রবিবার ২৪শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১০ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

Advertise with us

জমে উঠছে কোরবানির পশুর হাট, খাদ্য-পরিবহনে বাড়তি খরচ

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   শনিবার, ২৩ মে ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ২১ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

জমে উঠছে কোরবানির পশুর হাট, খাদ্য-পরিবহনে বাড়তি খরচ

আসন্ন ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে রাজধানীর পশুর হাটগুলোয় ক্রেতা-বিক্রেতাদের আনাগোনা বাড়তে শুরু করেছে। কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, পাবনা, নাটোর, সিরাজগঞ্জ, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ট্রাকভর্তি গরু-মহিষ নিয়ে হাটে আসছেন খামারি ও ব্যাপারীরা। তবে এবার কোরবানির বাজারে স্বস্তির চেয়ে দুশ্চিন্তাই বেশি। পশুখাদ্য, পরিবহন ও আনুষঙ্গিক খরচ অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় গত বছরের তুলনায় গরুর দাম ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে জানান বিক্রেতারা।

গতকাল শুক্রবার রাজধানীর উত্তরা দিয়াবাড়ী ও গাবতলী পশুর হাট ঘুরে দেখা যায়, বাজারে এখনো পুরোপুরি বেচাকেনা শুরু না হলেও ক্রেতাদের উপস্থিতি বাড়ছে। বিক্রেতারা বলছেন, এখনো দর্শনার্থী বেশি, প্রকৃত ক্রেতা কম। অন্যদিকে ক্রেতারা দাম শুনে কিছুটা দ্বিধায় থাকলেও মাঝারি বাজেটের গরুর প্রতি আগ্রহ বেশি দেখা যাচ্ছে।

উত্তরা হাটে অব্যবস্থাপনার অভিযোগ

উত্তরা দিয়াবাড়ী পশুর হাটে গিয়ে দেখা যায়, এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত হয়নি হাটটি। পানি সংকট, শেডের ঘাটতি, কাদা-পানি ও অতিরিক্ত খরচ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন খামারিরা।

রাজশাহীর বাঘা থেকে ১৯টি গরু নিয়ে আসা সাদ্দাম শেখ বলেন, হাটে ঠিকমতো পানি পাওয়া যাচ্ছে না। গরুকে পানি খাওয়ানো ও পরিষ্কার রাখা কঠিন হয়ে গেছে। পাবনার আতাইকুলা থেকে আসা মামুন মণ্ডলও একই অভিযোগ করেন। তিনি জানান, হাটের ভেতরে পানির ব্যবস্থা থাকলেও তা পর্যাপ্ত নয়। ফলে অনেক দূর থেকে কষ্ট করে পানি বয়ে আনতে হচ্ছে।

বৃষ্টিতে ভিজছে গরু

হাটের অব্যবস্থাপনার অন্যতম বড় উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে গরুর থাকার জায়গার অভাব এবং শেড সংকট। চুয়াডাঙ্গা থেকে আসা আব্দুর রশিদ বলেন, শুধু বাঁশ পুঁতে রাখা হয়েছে, কিন্তু এখনো শেড তৈরি হয়নি। বৃষ্টি হলেই গরু ভিজে যাচ্ছে। খামারিরা নিজেদের উদ্যোগে ত্রিপল দিয়ে চেষ্টা করলেও তা মুষলধারে বৃষ্টির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য পর্যাপ্ত নয়। কুষ্টিয়া থেকে আসা মোহাম্মদ ফিরোজ জানান, যথাসময়ে শেড ঠিক না করায় তার গরুগুলো বৃষ্টিতে ভিজেছে এবং অসুস্থ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

