
নিজস্ব প্রতিবেদক | শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬ | প্রিন্ট | ৩ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে ফিরেছিলেন জন্মভূমি ঠাকুরগাঁওয়ে। এরপর রাজনীতির মাঠে কেটে গেছে তিন দশকেরও বেশি সময়। বাবার নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেওয়া থেকে শুরু করে জেলা বিএনপির নেতৃত্ব, পৌরসভার মেয়রের দায়িত্ব, রাজনৈতিক জীবনের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এবার জাতীয় সংসদে জায়গা করে নিলেন মির্জা ফয়সল আমীন। ঠাকুরগাঁওয়ের রাজনীতিতে পরিচিত এই মুখ এবার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছেন।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের ঠাকুরগাঁও-১ (সদর, রুহিয়া ও ভুল্লী) আসনের উপনির্বাচনে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়েছেন তিনি। আসনটিতে ১৮৫টি ভোটকেন্দ্রের সব কটির ফলাফলে মির্জা ফয়সল আমীন পেয়েছেন ২ লাখ ২৭ হাজার ৭৮৯ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পেয়েছেন ৯৬ হাজার ৪৫৩ ভোট। ফলে ১ লাখ ৩১ হাজার ৩৩৬ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন বিএনপির এই নেতা।
নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ৫ লাখ ১৬ হাজার ১৩৮ জন। সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ চলে। ভোট পড়েছে ৬৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ। ভোটগ্রহণ শেষে কেন্দ্রগুলোতে গণনা হয়। পরে বৃহস্পতিবার রাতে জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম সব কেন্দ্রের ফলাফল ঘোষণা করেন।
এই জয়ের মধ্য দিয়ে ঠাকুরগাঁও-১ আসনে বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান আরও সুসংহত হলো। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের দলীয় রাজনীতি ও স্থানীয় সরকারে দায়িত্ব পালনের পর জাতীয় রাজনীতিতে নতুন অধ্যায় শুরু হলো মির্জা ফয়সল আমীনের।
ঠাকুরগাঁও-১ আসনটি দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ঘাটি হিসেবে পরিচিত। এ আসন থেকে একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সর্বশেষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি এ আসন থেকে নির্বাচিত হন। পরে ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় তার সংসদীয় আসনটি শূন্য হয়। এরপর আসনটিতে উপনির্বাচনের আয়োজন করে নির্বাচন কমিশন।
উপনির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন পান মির্জা ফয়সল আমীন। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন দেলাওয়ার হোসেন। শুরু থেকেই এ দুই প্রার্থীকে ঘিরে নির্বাচনী মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা জমে ওঠে। বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে সরাসরি ভোটের লড়াই ঠাকুরগাঁওয়ের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
নির্বাচনের শুরুতে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ও দলীয় নেতা ওবায়দুল্লাহ মাসুদও প্রার্থী হয়েছিলেন। তবে দলীয় সিদ্ধান্তের পর ৫ অক্টোবর তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাড়ান। এতে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মির্জা ফয়সল আমীনের পক্ষে দলীয় নেতাকর্মীদের প্রচারণা আরও সংগঠিত হয়।
৮ অক্টোবর প্রার্থীদের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দের পর আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হয়। শহর থেকে গ্রাম, ইউনিয়ন থেকে পাড়া-মহল্লা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে ভোট চান প্রার্থীরা। বিএনপির পক্ষে ধানের শীষ এবং জামায়াতের পক্ষে দাঁড়িপাল্লার প্রচারণায় সরব হয়ে ওঠে পুরো নির্বাচনী এলাকা। প্রচারণার শেষ দিকে দুই পক্ষের মধ্যে রাজনৈতিক বক্তব্য-পাল্টা বক্তব্য, নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ এবং বিভিন্ন বিষয়ে উত্তেজনাও দেখা দেয়।
২৭ অক্টোবর সকাল ৮টায় প্রচারণা শেষ হয়। নির্বাচন ঘিরে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়। ১৮৫টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১১৫টিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে বিশেষ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়। সব মিলিয়ে ২৯ অক্টোবরের ভোটকে কেন্দ্র করে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। ভোটের দিন সকাল থেকেই কেন্দ্রগুলোতে ভোটারদের উপস্থিতি দেখা যায়। নারী, প্রবীণ ও তরুণ ভোটারদের পাশাপাশি বিভিন্ন বয়সী মানুষের অংশগ্রহণে ভোটগ্রহণ চলে। সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ শেষে গণনা শুরু হয়। সব কেন্দ্রের ফলাফল আসার পর বড় ব্যবধানে বিজয়ী হন মির্জা ফয়সল আমীন।
