বৃহস্পতিবার ২৯শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৩ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম
নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে মালয়েশিয়া কর্মী পাঠানো শুরু হতে পারে: নুরুল হক নূর ২ লাখ ৪৫ হাজার যুবকের দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ দেবে কেয়ার বাংলাদেশ পাঁচ অগ্রাধিকার খাতে জাপানি বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ভোট গণনা ৮৪.৫ শতাংশ শেষ, কে হচ্ছেন ইসরায়েলের নতুন প্রধানমন্ত্রী? দলীয় অন্তর্কোন্দলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়া সম্ভব না: না‌হিদ ইসলাম স্বাস্থ্যখাতে ১৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের ঘোষণা দিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢাকা-সৌদি রুটে আকাশপথে বড় ধরনের বিপর্যয়, ১৫৩টি ফ্লাইট বাতিল মুন্সীগঞ্জে ঢাকা-মাওয়া সড়কে সাত মাসে ১১১টি দুর্ঘটনায় ১৪ জন নিহত বাংলাদেশে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণে সুইজারল্যান্ডের প্রতি আহ্বান রাষ্ট্রপতির মানুষ সহজে স্বাস্থ্যসেবা পেতে, উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
Advertise with us

নারীরা কখনো শোনেনি স্যানিটারি ন্যাপকিনের নাম,আধুনিক সভ্যতার বাইরে পুরো গ্রাম

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ৩৮ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

নারীরা কখনো শোনেনি স্যানিটারি ন্যাপকিনের নাম,আধুনিক সভ্যতার বাইরে পুরো গ্রাম

কিশোরগঞ্জের নিকলি ইউনিয়নের গোড়াদিঘা গ্রাম। দুর্গম এক গ্রাম। নৌকাই যেখানে যাওয়ার একমাত্র বাহন। কিছুদিন আগেও এখানে আসলে মনে হতো যেন এটা আধুনিক সভ্যতার বাইরের কোনো জায়গা। এখানকার বেশিরভাগ নারীরা কোনোদিন স্যানিটারি ন্যাপকিনের নামই শোনেনি, ব্যবহার তো অনেক দূরের কথা।

এখানে গুটিকয়েক ফার্মেসি। ফার্মেসির কর্মীরাও অনেকে জানতো না স্যানিটারি ন্যাপকিন সম্পর্কে। বিশ্বাস হতে চাইবে না জানি, তবে এটাই সত্যি। পিরিয়ডে অনিরাপদ কাপড়-তুলা ব্যবহারের ফলে গোড়াদিঘার মেয়েরা নানা অসুখে ভুগত। তারা এটাকে অদৃষ্ট মনে করলেও, এটা মানবসৃষ্ট। এটা সচেতনতার অভাব। ইনফেকশন, জরায়ু ক্যানসার, বন্ধ্যাত্বের মতো রোগে ভুগেছে এখানকার অনেক নারী। তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপন হচ্ছে বাধাগ্রস্ত।

একরকম জনবিচ্ছিন্ন, সভ্যতার আলো থেকে বঞ্চিত এসব মেয়েদের জন্যই শুরু হয়েছিল সান কমিউনিকেশনস লিমিটেডের পরিকল্পনায়, ওএনজেড সলিউশনস-এর সহযোগিতায় এবং স্টেসেইফ স্যানিটারি ন্যাপকিন-এর উদ্যোগে ‘নিরাপদ পিরিয়ড, সবার অধিকার।’
নৌকা যেহেতু হাওড়ে যাতায়াতের একমাত্র বাহন, তাই নৌকাকেই কাজে লাগানো হয় এই কাজে। ঘোষণা করা হয় বিশেষ আনন্দ মেলার। গোড়াদিঘায় এই আনন্দ মেলা আয়োজনের উদ্দেশ্যে ছিল, গ্রামের সব নারীদের একটা জায়গায় একত্র করা। আর আনন্দ আয়োজনের মাধ্যমে সবাইকে নিরাপদ পিরিয়ড সম্পর্কে জানানো।

নারীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে মেলা সংলগ্ন নদীর ঘাটে রাখা হয়েছিল স্টেসেইফ-এর তিনটি বিশেষ নৌকা। যেখানে নারীরা পায় পিরিয়ড নিয়ে প্রয়োজনীয় ডাক্তারি পরামর্শ। এছাড়া নারীদের মাঝে বিতরণ করা হয় ৩ মাসের ফ্রি স্যানিটারি ন্যাপকিন।

