
নিজস্ব প্রতিবেদক | বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬ | প্রিন্ট | ৮ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার বাসিন্দা কাজী সুমনের সঙ্গে গতকাল বুধবার বিকেলে দেখা হয় মিরপুর ১১ নম্বরের লালমাটি এলাকায়। তাঁর হাতে থাকা বাঁশের লাঠিতে ঝোলানো ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার নানা আকারের পতাকা, সঙ্গে ব্যাগভর্তি মাথার ব্যান্ড ও হাতের ব্যাজ। বিশ্বকাপ মৌসুমে এভাবেই অলিগলি ঘুরে ফেরি করে এসব বিক্রি করেন তিনি।
কথা বলে জানা যায়, বিশ্বকাপের সময়ই ঢাকায় এসে পতাকার ব্যবসা করেন সুমন। অন্য সময় এলাকায় একটি স্কুলের সামনে প্রসাধনী ও সাজসজ্জার সামগ্রী বিক্রি করেন। তাঁর স্ত্রী শিউলী বেগম গৃহিণী। দুই ছেলের মধ্যে একজন এসএসসি দিয়েছে, অন্যজন সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। গত সোমবার ঢাকায় এসে ছোট ভাইয়ের মেসে উঠেছেন তিনি।
সুমন জানান, বিশ্বকাপ এলেই পতাকা বিক্রির জন্য ঢাকায় আসেন তিনি। ২০০৬ সালে চাচার মাধ্যমে প্রথম এ ব্যবসায় যুক্ত হন। সেই হিসাবে এবার তাঁর ষষ্ঠ বিশ্বকাপ। এত দিন চাচাই পণ্য সরবরাহ করতেন। তবে চাচার অসুস্থতার কারণে এবার প্রায় ২০ হাজার টাকা নিজেই বিনিয়োগ করেছেন।
বেচাবিক্রি নিয়ে সুমন বলেন, মঙ্গলবার চকবাজার থেকে পতাকা ও অন্যান্য সামগ্রী কিনে এনে দুপুর থেকেই বিক্রি শুরু করেন। প্রথম দিনেই তাঁর ২ হাজার ৭০০ টাকার পণ্য বিক্রি হয়েছে। গতকাল বিকেল পর্যন্ত বিক্রি হয়েছিল প্রায় এক হাজার টাকার। তবে বৃষ্টির কারণে কিছু সময় বিক্রি বন্ধ ছিল।
মৌসুমি এ ব্যবসার বর্তমান অবস্থা নিয়ে আক্ষেপ করে সুমন বলেন, আগে ফুটপাতে এত দোকান ছিল না। অনলাইনেও এত পসার ছিল না। তখন ক্রেতারা মূলত তাঁদের কাছ থেকেই কিনতেন। এখন প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ায় বিক্রি কমে গেছে। তারপরও বিশ্বকাপ ঘিরে বাড়তি আয়ের আশায় চার বছর পরপর ঢাকায় ছুটে আসেন তিনি।
সংসারের খরচ সামলাতে হিমশিম খেতে হয় বলেও জানান সুমন। আয় ও ব্যয়ের মধ্যে প্রায়ই ঘাটতি থাকে, যা কখনো ধারদেনা করে মেটাতে হয়। কাজী সুমনের ভাষায়, ‘প্রতি মাসেই ধারদেনা, টানাটানি থাকে। তাই যতটুকু পারি নিজের জন্য কম খরচ করি; কিন্তু বাচ্চাদের যেন কোনো কষ্ট না হয়, সেই চেষ্টা করি।’ বিশ্বকাপের এই মৌসুমি ব্যবসায় বড় লাভের নিশ্চয়তা না থাকলেও মানুষের উৎসব-আনন্দের অংশ হতে পারাটাই তাঁর কাছে বড় প্রাপ্তি, জানালেন সুমন।
‘সিজন হইল বিশ্বকাপের’
তেজগাঁওয়ের বেগুনবাড়ী এলাকায় রাস্তার পাশে ভ্যানে করে জামা-প্যান্ট বিক্রি করেন কিশোরগঞ্জের মতি মিয়া। রাজধানীর হাতিরঝিলসংলগ্ন সিদ্দিক মাস্টার মোড় এলাকায় স্ত্রী ও এক মেয়েকে নিয়ে থাকেন। তাঁর স্ত্রী একটি বেসরকারি হাসপাতালে দাপ্তরিক সহকারী হিসেবে কাজ করেন। আর একমাত্র মেয়ে তেজগাঁও পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে বিএসসি পর্যায়ে পড়াশোনা করছেন।
বিশ্বকাপ উপলক্ষে নিয়মিত পোশাকের পাশাপাশি বিভিন্ন দলের জার্সিও বিক্রি করছেন মতি মিয়া। তিনি বলেন, ‘সিজন হইল বিশ্বকাপের। তাই অন্য কাপড়ের পাশাপাশি মাইনষে এহন পছন্দের দলের জার্সি কিনব। তাই আমিও জার্সি আনছি। এইগুলা বেইচা কয়ডা টাকা বাড়তি কামাই হইব।’ তিনি জানান, ক্রেতাদের সবচেয়ে বেশি আগ্রহ আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের জার্সিতে। হাসতে হাসতে বলেন, ‘দেশে তো বেশি মাইনষেই আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল করে। আমি নিজেই করি আর্জেন্টিনা।’