মির্জা ফয়সল আমীন বিএনপির সাবেক মহাসচিব ও বর্তমান রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ছোট ভাই। বর্তমানে তিনি ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি এবং দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
১৯৬৩ সালের ২৬ ডিসেম্বর ঠাকুরগাঁও শহরের কালীবাড়ি এলাকায় সাবেক মন্ত্রী মির্জা রুহুল আমিন ও ফাতেমা বেগম দম্পতির ঘর আলো করে জন্মগ্রহণ করেন মির্জা ফয়সল আমীন। সাত ভাই-বোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন ঠাকুরগাঁওয়ের পরিচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তিনি একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৮৬-৮৭ সালে ভূমি ও কৃষিমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন। অন্যদিকে তার চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ ছিলেন জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার এবং সাবেক আইন ও ভূমিমন্ত্রী। ফলে রাজনৈতিক ঐতিহ্যসমৃদ্ধ পরিবারেই বেড়ে ওঠেন মির্জা ফয়সল আমীন।
তবে পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে নিজের সাংগঠনিক অবস্থান তৈরি করতেই দীর্ঘ সময় মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় থেকেছেন তিনি। ১৯৭৯ সালে বাবার নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে রাজনীতির সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা শুরু হয়।
মির্জা ফয়সল আমীন ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। পরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। শিক্ষাজীবন শেষে তিনি আইএফআইসি ব্যাংকে কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। তবে ব্যাংকিং পেশায় দীর্ঘদিন থাকেননি। ১৯৯১ সালে চাকরি ছেড়ে স্থায়ীভাবে ঠাকুরগাঁওয়ে ফিরে আসেন। এরপর বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রমে নিজেকে আরও সক্রিয়ভাবে যুক্ত করেন।
স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় কর্মকাণ্ড, নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সাংগঠনিক কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করেন। দীর্ঘ পথচলায় তিনি ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সহসভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৬ সালের আগস্টে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হন তিনি। পরের বছর ২৪ মে অনুষ্ঠিত জেলা বিএনপির সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। টানা আট বছর এ দায়িত্ব পালনের পর ২০২৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত সম্মেলনে জেলা বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হন।
দলীয় রাজনীতির পাশাপাশি স্থানীয় সরকারেও দায়িত্ব পালন করেছেন মির্জা ফয়সল আমীন। ২০১৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তিনি। ওই নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগে তিনটি কেন্দ্রের ভোট স্থগিত করা হয়। পরে স্থগিত কেন্দ্রগুলোতে পুনরায় ভোটগ্রহণ শেষে ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে তাকে বেসরকারিভাবে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।
ওই নির্বাচনে তিনি ১৯ হাজার ১৮৪ ভোট পান। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী পান ১২ হাজার ৭৪৪ ভোট। পরে ২০১৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০২১ সাল পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় পৌরসভার বিভিন্ন উন্নয়ন ও নাগরিক সেবামূলক কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন তিনি। স্থানীয় সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতা তার রাজনৈতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
রাজনীতির পাশাপাশি ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও সম্পৃক্ততা রয়েছে মির্জা ফয়সল আমীনের। চলতি বছর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালনা পর্ষদের নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও জেলা ক্রীড়া সংস্থার কাউন্সিলর হিসেবে রংপুর বিভাগ থেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পরিচালক নির্বাচিত হন তিনি। পরে ৯ জুন বিসিবির পরিচালনা পর্ষদের প্রথম সভায় তাকে ডিসিপ্লিনারি কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান করা হয়। এ ছাড়া তিনি নিশ্চিন্তপুর থিয়েটার ও অ্যাপোলো ইলেভেন ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা। ঠাকুরগাঁও নাট্য সমিতি ও টাউন ক্লাবের সঙ্গেও সাংগঠনিকভাবে যুক্ত রয়েছেন।
