
নিজস্ব প্রতিবেদক | বুধবার, ০৮ এপ্রিল ২০২৬ | প্রিন্ট | ৫৩ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

জ্বালানি সংকটের মধ্যে বিদ্যুতের ব্যবহার কমিয়ে আনতে সরকার সন্ধ্যা ৭টায় ওষুধ ও অত্যাবশ্যকীয় পণ্য ছাড়া অন্যান্য দোকান বন্ধের বাধ্যবাধকতা আরোপ করায় বৈদ্যুতিক ও পোশাকসহ অন্য পণ্যের বেচাকেনা ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে বলে ধারণা দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
দিনের বেলা ঢাকার বিভিন্ন পাইকারি বাজারে কেনাবেচা ঠিক থাকলেও বিপাকে পড়তে হচ্ছে কুরিয়ারে পণ্য পাঠানো নিয়ে। একই সঙ্গে সন্ধ্যায় হিসাব চূড়ান্ত ও বকেয়া আদায় নিয়েও নতুন সমস্যায় পড়েছেন দোকানিরা।
ক্রেতারা বলছেন, গরমে দিনের বেলা কিনতে আসাটা কষ্টের। সাংসারিক ও অফিসের কাজ শেষে সন্ধ্যায় বাজারে আসার অতীত অভিজ্ঞতা বদলাতেও সময় লাগবে।
তারা বলছেন, সকালে তিন ঘণ্টা পিছিয়ে যদি দুপুর ১২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখার সময় নির্ধারণ করা যায়, তাহলে বেচাকেনায় সুবিধা।
দোকানিরাও চাচ্ছেন, বিদ্যুতের চাহিদা বিশ্লেষণ করে দিনের বেলা বন্ধের সময় বাড়িয়ে রাতে দোকান খোলা রাখার বিষয়টি সরকার পুর্নর্বিবেচনা করুক।
ইরান যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে যে সংঘাত পরিস্থিতি চলতে তাতে জ্বালানি সরবরাহে চাপে থাকায় সরকার গেল বৃহস্পতিবার জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সরকার একগুচ্ছ সিদ্ধান্ত নেয়।
সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সরকারি ও বেসরকারি অফিসের সময় সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ঠিক করা হয়। পাশাপাশি দোকান, মার্কেট ও শপিংমল সন্ধ্যা ৬টার পর বন্ধ রাখার কথা বলা হয়।
তবে গেল রোববার সন্ধ্যা ৬টার পরিবর্তে ৭টা পর্যন্ত দোকান, মার্কেট ও শপিংমল খোলার রাখার সরকারি সিদ্ধান্তের কথা জানান জ্বালানি ও বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। দোকান মালিক সমিতির আবেদন পুনর্বিবেচনা করে নতুন এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সরকারের এই সিদ্ধান্ত কার্যকরের পর খুচরা পর্যায়ে বেচাকেনা কমার কথা বলেছেন ঢাকার বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীরা।
কাপ্তানবাজারের বড় বৈদ্যুতিক পণ্যের দোকান রাইয়ান ইলেকট্রিকের স্বত্বাধিকারী রমজান আলী বলেন, “অফিস শেষে খুচরা ক্রেতারা আসে। একটা লাইট চেক করে দামাদামি করতেই চলে যায় ১০-১৫ মিনিট। কয়েকটা কোম্পানি দেখানোর পর একটা নেয়।
“এখন তো সন্ধ্যা ৭টায় দোকান বন্ধ করায় ক্রেতা আসছে না। বিক্রির সময়ে দোকানে তালা মারতে হয়। ঈদের পর এমনিতে বিক্রি কম, তারওপরও এই সংকটে বিক্রি কমে গেছে ২০ শতাংশের মতো।’’
ঢাকার পাইকারি বাজারগুলোতে দিনের বেলা বিক্রি হয়। সেই পণ্য কুরিয়ারে পাঠানো, পাইকারি ক্রেতার কাছ থেকে বকেয়া টাকা উঠানোর সময় হচ্ছে সন্ধ্যার পর থেকে।
দিনের বকেয়া টাকা আদায়ের পর হিসাব শেষ করতে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত লেগে যায় বলছেন কাপ্তানবাজারের সেলিম ইলেকট্রনিক্সের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ সেলিম।
