
নিজস্ব প্রতিবেদক | শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬ | প্রিন্ট | ৬ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

যে পেঁয়াজ ফলিয়ে ঘরে তোলার আনন্দে মুখর থাকার কথা ছিল গ্রামীণ জনপদের, বাজারমূল্যের আকস্মিক ধসে সেই পেঁয়াজই এখন চাষীর গলার কাঁটা। উৎপাদন খরচের তুলনায় প্রায় অর্ধেক দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হয়ে হাজার হাজার কৃষক এখন দেউলিয়া হওয়ার পথে। ন্যায্য মূল্য না পেয়ে ক্ষোভে হড়াই নদীতে পেঁয়াজ ফেলে দিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন কৃষকরা। চাষীদের এ দুর্দশার পেছনে মূলত বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ এবং উন্নত সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবকে দায়ী করছেন অনেকে। এছাড়া ভরা মৌসুমে পর্যাপ্ত হিমাগার বা গুদাম না থাকায় পচনশীল এ পণ্য ধরে রাখতে পারছেন না কৃষকরা।
রাজবাড়ীর সবচেয়ে বড় পেঁয়াজের বাজার বালিয়াকান্দি উপজেলার সোনাপুর। এ বাজারে প্রতি মঙ্গল ও বৃহস্পতিবার হাজার হাজার মণ পেঁয়াজ বেচাকেনা হয়। গতকাল বাজারে গিয়ে দেখা যায়, ভোর থেকেই কৃষকরা তাদের পেঁয়াজ বাজারে বিক্রির জন্য আনছেন। কেউ ভ্যানে, কেউ ইঞ্জিনচালিত নছিমনে। স্থানীয় বেপারিরা কৃষকের কাছ থেকে কেনা পেঁয়াজ শ্রমিক দিয়ে বস্তায় ভরে ট্রাকে করে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় পাঠিয়ে দিচ্ছেন। এ বাজারে মানভেদে প্রতি মণ পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৬০০-৮০০ টাকায়। দাম কম থাকায় অনেক কৃষকই পেঁয়াজ বিক্রি না করে ফিরে যাচ্ছেন।
সেখানে কথা হয় পলাশ মিয়ার সঙ্গে। তার ১ মিনিট ৪০ সেকেন্ড দীর্ঘ একটি ভিডিও এরই মধ্যে ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, সেতুর রেলিংয়ের পাশে পেঁয়াজভর্তি একটি ভ্যানের ওপর উঠেছেন একজন ব্যক্তি। এরপর ভ্যানে থাকা বস্তার রশি খুলে পেঁয়াজ নদীর পানিতে ফেলে দিচ্ছেন তিনি।
পলাশ মিয়া বলেন, ‘বাজারে তো পেঁয়াজের দাম নাই। যখন পেঁয়াজ মাঠ থেকে তুলি, তখন ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ টাকা মণ বিক্রি করছি। এখন সেই পেঁয়াজ ৬০০-৭০০ টাকায় বিক্রি করা লাগতেছে। এক মণ পেঁয়াজ ঘরে তুলতে প্রায় ১ হাজার ৫০০ টাকা খরচ হইছে। আর বিক্রি হচ্ছে ৬০০-৭০০ টাকায়। এতে তো অনেক লোকসান যাচ্ছে আমাদের।’
পেঁয়াজ নদীতে ফেলে দেয়া প্রসঙ্গে এ চাষী বলেন, ‘পেঁয়াজের তো অনেক গ্রেড আছে। ভালো পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৮০০ টাকা মণ। মঙ্গলবার আমি যে পেঁয়াজ আনছিলাম বাজারে, তা ছিল বি গ্রেডের। যে কারণে বাজারে কোনো বেপারি দামই কয় নাই। তাই রাগে-দুঃখে ব্রিজের ওপর থেকে পেঁয়াজ নদীতে ফেলে দিয়ে খালি বস্তা কয়েকটা নিয়ে আসি।’ তিনটি বস্তায় চার মণ পেঁয়াজ ছিল বলেও জানান তিনি।
পেঁয়াজের হাটে কথা হয় কৃষক দিদার হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘কৃষক এবার একদম শেষ। পেঁয়াজের দাম নাই। এক বিঘায় পেঁয়াজ উৎপাদনে অনেক খরচ হইছে। সারের দাম বেশি, তেলের দাম বেশি, শ্রমিকের দাম বেশি। প্রতি বিঘায় খরচ পড়ছে ৩০-৩৫ হাজার টাকা।’
পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন আরেক পেঁয়াজচাষী খাইয়ুল ইসলাম লিটন। তিনি বলেন, ‘পেঁয়াজ এখন বোঝার ওপর শাকের আঁটি। একে তো মণপ্রতি তিন-চারশ টাকা করে লোকসান যাচ্ছে, তার ওপর বাড়িতে সংগ্রহ করে রাখতে গেলেও খরচ বাড়তেছে। পেঁয়াজ যাতে না পচে, তার জন্য ঘরে ফ্যান লাগাইছি। বিদ্যুতের দামও বেড়েছে। আগে ৫০০ টাকা লাগলে এখন লাগে ১ হাজার টাকা। তাহলে কোন দিকে যাব?’
আরেক কৃষক সুলতান বিশ্বাস বলেন, ‘যে দাম পাচ্ছি, আর বছর আমি পেঁয়াজের আবাদ কম করব। পেঁয়াজে যদি লোকসান যায়, তাহলে সেটা তো করা যাবে না। সরকারকে বলি, আমাদের একটু বাঁচাক। পেঁয়াজের দাম একটু বাড়ালে আমরা বাঁচব, না হলে শেষ।’
পেঁয়াজচাষী টুকু জমাদ্দার বলেন, ‘বালিয়াকান্দি উপজেলায় শতকরা ৯৫ ভাগ জমিতে পেঁয়াজ আবাদ হয়। এ বছর হাইব্রিড জাতের পেঁয়াজ রোপণ করায় ফলন হয়েছে দ্বিগুণ। আবার পেঁয়াজ তোলার সময় বৃষ্টির কারণে পেঁয়াজ রসালো হয়েছে, যে কারণে দ্রুত পচে যাচ্ছে। অনেকে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েও পেঁয়াজ চাষ করেছেন। সরকার যদি পেঁয়াজের দাম বেঁধে না দেয়, কৃষক যদি এভাবে লোকসান গুনতে থাকে, তাহলে আগামীতে পেঁয়াজ চাষে আগ্রহ হারাবেন কৃষক।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রাজবাড়ীর উপপরিচালক ড. মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘এ বছর জেলায় ৩০ হাজার ৪৭৮ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ আবাদ হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে ফলন ভালো হয়েছে। তবে বাজারে কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করায় লোকসানে পড়ছেন চাষীরা। দ্রুতই এ সংকট দূর হবে বলে আশা করছি।’
