
নিজস্ব প্রতিবেদক | শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬ | প্রিন্ট | ১ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

বাংলাদেশসহ প্রায় ৬০টি বাণিজ্য অংশীদারের ওপর নতুন আমদানি শুল্ক আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মূলত জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য আমদানি ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগে অভিযোগে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার (২৪ জুলাই) থেকে কার্যকর হওয়া এই শুল্কহার কয়েকটি দেশের ওপর ১০ শতাংশ এবং বাকিগুলোর ওপর ১২ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ছাড়াও যুক্তরাজ্য, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা, জাপান, ভারত ও পাকিস্তানের মতো দেশও রয়েছে তালিকায়।
এর আগে, চলতি বছরের শুরুতে আরোপ করা অস্থায়ী ১০ শতাংশ আমদানি শুল্কের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন এই ব্যবস্থা কার্যকর হলো।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর শুরু হওয়া বৈশ্বিক বাণিজ্যযুদ্ধের সর্বশেষ পদক্ষেপ হিসেবে এই সিদ্ধান্তকে দেখা হচ্ছে।
চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছিল, জরুরি ক্ষমতার আওতায় ট্রাম্প প্রশাসন বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশে যে শুল্ক আরোপ করেছিল, তার আইনি বৈধতা ছিল না। এরপর ট্রাম্প প্রশাসন তাদের বাণিজ্যনীতি বাস্তবায়নে বিকল্প আইনি পথ অনুসন্ধান শুরু করে।
গত মাসে হোয়াইট হাউস ঘোষণা দেয়, জোরপূর্বক শ্রম প্রতিরোধে পর্যাপ্ত পদক্ষেপ না নেওয়ার অভিযোগে বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর ১০ থেকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করা হবে। সেই ঘোষণার ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার জানান, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্দেশে নতুন শুল্ক শুক্রবার থেকে কার্যকর হয়েছে।
এক বিবৃতিতে গ্রিয়ার বলেন, আজকের এই পদক্ষেপ মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং বাণিজ্য বিকৃতির মতো বিষয়গুলোর সংশোধন শুরু করবে, যা সব সময় শ্রমিকদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে।
১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্টের সেকশন ৩০১ অনুযায়ী এই পদক্ষেপের ঘোষণা দেন গ্রিয়ার, যা যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যকে বাধাগ্রস্ত বা ক্ষুণ্ণ করে এমন অনুশীলনের বিরুদ্ধে মার্কিন বাণিজ্য ব্যবস্থাপনাকে নিয়ন্ত্রণ করে।
এর আগে চলতি সপ্তাহেই ট্রাম্প প্রশাসন ১৯৩০ সালের ট্যারিফ অ্যাক্টের সেকশন ৩৩৮ ব্যবহার করে কানাডার পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয় জানায়, জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করতে ব্যর্থ হওয়ায় ৬০টি দেশের ওপর এই নতুন শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের মোট আমদানির প্রায় ৯৯ দশমিক ৪ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব করে।
কার্যালয়টি আরও জানায়, ট্রাম্প প্রশাসন পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তিতে জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করাকে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে। এখন পর্যন্ত ১০টি দেশ এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে সম্মত হয়েছে এবং সাম্প্রতিক তদন্তের পর আরও কয়েকটি দেশ একই ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে।
যেসব দেশ জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করছে, তাদের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। আর যারা এখনো এমন পদক্ষেপ নেয়নি, তাদের ক্ষেত্রে শুল্কহার হবে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ।
গ্রিয়ার বলেন, যেসব দেশ দ্রুত জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে, তা উৎসাহব্যঞ্জক। এসব দেশ যাতে কার্যকরভাবে সেই নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করতে পারে, সে জন্য যুক্তরাষ্ট্র তাদের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাবে।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন এই শুল্ক আরোপ ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর ও আগ্রাসী বাণিজ্যনীতির ধারাবাহিকতারই ইঙ্গিত বহন করছে।
হিনরিখ ফাউন্ডেশনের বাণিজ্যনীতি বিশেষজ্ঞ ডেবোরা এলমস বলেন, জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি ঠেকাতে যথেষ্ট ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে-এমনটি প্রমাণ করা অনেক দেশের জন্যই কঠিন হবে। ফলে নতুন শুল্কের আওতা থেকে বেরিয়ে আসাও তাদের জন্য সহজ হবে না।
অন্যদিকে, এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের অর্থনৈতিক নিরাপত্তাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ওয়েন্ডি কাটলার মনে করেন, নতুন এই শুল্কের ফলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ভোক্তাদের ব্যয় বাড়বে। তবে কিছু পণ্যকে শুল্কের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে বলে এর সামগ্রিক প্রভাব কিছুটা সীমিত থাকতে পারে।
তিনি আরও বলেন, নতুন শুল্কে অধিকাংশ বাণিজ্য অংশীদার দেশই অসন্তুষ্ট হবে। ফলে তারা যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অন্যান্য দেশের সঙ্গে নতুন বাণিজ্যিক চুক্তি ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের দিকেই বেশি গুরুত্ব দেবে।
বিভিন্ন দেশের প্রতিক্রিয়া
নতুন শুল্ক আরোপের পর এর বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে কয়েকটি দেশ। ব্রাজিল সরকার এই পদক্ষেপকে ‘অযৌক্তিক’ ও ‘খামখেয়ালি’ বলে আখ্যা দিয়েছে। এক বিবৃতিতে দেশটি অভিযোগ করেছে, শ্রমিকদের অধিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়কে যুক্তরাষ্ট্র তার সংরক্ষণবাদী বাণিজ্যনীতির স্বার্থে ব্যবহার করছে।
ব্রাজিলের পণ্যের ওপর ১২ দশমিক ৫ শতাংশ নতুন শুল্ক আরোপের জবাবে দেশটির সরকার জানিয়েছে, তারা নিজেদের ‘পারস্পরিকতা আইন’ অনুযায়ী পাল্টা ব্যবস্থা নেবে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প বাণিজ্য অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের দিকেও গুরুত্ব দেবে।
এর আগে চলতি মাসেই ব্রাজিল থেকে আমদানি করা আসবাবপত্র, যন্ত্রপাতি, চিনি ও অন্যান্য পণ্যের ওপর পৃথকভাবে ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। তবে গরুর মাংস ও কফির মতো কয়েকটি পণ্যকে ওই শুল্কের আওতার বাইরে রাখা হয়েছিল।
অন্যদিকে, জাপান সরকার নতুন শুল্ক আরোপে দুঃখ প্রকাশ করে বলেছে, দেশটির বাণিজ্য কার্যক্রম আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি মেনেই পরিচালিত হয়।
এ ছাড়া অস্ট্রেলিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী ডন ফ্যারেল এই শুল্ককে ‘সম্পূর্ণ অযৌক্তিক’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, অস্ট্রেলিয়ার পণ্যের ওপর আরোপিত সব শুল্ক প্রত্যাহারের জন্য ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রাখবে তার সরকার। সূত্র: বিবিসি