ব্যবসার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে মতি মিয়ার মূল্যায়ন, ‘ব্যবসা খুব বেশি ভালাও না, আবার খারাপও না। এইভাবেই চলতেছে। কোনো দিন একটু বেশি বেচি, কোনো দিন এক্কেবারে কম। এহন বিশ্বকাপের সময়ে জার্সিটাই বেশি বেচা হইতাছে।’ ১৩ হাজার টাকার জার্সি এনে গতকাল পর্যন্ত প্রায় ৭ হাজার টাকার জার্সি বিক্রি করেছেন বলেও জানান তিনি।
বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে সংসার চালানো যে কঠিন হয়ে উঠেছে, সেটিও তুলে ধরেন মতি মিয়া। তাঁর ভাষায়, ‘আগে যে টেহায় এক সপ্তাহের বাজার হইত, এহন তো ওই টেহায় দুই-তিন দিনের বেশি চলে না। মেয়ের পড়ালেখা, বাসাভাড়া, খাওনদাওন—সব মিলাইয়া খরচ আর খরচ। তাই এই রকম সিজন আইলে দুইডা বাড়তি টেহা কামাইয়ের আশাতেই জার্সিটার্সি আনি।’
রাস্তার পাশে ভ্যানে করে বিভিন্ন দলের জার্সি বিক্রি করেন কিশোরগঞ্জের মতি মিয়া। গতকাল বিকেলে রাজধানীর তেজগাঁওয়ের বেগুনবাড়ী এলাকায়
নতুন চাহিদা স্পেন-ফ্রান্স-পর্তুগালের জার্সি
মহাখালী কাঁচাবাজারের ফুটপাতে গেঞ্জি, ট্রাউজার, হাফপ্যান্ট ও শার্ট বিক্রি করেন হারুনুর রশিদ। প্রায় ২২ বছর ভ্রাম্যমাণভাবে এ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত তিনি। মালামাল সংগ্রহ করেন গুলিস্তানের বঙ্গবাজার থেকে। বিশ্বকাপ এলেই নিয়মিত পণ্যের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের ফুটবল দলের জার্সি ও শর্টসও দোকানে তোলেন। বাড়তি কিছু আয়ের আশায় প্রতি বিশ্বকাপ মৌসুমেই এ পণ্যের বিক্রিতে জোর দেন তিনি।
হারুনুর রশিদ জানান, এবার বিশ্বকাপকে সামনে রেখে কয়েক দফায় প্রায় ৬০ হাজার টাকার জার্সি ও প্যান্ট কিনেছেন। এর মধ্যে ৪০–৪৫ হাজার টাকার বিক্রি হয়েছে বলে জানান তিনি। আগে তাঁর দোকানে মূলত ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ও জার্মানির কিছু জার্সি পাওয়া যেত। তবে ক্রেতাদের চাহিদা বিবেচনায় এবার তিনি স্পেন, ফ্রান্স ও পর্তুগালের জার্সিও এনেছেন।
হারুনুর রশিদের দোকানে শিশুদের জার্সি ১২০ থেকে ১৫০ টাকা এবং বড়দের জার্সি ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তিনি জানান, মে মাসের ২০ তারিখের দিকে এসব জার্সির পাইকারি দাম ছিল ১০০ থেকে ২০০ টাকার মধ্যে। কিন্তু বিশ্বকাপ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে পাইকারি বাজারে দাম বেড়ে গেছে। বর্তমানে প্রতিটি জার্সির দাম আগের তুলনায় ৪০ থেকে ৫০ টাকা বেশি পড়ছে।
এর প্রভাব খুচরা বাজারেও পড়েছে বলে জানান হারুনুর রশিদ। তাঁর ভাষায়, ‘দুই-তিন শ টাকার বেশি দাম দিয়া মানুষ ফুটপাত থেকে জিনিস কিনতে চায় না; কিন্তু পাইকারিতে তো দাম বাইড়া গেছে। তাই আমাদেরও দাম বাড়াইয়া বেচতে হয়।’ দাম বাড়ার কারণে বিক্রিও কিছুটা কমেছে বলে জানান এই ব্যবসায়ী। তবে বিশ্বকাপে জনপ্রিয় দলগুলো জিততে থাকলে জার্সি কেনায় সমর্থকদের আগ্রহ বাড়বে, সেই আশা নিয়েই দোকানে জার্সির সরবরাহ ধরে রেখেছেন তিনি।
