সোমবার ২২শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৮ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

Advertise with us

দেউলিয়া ৫ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ছোট আমানতকারীদের জন্য বড় সুখবর

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   সোমবার, ২২ জুন ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ১৭ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

দেউলিয়া ৫ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ছোট আমানতকারীদের জন্য বড় সুখবর

দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে হাজার হাজার আমানতকারীর কাছে আতঙ্কের নাম হয়ে আছে দেশের কয়েকটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই)। মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও টাকা ফেরত না পাওয়া, প্রতিষ্ঠানগুলোর সামনে বিক্ষোভ, আদালত ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার দ্বারে দ্বারে ঘোরাঘুরি; সব মিলিয়ে বহু পরিবার আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটিয়েছে। অবশেষে সেই সংকট নিরসনে বড় পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কার্যত দেউলিয়া হয়ে পড়া পাঁচটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগ করে ধাপে ধাপে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া হবে। প্রথম পর্যায়ে ব্যক্তি আমানতকারীদের সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই অর্থের জোগান আসবে সরকারি তহবিল থেকে, অর্থাৎ জনগণের করের অর্থ ব্যবহার করে ক্ষতিগ্রস্ত আমানতকারীদের স্বস্তি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র বলছে, প্রশাসক নিয়োগের পর প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থা মূল্যায়ন করে অবসায়ন বা লিকুইডেশনের প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। একই সঙ্গে ছোট আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার কাজও শুরু হবে। এর জন্য সরকারের নীতিগত সম্মতি ইতোমধ্যে পাওয়া গেছে এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটেও প্রয়োজনীয় বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

কোন পাঁচ প্রতিষ্ঠান বন্ধের পথে

যেসব আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে অবসায়নের আওতায় আনার প্রস্তুতি চলছে, সেগুলো হলো এফএএস ফাইন্যান্স, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, আভিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এই পাঁচ প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২৭ হাজার ব্যক্তি আমানতকারীর মোট জমা রয়েছে প্রায় ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। বছরের পর বছর ধরে এসব আমানতকারীর বড় অংশই নিজেদের অর্থ ফেরত পাননি।

প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক অবস্থার চিত্র আরও ভয়াবহ। গত ডিসেম্বর শেষে এফএএস ফাইন্যান্সের খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ। ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের ৯৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ, ফারইস্ট ফাইন্যান্সের ৯৮ দশমিক ৫০ শতাংশ, পিপলস লিজিংয়ের প্রায় ৯৫ শতাংশ এবং আভিভা ফাইন্যান্সের ৯৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ ঋণ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায় পুরো ঋণপোর্টফোলিওই অকার্যকর হয়ে গেছে।

কীভাবে ফেরত দেওয়া হবে আমানতের টাকা

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রশাসক নিয়োগের পর প্রথম ধাপে ব্যক্তি আমানতকারীদের মধ্যে যাদের জমার পরিমাণ ১০ লাখ টাকা বা তার কম, তাদের অর্থ পরিশোধ করা হবে। এতে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন ক্ষুদ্র ও মধ্যম আয়ের আমানতকারীরা, যাদের অনেকেই সঞ্চয়ের পুরো অর্থ এসব প্রতিষ্ঠানে রেখেছিলেন। তবে ১০ লাখ টাকার বেশি জমা রাখা ব্যক্তিরা অর্থাৎ বড় ব্যক্তি আমানতকারী ইচ্ছে করলে ক্ষুদ্র ও মধ্যম আমানতকারীদের সঙ্গে প্রথমে ১০ লাখ টাকা নিতে পারবেন। ধারণা করা হচ্ছে সবাইকে ১০ লাখ টাকা দেওয়ার কিছু দিন পরে বাকী টাকা কিভাবে দেওয়া হবে সেটা নিয়ে নতুন করে সিদ্ধান্ত নেবে বাংলাদেশ ব্যাংক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা মনে করছেন, সীমিত সম্পদ ও বিপুল দায়ের মধ্যে প্রথমে ছোট আমানতকারীদের সুরক্ষা দেওয়া সবচেয়ে জরুরি। কারণ বড় অঙ্কের আমানতকারীদের তুলনায় সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হয়েছেন।

তবে প্রশ্ন হচ্ছে, যাদের জমা ১০ লাখ টাকার বেশি, তাদের কী হবে?

