এবং সেটা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানিয়ে করা হয়। যদি সোশ্যাল কোনো প্রোগ্রাম হয়, সেখানে যেতে বাধা নেই। অফিসিয়াল কোনো আলাপ থাকলে সেটা অফিসে হওয়া উচিত। কিন্তু কোনো মিশনে গিয়ে মন্ত্রীর বৈঠক করার কথা না বা এ রকম হয় না। সাধারণ প্রটোকল অনুযায়ী এটা হওয়ার কথাও না। এটা দৃষ্টিকটু হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমি তো জানি না, এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না। আপনি আমাদের সংশ্লিষ্ট উইংয়ের (পশ্চিম এশিয়া অনুবিভাগ) সঙ্গে কথা বলেন।

জানতে চাইলে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবীর বলেন, মিশনের লোকজন মন্ত্রীর কাছে আসবেন, মন্ত্রী সাধারণত মিশনে যান না। এটা সাধারণ অনুশীলনে নেই। কাজেই প্রচলিত কূটনৈতিক যে অনুশীলন, সেই অনুযায়ী এটা ঠিক কাজ হয়েছে বলে মনে করা যায় না। জ্ঞানের অভাব থেকে হয়তো না জেনেই করা হয়েছে। কিন্তু নিজেদের যেটা জানা নেই, সেটা জানার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলা যেত। হয়তো সেটা জরুরি মনে করেন না বলেই এ ধরনের অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশি জনশক্তি রপ্তানির শীর্ষ গন্তব্য সৌদি আরব। দেশটির সঙ্গে হজ, ওমরাহ ছাড়াও নানা স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় রয়েছে। বৃহৎ স্বার্থ থাকার পরও স্বাগতিক দেশের একজন মন্ত্রী প্রটোকল ভেঙে বিদেশি দূতাবাসে গিয়ে সাক্ষাৎ বা বৈঠক করতে পারেন না। একজন মন্ত্রী যখন এ ধরনের কাজ করেন, তখন কূটনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হয়, কূটনীতিকদের জন্য দরকষাকষি করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই কূটনৈতিক প্রটোকলের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলদের আরও সতর্ক হওয়া দরকার।

Facebook Comments Box
Advertise with us
Advertise with us
Advertise with us

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

রবিসোমমঙ্গলবুধবৃহশুক্রশনি
 
১০১১
১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭৩০৩১ 

ফলো করুন দেশবার্তা-এর খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক
মো: সামসুদ্দীন চৌধুরী
সম্পাদকীয় কার্যালয়