অল্প কয়েকটা ঔষধের দোকান আছে গোড়াদিঘায়। সেই দোকানগুলোর মালিক ও কর্মীদের পিরিয়ড ও প্যাড নিয়ে বিশেষ ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করে স্টেসেইফ, যেন তারাও নিরাপদ পিরিয়ডের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জানতে পারে। এছাড়া ফার্মেসিতে ঔষধ কিনতে আসা সবার মাঝে বিতরণ করা হয় বিশেষ সচেতনতামূলক ব্যাগ। মা-বাবাকে সচেতন করতে সেখানে লেখা হয়-

আপনার আদরের মেয়ে
কেন ভুগবে ক্যান্সারে?
মাসিকের সময় পুরোনো ও অস্বাস্থ্যকর কাপড় তুলা ব্যবহার করলে, হতে পারে জরায়ু ক্যানসার।
মেয়েকে দিন স্যানিটারি ন্যাপকিন
যেটা সাধ্যের মধ্যে, সেটাই নিন।

লুডু হাওড়ের পানিবন্দি নারীদের বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম। তাই তো মেয়েদের জন্য তৈরি করা হয়েছিল বিশেষ লুডু। সাপ লুডুতে সাপের মুখে লেখা হয় বন্ধ্যাত্ব, কোনোটায় জরায়ু ক্যানসার, কোনোটায় ইনফেকশন। এছাড়া বিভিন্ন মেসেজের মাধ্যমে স্বাস্থ্যকর পিরিয়ড সম্পর্কে সচেতন করা হয় সবাইকে।

গোড়াদিঘা গ্রামে একটিমাত্র স্কুল, সেখানেও মেয়েদের সচেতন করা হয় বিশেষ ক্লাসের মাধ্যমে। চলে উঠান বৈঠক আর পিরিয়ড নিয়ে মন খুলে আলোচনা।

স্থায়ী সমাধানের জন্য গোড়াদিঘায় তৈরি করা হয় স্টেসেইফ গার্ল, যাদের কাছ থেকে মেয়েরা সহজে ফ্রি স্যানিটারি ন্যাপকিন নিতে পারবে। আর ৩ মাস পর পাবে অর্ধেক দামে। এছাড়া ফার্মসিতেও রাখা হয় স্বল্প মূল্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন কেনার সুযোগ।
স্টেসেইফ এর হেড অফ মার্কেটিং নয়ন রায় বলেন, ‘এই সময়ে দাঁড়িয়ে কোনো গ্রামের মেয়েরা যদি স্যানিটারি ন্যাপকিন সম্পর্কে না-ই জানে, এটা শুধু একটি স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, এটা সমান সুযোগ পাওয়ার পথেও বড় বাধা। আর এটাই আমরা মেনে নিতে পারিনি। এবং সেই দায়বদ্ধতা থেকেই স্টেসেইফ দাঁড়িয়েছে গোড়াদিঘার অসহায় নারীদের পাশে। আমাদের লক্ষ্য কেবল তাদের হাতে পণ্য তুলে দেওয়া নয়, বরং তাদের অভ্যাসে পরিবর্তন আনা। আমরা চেয়েছি এমন এক স্থায়ী সমাধান, যা নিশ্চিত করবে প্রতিটি মেয়ের পিরিয়ড হোক নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ।’

এই কাজের সাথে সরাসরি জড়িত সান কমিউনিকেশনসের গ্রুপ কপি হেড রিয়াজুল আলম শাওন বলেন, ‘এই আধুনিক যুগে দাঁড়িয়ে একটা গ্রামের নারীরা স্যানিটারি ন্যাপকিনের নামই শোনেনি, চিন্তা করা যায়? রোগশোককে তারা মেনে নিয়েই কষ্ট পাচ্ছিল বছরের পর বছর। গোড়াদিঘার অসহায় এই মেয়েদের কথা জেনে কিছু করার তাড়না অনুভব করি। সান কমিউনিকেশনসের পরিকল্পনায় এবং ওএনজেড সলিউশনস-এর সহযোগিতায় স্টেসেইফ-কে সঙ্গে নিয়ে আময়রা গোড়াদিঘার মেয়েদের জীবনে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছি। শুধু সাময়িক না, আমরা চেষ্টা করেছি স্থায়ী সমাধানের, যেন সকল মেয়ের পিরিয়ড হয় নিরাপদ।’

