মঙ্গলবার ৯ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৬শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

Advertise with us

ইসলামী ব্যাংক থেকে ৫ দিনে ৩৫০০ কোটি টাকা উত্তোলন, আস্থা সংকটে বাড়ছে চাপ

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ১৬ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

ইসলামী ব্যাংক থেকে ৫ দিনে ৩৫০০ কোটি টাকা উত্তোলন, আস্থা সংকটে বাড়ছে চাপ

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমের নিয়োগকে কেন্দ্র করে দেশের বৃহত্তম বেসরকারি ব্যাংকটিতে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। গত পাঁচ কার্যদিবসে ব্যাংকটি থেকে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকার আমানত তুলে নিয়েছেন গ্রাহকরা। একই সঙ্গে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্দোলন, গ্রাহকদের বিক্ষোভ এবং শেয়ারহোল্ডারদের আপত্তি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে—আমানত প্রত্যাহারের চাপ কতটা বাড়লে চেয়ারম্যান পরিবর্তনের মতো সিদ্ধান্ত আসতে পারে? যদিও ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা উত্তোলনের সঙ্গে চেয়ারম্যান অপসারণের সরাসরি সম্পর্ক নেই। তবে গ্রাহকদের আস্থাহীনতা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং আমানত বেরিয়ে যাওয়ার প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তাহলে নীতিনির্ধারকদের ওপর চাপ বাড়বে।

পাঁচ দিনে ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা উত্তোলন

ব্যাংকটির একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, খুরশীদ আলমের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগের পর থেকে আমানত উত্তোলনের প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। প্রথম চার কার্যদিবসে প্রায় ২ হাজার ৫৭০ কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়। পরে বিভিন্ন শাখা থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, একদিনেই প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার বেশি আমানত তুলে নেওয়া হয়েছে।

ফলে মাত্র পাঁচ কার্যদিবসে মোট উত্তোলনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকায়। বর্তমানে ব্যাংকটির মোট আমানত নেমে এসেছে প্রায় ১ লাখ ৮১ হাজার ৬০০ কোটি টাকায়।

ব্যাংকারদের মতে, মোট আমানতের তুলনায় এ পরিমাণ উত্তোলন এখনও ব্যাংকের জন্য তাৎক্ষণিক তারল্য সংকট তৈরি করার মতো নয়। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, গ্রাহকদের মধ্যে আস্থাহীনতার বার্তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

কেন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে খুরশীদ আলম

গত ২৪ মে চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম. জুবায়দুর রহমান পদত্যাগ করার পর একই দিনে খুরশীদ আলমকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের আগেই তার নিয়োগকে কেন্দ্র করে গ্রাহক, কর্মকর্তা এবং একাংশ শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।

‘ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম’-এর ব্যানারে মতিঝিলে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ শুরু হয়। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, বিতর্কিত ব্যক্তিকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার মাধ্যমে ব্যাংকের সংস্কার কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

অন্যদিকে পরিচালনা পর্ষদের একটি অংশ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, খুরশীদ আলমের দীর্ঘ ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা বর্তমান সংকট মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে।

কত টাকা উত্তোলন হলে সংকট প্রকট হবে

ব্যাংকিং বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামী ব্যাংকের মতো বড় প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কয়েক হাজার কোটি টাকা উত্তোলন তাৎক্ষণিকভাবে অস্তিত্বগত সংকট তৈরি করে না। কারণ ব্যাংকটির শক্তিশালী আমানতভিত্তি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তার সুযোগ এবং বিভিন্ন তারল্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা রয়েছে।

তবে পরিস্থিতি ভিন্ন রূপ নিতে পারে যদি উত্তোলনের ধারা কয়েক সপ্তাহ ধরে অব্যাহত থাকে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমানত প্রত্যাহারের পরিমাণ যদি ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকার বেশি হয়ে যায় এবং একই সঙ্গে নতুন আমানত প্রবাহ কমে যায়, তাহলে তা ব্যাংকের স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