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র বলছে, প্রথম ধাপের অর্থ পরিশোধের পর প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ, উদ্ধারযোগ্য ঋণ, বিক্রয়যোগ্য সম্পত্তি এবং সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। অর্থাৎ বড় আমানতকারী, প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারী এবং অন্যান্য পাওনাদারদের অর্থ কীভাবে ও কোন ক্রমে পরিশোধ করা হবে, তা প্রশাসক নিয়োগের পর বিস্তারিত মূল্যায়নের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অবসায়ন প্রক্রিয়ায় সাধারণত প্রতিষ্ঠানের সম্পদ বিক্রি, উদ্ধারযোগ্য ঋণ আদায় এবং দায়-দেনার তালিকা প্রস্তুতের মাধ্যমে পাওনাদারদের অর্থ পরিশোধ করা হয়। ফলে ১০ লাখ টাকার বেশি আমানতধারীদের অর্থ ফেরতের বিষয়টি সময়সাপেক্ষ হতে পারে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সরাসরি তদারকি থাকায় আগের তুলনায় একটি সুসংগঠিত কাঠামোর মাধ্যমে অর্থ ফেরতের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে আমানতকারীদের সংগঠন ‘অ্যালায়েন্স অব ৬ এনবিএফআইস ডিপোজিটরস ফর রিকভারি’-এর আহ্বায়ক জাফর খান বলেন, ক্ষুদ্র আমানতকারীদের সুরক্ষার লক্ষ্যে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত সম্পূর্ণ ফেরত দেওয়ার উদ্যোগকে তারা ইতিবাচকভাবে দেখছেন। দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তিতে থাকা ছোট আমানতকারীদের স্বস্তি দিতে এ ধরনের পদক্ষেপ প্রয়োজন বলেও তিনি মনে করেন।

তিনি বলেন, তবে সংকটাপন্ন পাঁচটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সব আমানতকারী একই ধরনের অনিয়ম ও দুর্যোগের শিকার হয়েছেন। ফলে সমস্যার সমাধানও হতে হবে ন্যায়সঙ্গত, সমতাভিত্তিক ও বৈষম্যহীন। শুধু ক্ষুদ্র আমানতকারীদের জন্য নয়, ছোট-বড় সব ধরনের আমানতকারীর জন্য একটি সময়বদ্ধ, স্বচ্ছ ও বাস্তবসম্মত অর্থ ফেরত নীতিমালা (রিপেমেন্ট রোডম্যাপ) ঘোষণা করা প্রয়োজন।

জাফর খানের মতে, এমন একটি পরিকল্পনা থাকা উচিত, যেখানে সব আমানতকারী তাদের জমাকৃত অর্থ ধাপে ধাপে হলেও সমানুপাতিক ভিত্তিতে ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা পাবেন। অন্যথায় একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির আমানতকারীর স্বার্থ রক্ষা হলেও বাকি আমানতকারীরা দীর্ঘ অনিশ্চয়তার মধ্যে থেকে যাবেন, যা আর্থিক খাতের প্রতি জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

এসব প্রতিষ্ঠানে আমানত রাখা অর্থ কেবল সংখ্যা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের জীবনভর সঞ্চয়, প্রবাসী পরিবারের কষ্টার্জিত উপার্জন, বিধবা নারীর নিরাপত্তা, মধ্যবিত্তের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং ব্যবসায়ীদের মূলধন বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তার ভাষ্য, তাই বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি তাদের আহ্বান, এমন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতিমালা গ্রহণ করা হোক, যা সকল আমানতকারীর প্রতি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে, আর্থিক খাতে আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবে এবং ভবিষ্যতের সঞ্চয়কারীদের জন্য নিরাপত্তার বার্তা দেবে।