কাদা এড়াতে নিজ খরচে বালু

বৃষ্টির কারণে পশুদের কষ্ট হওয়ায় খামারিদের অনেকেই নিজ খরচে বালু কিনে ফেলছেন। কুষ্টিয়ার নাসির উদ্দীন জানান, দুই হাজার ৩০০ টাকা দিয়ে বালু কিনেছেন তিনি। সিরাজগঞ্জের আব্দুল হালিম বলেন, ১১টি গরুর জন্য দুই ট্রাক বালু কিনতে পাঁচ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। খামারিদের অভিযোগ, হাট কর্তৃপক্ষের এসব ব্যবস্থাপনা করার কথা থাকলেও তাদেরই বাড়তি খরচ বহন করতে হচ্ছে।

পছন্দমতো জায়গা নিতে লাগছে টাকা

হাটে গরু রাখার জায়গা নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ। বিক্রেতাদের দাবি, পছন্দমতো জায়গা নিতে অতিরিক্ত টাকা দিতে হচ্ছে। কুষ্টিয়ার নাসির উদ্দীন বলেন, গরু রাখার একটু ভালো জায়গার জন্য এক হাজার টাকা দিতে হয়েছে। আবার শেডের নিচে গরু রাখতে গরুপ্রতি এক থেকে দেড় হাজার টাকা দাবি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন কয়েকজন বিক্রেতা।

পিকআপ স্টিকারে পাঁচ হাজার টাকা!

হাটের অভ্যন্তরীণ পরিবহন ব্যবস্থাতেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। পিকআপ গাড়ির জন্য পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে স্টিকার নিতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কয়েকজন চালক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি। পরিবহন সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরা বিষয়টি অস্বীকার করলেও হাটে থাকা কয়েকজন চালক জানিয়েছেন, স্টিকার ছাড়া গাড়ি প্রবেশ বা অবস্থান কঠিন হয়ে পড়ছে। প্রায় ১৫-২০টি গাড়ি এমন রেজিস্ট্রেশন করেছে বলে জানা গেছে। এই অতিরিক্ত খরচ পরোক্ষভাবে পশুর দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে।

অব্যবস্থাপনা বিষয়ে উত্তরা ডিয়াবাড়ি হাটের ইজারাদার এস এফ কর্পোরেশনের স্বত্বাধিকারী ও ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মো. শেখ ফরিদ আমার দেশকে বলেন, ‘আপনি যেসব অব্যবস্থাপনার কথা বলেছেন, এসব অলমোস্ট ওভারকাম করার ট্রাই করতেছি রাতের মধ্যেই। আপনি এখন এলে দেখবেন অনেকটাই সমাধান হয়ে গেছে। আর গরুর হাট তো, সব নন-এডুকেটেড পার্সন। সবই করা যায় না। তবে আগামীকালকের মধ্যে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ।’

বাড়ছে পশুখাদ্য ও পরিবহন খরচ

খামারিদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা পশুখাদ্যের দাম। রাজশাহীর সাদ্দাম শেখ বলেন, গত বছর যে ভুসি এক হাজার ৬০০ টাকায় কিনেছি, এবার তা দুই হাজার টাকা।

সিরাজগঞ্জের আব্দুল হালিম জানান, ছোলা, গম ও খড়ের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। তার ভাষায়, যে ছোলা আগে দুই হাজার ৮০০ টাকা ছিল, এখন চার হাজার টাকা। গম এক হাজার ৭০০ টাকা থেকে বেড়ে দুই হাজার ২০০ টাকা হয়েছে। এর সঙ্গে বেড়েছে ট্রাক ভাড়াও। গত বছর ২২ থেকে ২৮ হাজার টাকায় গরু পরিবহন করা গেলেও এবার সেই ভাড়া বেড়ে ২৬ থেকে ৩২ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। খামারিদের মতে, এই বাড়তি খরচ পুষিয়ে নিতে হলে প্রতিটি গরুর দাম গতবারের চেয়ে অন্তত ২০ শতাংশ বেশি হতে হবে, নতুবা তাদের সারা বছরের পরিশ্রমের পোষাবে না।