সান কমিউনিকেশনসের ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর তানভীর সিকদার বলেন, ‘যেখানে মেয়েরা এখন বিশ্বজয় করছে, সেখানে গোড়াদিঘার মেয়েরা কী অসহায় অবস্থায় আছে। আমরা খুবই সততার সাথে কাজটা করার চেষ্টা করেছি, যেন ওখানকার নারীরা ভালো থাকে। স্টেসেইফকে ধন্যবাদ এমন একটা কাজে সম্পৃক্ত হওয়ার জন্য।’

স্টেসেফের উদ্যোগের কয়েক মাস পরে কী অবস্থা

গোড়াদিঘার পরিবর্তনটি শুধু স্যানিটারি প্যাড ব্যবহারের পরিবর্তন নয়। এটি একটি দুর্গম হাওর জনপদের নারীদের চিন্তা ও অভ্যাস বদলে যাওয়ার গল্প। যে জনপদে কয়েক বছর আগেও পিরিয়ডের সময় কাপড় ব্যবহার করতেন অনেকে, এখন সেখানে নারীরা প্যাড ব্যবহার করছেন। যে পণ্য একসময় সহজে পাওয়া যেত না, সেটি এখন স্থানীয় ফার্মেসিতে পাওয়া যাচ্ছে। যে বিষয় নিয়ে কথা বলতে সংকোচ ছিল, সেটি নিয়ে এখন স্কুলে, উঠানে, নৌকায় এমনকি খেলতে খেলতেও আলোচনা হচ্ছে।

স্কুল শিক্ষার্থী ইসমা বলে, আগে আমরা এসব বিষয়ে জানতাম না। স্টেসেফ মেলার মাধ্যমে আমাদেরকে এসব বিষয়ে সচেতন করেছে। আমরা সবাই এখন এসব বিষয়ে সচেতন।

তৃপ্তি আক্তার বলে, স্টেসেফের মাধ্যমে শুধু আমি একা নই, আমাদের এলাকার প্রত্যেকে স্যানিটারি প্যাড সম্পর্কে জানতে পেরেছে এবং এখানকার সব নারী এখন প্যাড ব্যবহার করে।

কাজেফা আক্তার নামে অপর এক ছাত্রী বলে, আগে আমরা কাপড় ব্যবহার করতাম। এখন স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে আমরা সচেতন। আমরা এখন কাপড় ব্যবহার করি না। পিরিয়ডে প্যাড ব্যবহার করি।

স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. আবদুল মোতালিব বলেন, এই জনপদের নারীরা আগে সচেতন ছিল না। এখন চিত্র পাল্টে গেছে। এখন সবাই সচেতন। এই পরিবর্তনের পেছনে স্টেসেফের ধারাবাহিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম ও প্যাড সহজলভ্য করার উদ্যোগ বড় ভূমিকা রেখেছে।

পল্লী চিকিৎসক আনোয়ার হোসেন বলেন, বছর খানেক আগেও এখানকার নারীরা পিরিয়ড এবং প্যাড ব্যবহার সম্পর্কে তেমন একটা জানতো না। এখন অধিকাংশ নারীই সচেতন এবং তারা স্যানিটারি প্যাড ব্যবহার করেন।

বর্তমানে প্রায় ৬০-৭০% মেয়ে স্যানিটারি প্যাড ব্যবহার করছে। বাবা মা রা হয়েছেন সচেতন, তারা নিজেরা অনেকসময় মেয়েদের প্যাড কিনে দিচ্ছেন। বিভিন্ন জটিল রোগের প্রকোপ কমে এসেছে গোড়াদিঘায়।

যে নতুন আলোয় আলোকিত হয়েছে গোড়াদিঘার মেয়েরা, সেই সচেতনতার আলো ছড়িয়ে পড়ুক সারা বাংলাদেশে। কারণ নিরাপদ পিরিয়ড সবার অধিকার।

Facebook Comments Box
Advertise with us
Advertise with us
আরও
Advertise with us

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

ফলো করুন দেশবার্তা-এর খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক
মো: সামসুদ্দীন চৌধুরী
সম্পাদকীয় কার্যালয়