
নিজস্ব প্রতিবেদক | বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬ | প্রিন্ট | ১৪ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন নিয়ে ত্রিমুখী চাপে আছে সরকার। এক. বেতন খাতের জন্য বাড়তি অর্থ জোগাড় করা। দুই. দাতা সংস্থাদের রাজি করানো। তিন. পে-স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারী কর্মচারীদের চাপ। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব জানা যায়।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো ঘোষণা দিয়ে গিয়েছে, যা বাস্তবায়নের দায় চেপেছে বর্তমান বিএনপি সরকারের কাঁধে। তারেক রহমানের সরকার তার প্রথম বাজেটেই (২০২৬-২৭) চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের কথা জানালেও ঠিক কবে থেকে কার্যকর হবে তা এখনো চূড়ান্ত করতে পারেনি। নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নে অর্থের জোগাড় কোন খাত থেকে হবে, কোন খাত থেকে কত পাওয়া যাবে, এতে অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়বে, সরকার কতটা চাপে থাকবে–এসব নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক করছেন সরকারের নীতিনির্ধারকরা।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে নতুন বেতনকাঠামো কবে নাগাদ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে এবং কোন খাত থেকে অর্থের জোগাড় হবে তা নিয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, অর্থসচিব ড. খায়েরুজ্জামান মজুমদারসহ সংশ্লিষ্টরা দীর্ঘ বৈঠক করেন। এ বৈঠকে অর্থমন্ত্রী নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের পক্ষে বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীকে পে-স্কেল বাস্তবায়নের সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে বিস্তারিত জানান। প্রধানমন্ত্রী নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এই বৈঠকে নতুন বেতনকাঠামো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা হয়। এ সময় আইএমএফের আপত্তি, চলতি বাজেটে নতুন পে-স্কেলের জন্য রাখা বরাদ্দ যথেষ্ট কি না, তা নিয়েও কথা হয়। বৈঠকে সরকারের অধীনে কর্মরত প্রায় ১৫ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং কয়েক লাখ পেনশনভোগী নতুন পে-স্কেলের আওতায় আসবেন বলে জানানো হয়। এতে পেনশন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে বলে আলোচনায় উঠে আসে।
সরকারের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের এই বৈঠকের দিকনির্দেশনা নিয়ে সচিব কমিটি বিগত সরকার ঘোষিত বেতনকাঠামোতে কিছুটা পরিবর্তন এনে মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে উপস্থাপনের জন্য চূড়ান্ত রূপরেখা প্রণয়নের কাজ করছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে নতুন করে ঋণ পেতে সরকার আবেদন করেছে। সদ্য শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকার রেকর্ড রাজস্ব ঘাটতিতে পড়েছে। অভ্যন্তরীণ সম্পদ থেকে অর্জিত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আদায়ে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি রয়েছে। এর আগে এত বড় অঙ্কের রাজস্ব ঘাটতিতে পড়েনি এনবিআর। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা থামছে না। জ্বালানিসংকট ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বাসাবাড়ি থেকে শিল্প খাতে–সবখানেই গ্যাসের সংকট চলছে। জ্বালানিসংকটে এরই মধ্যে শতাধিক শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এ সংকট চলতে থাকলে আরও অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন শিল্প খাতের সংশ্লিষ্টরা। দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য-শিল্প খাতে ধস নেমেছে। নতুন অর্থবছরের শুরু থেকেই রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে না, এমন আশঙ্কা করে এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ বলেন, বর্তমান সরকারের পক্ষে নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন না করার সুযোগ নেই। এটি সরকারের নির্বাচনের আগেই থেকে আলোচনায় ছিল। বর্তমান সরকার সম্মতি জানিয়ে চলতি বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করেছে। তাই আর্থিক সংকটে থাকলেও সরকারকে যেকোনো পরিস্থিতিতে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। অন্যদিকে সরকারের রাজস্ব ঘাটতি সামনের দিনে আরও বাড়তে পারে। তাই সরকার নতুন বেতনকাঠামো নিয়ে নানামুখী চাপে আছে।
এমন পরিস্থিতিতে সরকার নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের জন্য বাড়তি অর্থের জোগান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে আইএমএফ, বিশ্বব্যাংকসহ বেশির ভাগ দাতা সংস্থা।
এবারের সফরে সরকারি নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে আইএমএফ থেকে পে-স্কেল বাস্তবায়নের সময়সীমা পিছিয়ে দেওয়ার জন্য বলেছে। অর্থ বিভাগের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের সময় কমপক্ষে দুই বছর পেছানোর আহ্বান জানিয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বর্তন কর্মকর্তা বলেন, আইএমএফ থেকে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন দুই বছর পেছানোর জন্য বলেছে। তা বর্তমান পরিস্থিতিতে মেনে চলা সম্ভব নয়। সরকারি কর্মচারীদের অনেক দিন হলো বেতন বাড়ানো হয় না। আগের সরকার নতুন বেতনকাঠামো ঘোষণা করে গেছে। বর্তমান সরকার বাস্তবায়নের তারিখ জানিয়েছে। এখন নতুন পে-কাঠামো বাস্তবায়ন পিছিয়ে দিলে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেবে। আইএমএফ নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন পিছিয়ে দেওয়ার জন্য যত চাপ দিক না কেন, আগামী অক্টোবরে আইএমএফের বার্ষিক সভার আগেই পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশ করা হতে পারে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, আগামী অক্টোবরে থাইল্যান্ডে আইএমএফের বার্ষিক সভায় নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের সময়সীমা এবং নতুন ঋণচুক্তি নিয়ে আবারও আলোচনায় বসতে চায় আইএমএফ। এ ছাড়া নভেম্বরে আইএমএফের আরেকটা প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফরে এলেও নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন এবং নতুন ঋণচুক্তি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করতে চায়।
সূত্র আরও জানায়, নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারি কর্মচারীদের চাপে থাকা বর্তমান সরকার আইএমএফের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা এড়িয়ে যেতে চায়। অক্টোবরের আগেই পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশ করতে চায়।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘দেশের অর্থনীতি ভঙ্গুর অবস্থায় আছে। এখান থেকে টেনে তুলতে কমপক্ষে দুই বছর সময় লাগবে। যত সংকট থাকুক, সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন করা জরুরি। ১১ বছর হলো সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো হয় না। অথচ এই সময়ে মূল্যস্ফীতির চাপ বহু বেড়েছে। এ ছাড়া সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো হলে দুর্নীতি কমবে বলে আশা করি।’
এ বিষয়ে সচিবালয়ের কর্মচারী ঐক্য পরিষদের সদস্যসচিব মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, নবম পে-স্কেলের গেজেট নোটিফিকেশন দ্রুত জারি করতে হবে। সরকার প্রয়োজন মনে করলে আর্থিক বাস্তবায়ন ডিসেম্বর থেকে করতে পারে। কিন্তু সরকারি সিদ্ধান্তের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হিসেবে এখনই গেজেট প্রকাশ করতে হবে। গেজেট নোটিফিকেশন জারি করে সরকার নবম পে-স্কেল কার্যকরের নীতিগত সিদ্ধান্ত জানাতে হবে।
