বুধবার ১৩ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩০শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>
Advertise with us

২৮৮ কোটি টাকার লোকসানে ইসলামী ব্যাংক, সামনে বড় সংকটের শঙ্কা

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   বুধবার, ১৩ মে ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ২ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

২৮৮ কোটি টাকার লোকসানে ইসলামী ব্যাংক, সামনে বড় সংকটের শঙ্কা

দেশের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক পিএলসি ভয়াবহ আর্থিক চাপে পড়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে ব্যাংকটি ২৮৮ কোটি টাকা লোকসান গুনেছে। একইসঙ্গে খেলাপি ঋণ, প্রভিশন ঘাটতি ও মূলধন সংকট—সব মিলিয়ে ব্যাংকটির আর্থিক ভিত্তি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ব্যাংকটির প্রকাশিত প্রাইস সেনসিটিভ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে সমন্বিত শেয়ারপ্রতি লোকসান (ইপিএস) দাঁড়িয়েছে এক টাকা ৭৯ পয়সা।

ইসলামী ব্যাংক বলছে, বিনিয়োগ বা ঋণ থেকে আয় কমে যাওয়া, আমানতের বিপরীতে ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং খেলাপি ঋণের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি—এই তিন কারণেই ব্যাংকটি বড় ধরনের লোকসানে পড়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই লোকসান কেবল একটি প্রান্তিকের দুর্বল পারফরম্যান্স নয় বরং, দীর্ঘদিনের অনিয়ম, গোপন ঋণ এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনার জমে থাকা প্রভাব এখন দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।

খেলাপি ঋণে রেকর্ড

ব্যাংকটির সর্বশেষ নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সাল শেষে ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৪ হাজার ৩২২ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে যা বেড়েছে প্রায় ৪৪ শতাংশ। বর্তমানে ব্যাংকটির মোট বিনিয়োগের ৫১ শতাংশই খেলাপি, যা দেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে একক কোনও ব্যাংকের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ১৭ শতাংশই এখন ইসলামী ব্যাংকের দখলে। অর্থাৎ, দেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকির বড় অংশ বহন করছে ব্যাংকটি একাই।

ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগের ব্যবস্থাপনার সময়ে এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিপুল পরিমাণ ঋণ প্রকৃত অবস্থার তুলনায় কম দেখানো হয়েছিল। নতুন ব্যবস্থাপনা দায়িত্ব নেওয়ার পর ধীরে ধীরে প্রকৃত চিত্র প্রকাশ পাচ্ছে।

প্রভিশন ঘাটতি ৮৪ হাজার কোটি টাকা

ব্যাংকটির অডিট রিপোর্টে আরও উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, মন্দ ঋণের বিপরীতে ইসলামী ব্যাংকের ৯২ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকা সঞ্চিতি বা প্রভিশন রাখার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু, বাস্তবে রাখা হয়েছে মাত্র সাত হাজার ৯২২ কোটি টাকা। ফলে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৮৪ হাজার ৬১৫ কোটি টাকা।

নিরীক্ষকদের মতে, এই ঘাটতি পূর্ণাঙ্গভাবে সমন্বয় করা হলে ব্যাংকটির প্রকৃত আর্থিক অবস্থা আরও ভয়াবহ আকারে সামনে আসতো। এমনকি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত ছাড় না থাকলে ২০২৫ সালে ইসলামী ব্যাংকের লোকসান ৮৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেত।

অডিট রিপোর্টে ব্যাংকটির আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে ‘কোয়ালিফাইড ওপিনিয়ন’ দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে সতর্ক করা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ সহায়তা অব্যাহত না থাকলে ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

মূলধন সংকট আরও গভীর

নিয়ম অনুযায়ী ইসলামী ব্যাংকের ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে প্রায় ১৯ হাজার ২০০ কোটি টাকা মূলধন থাকার কথা। কিন্তু, বর্তমানে ব্যাংকটির রিপোর্ট করা মূলধন রয়েছে মাত্র ৯ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা। দৃশ্যমান ঘাটতি ৯ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা হলেও, প্রভিশন ঘাটতি পূর্ণ বিবেচনায় নিলে প্রকৃত মূলধন ঘাটতি প্রায় ৯৪ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে মনে করছেন নিরীক্ষকরা।

এছাড়া ব্যাংকটির মূলধন পর্যাপ্ততার হার (সিআরএআর) নেমে এসেছে ছয় দশমিক ৪২ শতাংশে, যেখানে নিয়মানুযায়ী ন্যূনতম ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ থাকার কথা।

এস আলম গ্রুপের ঋণই বড় ঝুঁকি

ব্যাংকটির আর্থিক সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে এস আলম গ্রুপের বিপুল ঋণ। অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী, গ্রুপটির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে ইসলামী ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকা আটকে আছে। এর মধ্যে এস আলম স্টিলস ও রিফাইনড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজের ঋণ ১০ হাজার ৩৯৪ কোটি টাকা, এস আলম ভেজিটেবল অয়েলের ঋণ ১৪ হাজার ৮৯৯ কোটি টাকা এবং এস আলম সুপার এডিবল অয়েলের ঋণ ১২ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে এস আলম গ্রুপ সংশ্লিষ্ট প্রায় ৮৩ শতাংশ শেয়ার বাজেয়াপ্ত করেছে।

শেয়ারবাজারেও নেতিবাচক প্রভাব

টানা দ্বিতীয় বছরের মতো লভ্যাংশ দিতে ব্যর্থ হওয়ায় ইসলামী ব্যাংককে পুঁজিবাজারে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিনিয়োগকারীদের আস্থাও তলানিতে নেমেছে।

বর্তমানে ব্যাংকটির শেয়ার দর ফ্লোর প্রাইসে আটকে রয়েছে। একইসঙ্গে ২০২৫ সালে ব্যাংকটির নিট বিনিয়োগ আয়ও আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ কমে এক হাজার ৮৪৭ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান সংকট শুধু একটি ব্যাংকের সংকট নয়; এটি দেশের ব্যাংকিং খাতের দুর্বল সুশাসন, রাজনৈতিক প্রভাব ও অনিয়ন্ত্রিত ঋণ বিতরণের বড় উদাহরণ হয়ে উঠেছে। এখন ব্যাংকটিকে টিকিয়ে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তার পাশাপাশি কার্যকর পুনর্গঠন, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারে কঠোর পদক্ষেপ জরুরি হয়ে পড়েছে।

Facebook Comments Box
Advertise with us
Advertise with us
Advertise with us

ফলো করুন দেশবার্তা-এর খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক
মো: সামসুদ্দীন চৌধুরী
সম্পাদকীয় কার্যালয়