বাজারে মিলছে ভারতীয় গরু

এবারের বাজারে ভারতীয় জাতের কিছু গরুও দেখা যাচ্ছে। তবে এগুলো নতুন আমদানি নয় বলে জানান বিক্রেতারা। কয়েক মাস আগে দেশের বিভিন্ন হাট থেকে কিনে এনে লালন-পালনের পর এবার কোরবানির বাজারে তোলা হয়েছে।

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর থেকে আসা আব্দুল হালিম বলেন, ৯ মাস আগে রাজশাহী সিটি হাট থেকে দুটি ভারতীয় গরু কিনেছিলাম। এখন বিক্রির জন্য এনেছি। নাটোরের সুলতান জানান, তিনি সাত থেকে আট মাস আগে ভারতীয় গরু কিনে পালন করেছেন। এখন সামান্য লাভ হলেই বিক্রি করে দিতে চান।

গাবতলীতে এখনো পুরোপুরি জমেনি বাজার

রাজধানীর সবচেয়ে বড় পশুর হাট গাবতলীতেও এখনো পুরোপুরি জমেনি কোরবানির বাজার। গতকাল দুপুর পর্যন্ত হাটের অর্ধেক জায়গাও পূর্ণ হয়নি। তবে মাঝারি দামের গরুর প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ বেশি দেখা গেছে।

৭০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকার গরুগুলোর সামনে তুলনামূলক বেশি ভিড় লক্ষ করা গেছে। অন্যদিকে ১০ থেকে ২৫ লাখ টাকার বিশাল গরু ও মহিষ ঘিরে দর্শনার্থীদের কৌতূহল ছিল চোখে পড়ার মতো। তবে কাঙ্ক্ষিত ক্রেতার দেখা মেলেনি।

নজর কাড়ছে ‘নবাব’ ও হেভিওয়েট গরু

গাবতলীর অন্যতম আকর্ষণ কুষ্টিয়া থেকে আনা বিশালাকৃতির গরু ‘নবাব’। এর দাম হাঁকা হয়েছে ১৩ লাখ টাকা। এছাড়া কেরানীগঞ্জ থেকে আনা ব্রাহামা জাতের একটি গরুর দাম চাওয়া হচ্ছে প্রায় ২০ লাখ টাকা। জামালপুর থেকে আনা আরও কয়েকটি হেভিওয়েট গরুর দাম রাখা হয়েছে ১৫ লাখ টাকার বেশি। এছাড়া ভারতীয় জাতের বড় মহিষও দর্শনার্থীদের নজর কাড়ছে। এক বিক্রেতা তার মহিষের সঙ্গে একটি গরু ‘ফ্রি’ দেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছেন।

নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, রাতে পশু পাহারা, ট্রাক আনলোড ও নগদ টাকা বহন নিয়ে তাদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। যদিও এখন পর্যন্ত বড় ধরনের চাঁদাবাজি বা অপ্রীতিকর ঘটনার অভিযোগ পাওয়া যায়নি।

হাটে টাকা লেনদেন সহজ করতে কয়েকটি ব্যাংক অস্থায়ী বুথ বসিয়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পশুর হাটে কোনো ধরনের চাঁদাবাজি সহ্য করা হবে না এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

হাট সংশ্লিষ্টদের ধারণা, আগামী সোমবার থেকে কোরবানির বাজার পুরোপুরি জমে উঠবে। তখন ঢাকাবাসীর বড় অংশ পশু কিনতে হাটমুখী হবে। এরই মধ্যে ভালো জায়গা দখল ও ক্রেতার নজর কাড়তে ব্যবসায়ীদের মধ্যে নীরব প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে।

Facebook Comments Box
Advertise with us

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

Advertise with us
Advertise with us

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

রবিসোমমঙ্গলবুধবৃহশুক্রশনি
 
১০১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭৩০
৩১ 

ফলো করুন দেশবার্তা-এর খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক
মো: সামসুদ্দীন চৌধুরী
সম্পাদকীয় কার্যালয়