তিনি বলেন, “আমি পাইকারি বিক্রি করি। পাইকাররা আসেই দুপুরের পর। অনেকে মাল কিনে রেখে যায়, সন্ধ্যার পরে তা কুরিয়ারে পাঠাতে হয়। এখন তো কুরিয়ার পরের দিন চলে যাচ্ছে।
“আরেকটি সমস্যা হচ্ছে, আমরা ব্যবসায়ীরা প্রতিদিন আরেক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে মাল কেনাবেচা করি বাকিতে। সন্ধ্যার পরে সেই টাকা পরিশোধ ও বাকি দেওয়া টাকা আদায় করি। এখন তো সন্ধ্যার পর দোকান বন্ধ, এখানেই সমস্যা হচ্ছে। কালেকশন করা যাচ্ছে না।’’
শপিং মলে দিনে ও রাতে একই পরিমাণ বিদ্যুতের ব্যবহার হয় দাবি করে মো. সেলিম বলেন, সকালে আরো পরে দোকান খুলে দেরিতে বন্ধ করার সুযোগ দেওয়া হলে বেচাকেনার এই সমস্যা থাকবে না।
“সময় ঠিক না হওয়ায় বিক্রি ১০ শতাংশ নাই হয়ে গেছে। সময় লাগবে বিক্রি বাড়াতে। কিন্তু লোকসান তো হলো।” গুলিস্তানে টি-শার্ট, জুতা ও কাপড়ের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজারের একটি ঢাকা ট্রেড মার্কেট।
এই মার্কেটের জুতার পাইকারি বিক্রেতা মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, “সরকারি আইন তো মানতে হবে। এখন আমরা দিনের বেলা কাস্টমার পেলে তো সমস্যা নাই। সরকার যদি আরো প্রচার করে, পাইকাররা যদি দিনেই কিনে চলে যেতে পারে, তাহলে কোনো সমস্যা হবে না। কিন্তু পাইকাররা তো সেটা পারছে না।”
সন্ধ্যায় দোকান বন্ধ হওয়ায় বিক্রি স্বাভাবিকের চেয়ে ২০ শতাংশ কমেছে বলে দাবি করেন কাপ্তানবাজারের চাঁদপুর হার্ডওয়্যারের মালিক মোহসিন মিজি।
তিনি বলেন, “মানুষ বাসায় যাওয়ার সময়ে কেনাকাটা করে যায়। নবাবপুরের দোকান বন্ধ হয় ৭টায়। এখন যাওয়ার সময়ে দেখে, আমার দোকানও বন্ধ, লোকটা কিনবে কখন?” একই অভিজ্ঞতা রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত শপিং মল মৌচাক মার্কেটের ক্রেতা-বিক্রেতাদের।
সন্ধ্যা ৭টার সময়ে সরকারি আদেশ মেনে মার্কেটের প্রধান প্রবেশ ফটক বন্ধ করে দেন নিরাপত্তা প্রহরী রফিকুল ইসলাম। তারপরও বন্ধের সময়ে অনেকে অনুরোধ করেন বের হওয়ার সুযোগ দিতে। ফলে তাদের বিকল্প পথ দিয়ে বের করে দিতে প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে চলে যান আরেক ফটকে।
মার্কেটের শোভন গার্মেন্টসের স্বত্বাধিকারী তোফাজ্জল হোসেন বলেন, “মার্কেট কর্তৃপক্ষ একটা-একটা করে বাতি বন্ধ করে দেয়। কিন্তু আমাদের তো বিক্রি করতে হবে। কাস্টমারকে তো বাহির করে দিতে পারি না।”
বিকালের বাড়তি ভিড় সামাল দেওয়া ও সারা দিনের বিক্রির হিসাব মেলানোর পরই দোকান বন্ধ করে বাসায় ফেরেন আসমা ফ্যাশনের পরিচালক ওয়াজেদ হোসেন।
তিনি বলেন, সন্ধ্যার সময় দোকান বন্ধ করলেও হিসাব মিলাতে এক ঘণ্টা লাগে। সরকার যদি মার্কেট দিনে বন্ধ রেখে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা রাখতে দেয়, তাহলে সুবিধা।
“কাস্টমার তো বিকেল থেকে আসতে থাকে। আমার কাপড়ের দোকান। ঈদের পর এমনিতে বিক্রি কম। এখন তো আরো কম হচ্ছে।”
নতুন সময়ে দোকান বন্ধ করা হলেও ক্রেতারা এখনো সচেতন নন বলে মনে করেন মৌচাক মার্কেটের অলংকার বিক্রেতা আব্দুর রশিদ।
তিনি বলেন, “মেয়েরা ঝকমকে জিনিস পছন্দ করে। দিনের বেলা তো গহনাগুলো ঝলমল করে না। রাতে আলো জ্বালালে চিকচিক করে। এখন সন্ধ্যায় দোকান বন্ধ করলে তো তারা আসবে না। এই কয়দিনে বিক্রি ৩০ শতাংশ কমে গেছে।”
