
নিজস্ব প্রতিবেদক | মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬ | প্রিন্ট | ১৮ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

শেরপুর পৌরসভার নবীনগর এলাকায় প্রতি বছরই অনুষ্ঠিত হয় গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী পৌষ মেলা। ২০০ বছরের অধিক সময় ধরে মেলাটি পৌষ সংক্রান্তিতে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। গত কয়েক বছর ধরে বোরো আবাদের জন্য পৌষ সংক্রান্তির আগেই অনুষ্ঠিত হতে দেখা যায়। তবে এই মেলার রয়েছে অজানা কাহিনি।
জনশ্রুতি আছে, ২০০ বছরের অধিক সময় ধরে নবীনগর এলাকায় তিন একর জমি নিয়ে গড়ে ওঠে ছাওয়াল পীরের একটি দরগা। এই দরগাকেই কেন্দ্র করে সেখানে শুরু হয় ঐতিহ্যবাহী পৌষ মেলা।
মেলাটি কখন কীভাবে শুরু হলো এটার উত্তর খুঁজতে গিয়ে নবীনগর এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা আইনজীবী ও সাংবাদিক ফকির আকতারুজ্জামানের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার বয়স ৮০ বছর। নির্দিষ্ট করে জানি না কখন কীভাবে এই মেলা শুরু হয়েছে। পূর্ব-পুরুষরা পালন করতেন, এজন্য আমরাও করছি। তবে ছাওয়াল পীরের আগমন ঘিরে এই মেলা শুরু হয়েছিল বলে অনেকের মুখে শোনা যায়।’
ছাওয়াল পীর সম্পর্কে ফকির আকতারুজ্জামান বলেন, ‘ছাওয়াল পীর নবীনগর এলাকার বাসিন্দা নন। তিনি ঈশ্বরগঞ্জের বাসিন্দা এবং সেখানে মারা যান। সেখান থেকে লাশটা তার কয়েকজন অনুসারী এখানে নিয়ে আসেন। তারা বলেছিলেন, এমন জায়গায় কবর হবে, যেটি উত্তর-দক্ষিণে হবে না। কিন্তু আমাদের এখানকার লোকজন জানতেন, মুসলমানের কবর উত্তর-দক্ষিণেই হবে। তারা বিকল্পভাবে কবর দেওয়ার বহু জায়গায় চেষ্টা করেন। কিন্তু কবর দিতে পারেননি। এরকম করতে করতে নবীনগর এলাকায় নিয়ে আসেন। এখানে আসার পর তারা উত্তর-দক্ষিণ দিক করে কবর খুঁড়েন। কিন্তু কবরটির চার পাশের মাটি পড়ে যাচ্ছিল। তখন তারা বললেন, উত্তর-দক্ষিণ দিক করে চেষ্টা করেছি, কিন্তু হয়নি। তাহলে পূর্ব-পশ্চিম করি। তখন আর মাটি ভেঙে পড়েনি। কবর দেওয়া হয়ে গেলো। পরবর্তী সময়ে সেখানেই পৌষ মেলা শুরু হলো।’
নবীনগর এলাকার বাসিন্দা শেরপুর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের লাইব্রেরিয়ান মো. শহীদুজ্জমান শহীদ বলেন, ‘দাদির কাছে শুনেছি ছাওয়াল পীরের কবরের কাছাকাছি জমিতে এক কৃষক গরুর হাল দিয়ে মই দিচ্ছিলেন। এ সময় বারবার মইয়ের রশি ছিঁড়ে যাচ্ছিল। তখন মানত করলেন মইয়ের রশি যদি আর না ছিঁড়ে তাহলে পীরের মাজারে শিন্নি দেবেন। এরপর আর কৃষকের রশি ছিঁড়ে নাই। মই শেষ করে বাড়ি চলে যান। এরপর একমাস হয়ে গেলেও মানত পূরণের কথা তার মনে পড়েনি। একদিন কৃষক স্বপ্নে দেখেন ছাওয়াল পীর তাকে বলছেন, দেখ আমার হাতে ফোসকা পড়ে গেছে। কৃষক জানতে চান কেন ফোসকা পড়েছে। পীর বললেন, তোমার মইয়ের রশি ধরে রাখছিলাম বলে ফোসকা পড়েছে। তখন কৃষকের মনে হলো, আমি তো মানত করা শিন্নি দিইনি। পরদিন শিন্নি দেন। তখন থেকে দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল নিয়ে এসে মানত করতেন। তাদের চাওয়া পূরণ হতো। এভাবেই ছাওয়াল পীরের দরগার পাশে মেলা শুরু হয়। মেলাটি যেহেতু পৌষ সংক্রান্তিতে হয় তাই সবার কাছে পৌষ মেলা নামে পরিচিত।’
বর্তমানে ছাওয়াল পীরের দরগার পাশেই রোয়া বিলের তীরে বড় পরিসরে পৌষ মেলা হয়। মেলায় গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী মুখরোচক খাবার মুড়ি-মুড়কি, মোয়া, সাজ, নিমকি, গজা, খোরমা, বাদাম, কটকটি, তিলের খাজা, কলাই, চানাচুরসহ নানা ধরনের খাবারের পসরা নিয়ে বসেন দোকানিরা। পাশের পালপাড়া এলাকার মৃৎশিল্পীদের হাতে তৈরি বিভিন্ন ধরনের খেলনা ও তৈজস ছাড়াও শিশুদের বিভিন্ন খেলনা, নারীদের প্রসাধনী ও চুড়ি-মালার দোকানও বসে। পৌষ মেলাকে কেন্দ্র করে শেরপুর শহরসহ এর আশপাশের এলাকা থেকে নারী-পুরুষ, তরুণ-তরুণী, শিশু-কিশোরসহ নানা বয়সের হাজারো মানুষের ঢল নামে।
পৌষ মেলার প্রধান আকর্ষণ ছিল ঘোড়দৌড় ও গাঙ্গি খেলা। আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে আসেন ঘোড়সওয়াররা।
আইনজীবী ফকির আকতারুজ্জামান বলেন, ‘পৌষ মেলাটা আমাদের কাছে উৎসব। এজন্য অধীর আগ্রহে আমরা অপেক্ষা করি। বাড়ি বাড়ি উৎসবের আমেজ বিরাজ করে। আত্মীয়-স্বজনে পুরো এলাকা মুখর থাকে। তবে এখন আর আগের মতো আনন্দ নেই। পূর্ব-পুরুষদের রেওয়াজ ধরে রাখার জন্যই যখন যে দল ক্ষমতায় আসে তারাই এই উৎসবের আয়োজন করে থাকে। মেলা আয়োজক কমিটি থাকলে সবচেয়ে ভালো হতো।’
