
নিজস্ব প্রতিবেদক | বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬ | প্রিন্ট | ৪ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের মূল আকর্ষণ রয়েল বেঙ্গল টাইগার এখন নানা সংকটের মুখে। দুই দশকের বেশি সময় ধরে এই বনের বাংলাদেশ অংশে ৬২টি বাঘ মারা গেছে।
বন বিভাগ বলছে, চোরাশিকারিদের শিকার, লোকালয়ে আসা এবং অসুস্থতা ও বার্ধক্যই এসব বাঘের মৃত্যুর প্রধান কারণ। সুন্দরবনের এই প্রাণিকূলের আবাসস্থল সুরক্ষার পাশাপাশি চোরাশিকারিদের দৌরাত্ম্য রোধ করার দাবি জানিয়েছেন তারা
মারা যাওয়া ৬২টি বাঘের মধ্যে পূর্ব বন বিভাগে ৩০টি এবং পশ্চিম বন বিভাগে ৩২টির মৃত্যু হয়েছে। এসব বাঘের মধ্যে ২৬টি দুষ্কৃতিকারীদের হাতে নিহত হয়েছে, ১৪টি গণপিটুনিতে মারা গেছে, ২১টির মৃত্যু হয়েছে স্বাভাবিক কারণে এবং একটি ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডরের জলোচ্ছ্বাসে মারা যায়।
এদিকে বাঘের নিরাপত্তা নিশ্চিতে বনে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার সীমিত ও সংরক্ষিত করতে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে বন বিভাগ।
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ, খুলনার বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) নির্মল কুমার পাল বলছেন, সুন্দরবনের ২০২৩ সালে সবশেষ একটি বাঘের মৃত্যু হয়েছিল, এরপর থেকে আর কোনো বাঘের মৃত্যু হয়নি।
বাঘ রক্ষায় সাধারণ মানুষের সচেতনতা বাড়ার পাশাপাশি গত দুই বছরে কোনো বাঘের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি বলে তিনি জানান।
বন্যপ্রাণী নিয়ে কাজ করা ‘বাংলাদেশ ন্যাচার অ্যান্ড ওয়াইল্ডলাইফ প্রোটেকশন সেন্টারের’ সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ বনি বলেন, “বাঘ সুন্দরবনের সৌন্দর্য। বাঘ আছে বলেই এখনও বন অনেকটা সুরক্ষিত। বিভিন্ন সময়ে চোরা শিকারিদের হাতে বনের অসংখ্য বাঘ মারা পড়েছে।
“চোরা শিকারিরা অতি লাভের আশায় সুন্দরবনের এই বন্যপ্রাণী হত্যা করে চামড়াসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গ বিক্রি করে থাকে। চোরা শিকারিদের তৎপরতা কিন্তু থেমে থাকে না। সুযোগ পেলেই সংঘবদ্ধ চক্রটি বাঘ হত্যা করে চড়ামূল্যে বিক্রি করে।”
সুন্দরবনের বাঘ রক্ষায় বননির্ভর মানুষের অবাধ যাতায়াত নিয়ন্ত্রণের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “এতে বনের ওপর চাপ কম কমবে। আমাদের যেমন সচেতন হতে হবে, তেমনি বন রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদেরও আরও তৎপর হতে হবে।”
বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) নির্মল কুমার পাল বলেন, ২০০১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সুন্দরবনের পূর্ব ও পশ্চিম বিভাগে মোট ৬২টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে পূর্ব বিভাগে ৩০টি এবং পশ্চিম বিভাগে ৩২টি বাঘ মারা যায়। গত আড়াই দশকে দুষ্কৃতকারীদের হাতে ২৬টি এবং গণপিটুনিতে ১৪টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া ২১টি বাঘ স্বাভাবিকভাবে মারা যায়।
“২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় সিডরের জলোচ্ছ্বাসে একটি বাঘের মৃত্যু হয়। সর্বশেষ ২০২৩ সালে একটি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। এরপর গত দুই বছরে সুন্দরবনে নতুন করে কোনো বাঘের মৃত্যু হয়নি।”
তিনি বলেন, “বাঘ সংরক্ষণে মানুষের মধ্যে সচেতনতা আগের তুলনায় বেড়েছে।”
নির্মল কুমার বলেন, “সুন্দরবনের দুই বিভাগে চারটি রেঞ্জ কার্যালয়, ১১টি স্টেশন এবং ৬১টি টহল ফাঁড়ি রয়েছে। এসব টহল ফাঁড়ির বনরক্ষীরা নিয়মিত টহল দেন। বাঘসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণীর সুরক্ষায় স্মার্ট পেট্রোলিং টিমও সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছে।
“বাঘ যাতে লোকালয়ে প্রবেশ করতে না পারে এবং প্রবেশ করলেও মানুষের হাতে প্রাণ না হারায়, সে জন্য বনসংলগ্ন উপজেলার স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়ে বিভিন্ন কমিটি গঠন করা হয়েছে। এসব কমিটির মাধ্যমে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।”
তিনি বলেন, “সাধারণ মানুষের অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ ঠেকাতে সুন্দরবনের দুই বিভাগে ইতোমধ্যে ৭৪ কিলোমিটার এলাকায় নাইলনের দড়ি দিয়ে বেড়া (ফেন্সিং) দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় কমিটিগুলোর সহযোগিতায় বন বিভাগ বাঘ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। পাশাপাশি বনের সব ধরনের বন্যপ্রাণীর সুরক্ষায় কঠোর নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।”
