
নিজস্ব প্রতিবেদক | মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | প্রিন্ট | ৯ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার সাবেক সেনা কর্মকর্তা মোজাফফরের ফেসবুক আর ই-মেইলের ডিজিটাল জট খুলে তদন্তকারীরা আবিষ্কার করেছেন এক নতুন সমীকরণ। এতে আলোচিত এই হত্যা মামলার নেপথ্যের কুশীলবদের মুখোশ উন্মোচন হতে পারে। ফেসবুকের কাছ থেকে কিছু আইপি অ্যাড্রেস আর ডিলিট করা মেসেজের তথ্য পেলেই পরিষ্কার হবে অনেককিছু।
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সংঘটিত সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যার ৪৫ বছর পর, মামলার ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় ও অবিশ্বাস্য মোড় উন্মোচিত হতে যাচ্ছে। প্রায় সাড়ে চার দশক আত্মগোপনে থাকার পর গত ১৫ জুলাই রাজধানীর বনানী থেকে গ্রেপ্তার হন সাবেক সেনা কর্মকর্তা মোজাফফর হোসেন। তাকে গ্রেপ্তারের পর কেবল অতীতে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধই নয়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্তে বেরিয়ে আসছে এক গভীর ষড়যন্ত্রের চিত্র।
তদন্তকারীদের হাতে আসা মোজাফফরের একটি ফেইসবুক আইডি ও ই-মেইল ফরেনসিক বিশ্লেষণ করতেই বেরিয়ে এসেছে আঁতকে ওঠার মতো তথ্য।
দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময়গুলোতে আন্তর্জাতিক অপরাধে অভিযুক্ত এই সাবেক সেনা কর্মকর্তা কার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন? কেনই-বা তার ফেইসবুক চ্যাটবক্সে ঘুরেফিরে আসছিলো ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের ছবি ব্যবহৃত আইডিগুলো?
ডিজিটাল ফরেনসিক রিপোর্টে মোজাফফরের ফেসবুক আইডি নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। তানভীর হাসান জোহার মতে, একটি টাইপ কোডেড আইডির মাধ্যমে তিনি নিয়মিত যোগাযোগ করতেন এমন কিছু প্রোফাইলের সাথে, যেগুলোতে শেখ হাসিনা, সজীব ওয়াজেদ জয়সহ শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের ছবি ব্যবহার করা হতো।
তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা বলেন, ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সজীব ওয়াজেদ জয়ের ফেক অথবা রিয়েল আইডির সঙ্গে ওনার ফেসবুকের কমিউনিকেশন আমরা পেয়েছি। একটা ক্লাসিফাইড হত্যাযজ্ঞের ক্ষেত্রে উনি নিশ্চয়ই কোনো ফেক আইডির সঙ্গে যোগাযোগ করবেন না। তো আমরা ধরেই নিচ্ছি এটা রিয়েল আইডি। এসব বিষয়ে আমরা অধিকতর তদন্ত করবো।’
তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন, মোজাফফরের একটিমাত্র ই-মেইল আইডি দিয়ে অন্তত চারটি ভিন্ন ডিভাইসে লগইন করা হয়েছিল। এই ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট থেকেই পরিষ্কার হতে পারে দীর্ঘ আত্মগোপনকালে তিনি কখন, কীভাবে দেশে ফেরেন এবং ছদ্মবেশে কী উদ্দেশ্যে আর কতগুলো ভুয়া আইডি ব্যবহার করছিলেন।
তানভীর হাসান জোহা বলেন, ‘উনি মেসেজগুলো সব ডিলিট করে ফেলেছেন। এটা একটা খুবই রহস্যময় ব্যাপার। ফেক আইডির সঙ্গে যোগাযোগ হলেও-বা উনি ডিলিট করবেন কেন? আমরা ওই আইডির সঙ্গে যোগাযোগটা জুলাইয়ের পর পেয়েছি। সেক্ষেতে উনি জুলাই-আগস্টের পর দেশে ঢুকেছেন কি না, ওই ডিভাইস অ্যাকটিভ হয়েছে জুলাই-আগস্টের পর। ওনার সঙ্গে মেসেঞ্জারে আসলে আওয়ামী সমর্থিত বেশ কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের যোগাযোগের তথ্য পেয়েছি।’
মেজর মোজাফফরের এই ডিজিটাল যোগাযোগ জিয়াউর রহমান হত্যার পুরনো নথি ও পেছনের চক্রান্তকারীদের ওপর এক নতুন আলোকপাত করছে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা একটি বড় প্রশ্ন— জিয়া হত্যার পর নেপথ্যের সুবিধাভোগী বা মাস্টারমাইন্ড কারা ছিলো এবং সেই পরিকল্পনার রেশ ধরে মোজাফফরদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়া হয়েছিলো কি-না?
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মো. সরওয়ার বলেন, ‘ডিজিটাল ফরেন্সিক বলা যায় যে, বর্তমান সময়ে অপরাধ শনাক্তকরণে এবং প্রমাণে সবচেয়ে আধুনিক টুলস। এক্সপার্ট অপিনিয়ন দেয়ার ক্ষমতা আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট কয়েকটি সংস্থার আছে। ওইসব সংস্থা থেকে এক্সপার্ট অপিনিয়ন এনে ডিজিটাল ফরেন্সিক করে সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে যদি মামলাগুলো পরিচালনা করা হয়, তাহলে অপরাধীরা দ্রুত শনাক্ত হবে। এক্ষেত্রে অপরাধীরা ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ থেকে বিরত থাকবে।’
ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার এক হত্যাকাণ্ডের রহস্য যখন ৪৫ বছর ধরে ধামাচাপা ছিল, তখন সিলিকন ভ্যালির সার্ভারে জমে থাকা কয়েকটি ‘আইপি ঠিকানা’ ও ‘মুছে ফেলা বার্তা’ হয়তো খুলে দিতে যাচ্ছে শেখ হাসিনা সরকারের আমল এবং জিয়া হত্যা—উভয় ইতিহাসের সবচেয়ে বড় গোপন দরজাটি। টেক জায়ান্ট মেটার কাছ থেকে তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে আসা সেই তথ্যের অপেক্ষায় এখন পুরো দেশ।