কেন এই অবস্থায় পৌঁছাল প্রতিষ্ঠানগুলো

এই পাঁচ প্রতিষ্ঠানের পতনের পেছনে রয়েছে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্বল তদারকি এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ঋণ কেলেঙ্কারি। আভিভা ফাইন্যান্সের নিয়ন্ত্রণে ছিলেন চট্টগ্রামের আলোচিত ব্যবসায়ী সাইফুল আলম (এস আলম)। অন্যদিকে এফএএস ফাইন্যান্স, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের নিয়ন্ত্রণ ছিল বহুল আলোচিত আর্থিক কেলেঙ্কারির নায়ক প্রশান্ত কুমার (পি কে) হালদারের হাতে।

তাদের সময়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে বিপুল অঙ্কের ঋণ বিতরণ করা হয়, যার বড় অংশই পরে খেলাপিতে পরিণত হয়। অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে নামে-বেনামে অর্থ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ফলে আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার মতো সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে প্রতিষ্ঠানগুলো।

প্রশাসক নিয়োগের পর কী হবে

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথমে পাঁচ প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত করা হবে। এরপর প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে সব ধরনের আর্থিক কার্যক্রম, সম্পদ ও দায়-দেনা কেন্দ্রীয়ভাবে পর্যালোচনা করা হবে।

প্রশাসকরা প্রতিষ্ঠানের সম্পদের প্রকৃত অবস্থা, উদ্ধারযোগ্য ঋণ, আদালতে থাকা মামলার অগ্রগতি এবং সম্ভাব্য নগদ প্রবাহ মূল্যায়ন করবেন। একই সঙ্গে আমানতকারীদের তথ্য যাচাই করে অর্থ ফেরতের তালিকাও প্রস্তুত করা হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানান, লোকসানি ও অকার্যকর প্রতিষ্ঠানগুলো সচল রাখার জন্য বছরের পর বছর ব্যয় করার পরিবর্তে দ্রুত অবসায়নের মাধ্যমে আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করাই এখন প্রধান লক্ষ্য।

অবসায়নের তালিকা কেন ছোট হলো

গত বছর উচ্চ খেলাপি ঋণ ও আমানত ফেরতে ব্যর্থ হওয়ায় ২০টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। পরবর্তীতে তাদের মধ্যে কয়েকটির পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা মূল্যায়ন করে ছয়টি প্রতিষ্ঠান বন্ধ বা অবসায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

পরবর্তীতে জিএসপি ফাইন্যান্স, প্রাইম ফাইন্যান্স ও বিআইএফসি তালিকা থেকে বাদ পড়ে। সর্বশেষ প্রিমিয়ার লিজিংকেও আপাতত অবসায়নের তালিকার বাইরে রাখা হয়েছে। ফলে এখন পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করেই চূড়ান্ত প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

আস্থা ফেরানোর বড় পরীক্ষা

ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগ শুধু পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের আমানতকারীদের জন্য নয়, পুরো আর্থিক খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা অর্থ ফেরত দেওয়া গেলে আর্থিক খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা কিছুটা হলেও পুনরুদ্ধার হবে।

তবে একই সঙ্গে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, শুধুমাত্র সরকারি অর্থ দিয়ে ক্ষতি পুষিয়ে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। যারা অনিয়ম ও লুটপাটের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করেছে, তাদের সম্পদ জব্দ ও অর্থ পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়াও সমান গুরুত্বের সঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে। অন্যথায় জনগণের করের অর্থ দিয়ে ক্ষতি পূরণ করা হলেও দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত হবে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান সম্প্রতি বলেছেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আমানত ফেরত নিয়ে দীর্ঘ ১২ বছর ধরে সমস্যা চলছে। আগামী এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত আমানতকারীদের জন্য দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাবে।

সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে, দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা হাজারো আমানতকারীর অর্থ ফেরতের পথ খুলবে। তবে ১০ লাখ টাকার বেশি আমানতধারীরা কবে, কীভাবে এবং কতটুকু অর্থ ফেরত পাবেন—সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও ভবিষ্যতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।

Facebook Comments Box
Advertise with us
Advertise with us
আরও
Advertise with us

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

রবিসোমমঙ্গলবুধবৃহশুক্রশনি
 
১০১১১৩
১৫১৬১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
৩০ 

ফলো করুন দেশবার্তা-এর খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক
মো: সামসুদ্দীন চৌধুরী
সম্পাদকীয় কার্যালয়