তখন গ্রাহকদের আস্থা ফেরাতে বিশেষ পদক্ষেপ, ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন কিংবা নীতিগত হস্তক্ষেপের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংক কী বলছে

বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র মোহাম্মদ শাহরিয়ার সিদ্দিকী জানিয়েছেন, ইসলামী ব্যাংকের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। গ্রাহকরা নগদ অর্থ উত্তোলন করছেন নাকি অন্য ব্যাংকে স্থানান্তর করছেন, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংক বর্তমানে এমন অবস্থায় নেই যে গ্রাহকদের উত্তোলনের চাহিদা পূরণ করতে পারবে না। প্রয়োজন হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তারল্য সহায়তা দেবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা মনে করিয়ে দেন, ২০২৪ সালের আগস্টেও ব্যাংকটি একই ধরনের চাপের মুখে পড়েছিল। তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা সম্ভব হয়েছিল।

আন্দোলন আরও বিস্তৃত হচ্ছে

চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ ইতোমধ্যে কলমবিরতি কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। গ্রাহক সংগঠনগুলোও ধারাবাহিক আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে।

আন্দোলনকারীদের দাবি, খুরশীদ আলমকে চেয়ারম্যান পদ থেকে সরিয়ে দিতে হবে এবং ব্যাংকের মালিকানা ও পরিচালনা কাঠামোতে আরও সংস্কার আনতে হবে।

এতে করে পরিস্থিতি কেবল ব্যাংকিং সংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি প্রশাসনিক, করপোরেট এবং রাজনৈতিক মাত্রাও পেয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আস্থাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে মূল প্রশ্ন চেয়ারম্যান থাকবেন কি থাকবেন না—সেটি নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমানতকারীদের আস্থা কত দ্রুত পুনরুদ্ধার করা যায়।

কারণ ব্যাংকিং ব্যবসার ভিত্তি মূলত বিশ্বাস। গ্রাহকরা যখন মনে করেন তাদের অর্থ নিরাপদ, তখন ব্যাংক শক্তিশালী থাকে। কিন্তু সেই বিশ্বাসে ফাটল ধরলে আর্থিকভাবে সক্ষম ব্যাংকও চাপে পড়ে যেতে পারে।

সামনে কী হতে পারে

বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। যদি আমানত প্রত্যাহারের প্রবণতা আরও বাড়ে এবং ব্যাংকের কার্যক্রমে এর নেতিবাচক প্রভাব দৃশ্যমান হয়, তাহলে চেয়ারম্যানের বিষয়ে পুনর্বিবেচনার চাপ বাড়তে পারে।

তবে এখন পর্যন্ত এমন কোনো আনুষ্ঠানিক ইঙ্গিত নেই যে নির্দিষ্ট পরিমাণ আমানত উত্তোলনের সঙ্গে চেয়ারম্যান পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত যুক্ত রয়েছে। বাস্তবে সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে গ্রাহকদের আস্থা সংকট কতটা গভীর হয়, আন্দোলন কতটা বিস্তৃত হয় এবং তা ব্যাংকের সামগ্রিক স্থিতিশীলতার ওপর কতটা প্রভাব ফেলে তার ওপর।

এ মুহূর্তে ইসলামী ব্যাংকের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তারল্য নয়, বরং আস্থা পুনরুদ্ধার। আর সেই আস্থা ফিরিয়ে আনাই নির্ধারণ করতে পারে ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ পথচলা।

Facebook Comments Box
Advertise with us

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

Advertise with us
Advertise with us

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

রবিসোমমঙ্গলবুধবৃহশুক্রশনি
 
১০১১১৩
১৫১৬১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
৩০ 

ফলো করুন দেশবার্তা-এর খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক
মো: সামসুদ্দীন চৌধুরী
সম্পাদকীয় কার্যালয়