শুক্রবার ৩০শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৪ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

Advertise with us

সরকারমুখী ব্যাংকিং, দ্বিমুখী চাপ

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ৩ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

সরকারমুখী ব্যাংকিং, দ্বিমুখী চাপ

ব্যাংকিং খাতের ঋণপ্রবাহ ক্রমেই সরকারমুখী হয়ে পড়ছে। এতে বেসরকারি খাত প্রয়োজনীয় ঋণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অন্যদিকে, ব্যাংক খাতের একাংশ যখন তীব্র তারল্যসংকটে ভুগছে, তখন পুরো খাতে জমছে বিপুল অলস অর্থ। খেলাপি ঋণ, অর্থ পাচার, অনিয়ম ও ব্যাংকের ওপর আস্থার সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ব্যাংক খাতের এই দ্বিমুখী চাপের পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল সুশাসন এবং প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণকে দায়ী করেছেন অর্থনীতিবিদেরা। তাঁদের মতে, ব্যাংকিং ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরাতে হলে ঋণ ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি রাষ্ট্র ও অর্থনীতিতে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণও কমাতে হবে।

রাজধানীর মিরপুরে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) আয়োজিত ‘অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে ব্যাংক খাতের পুনর্গঠন’ প্রতিপাদ্যে দুই দিনব্যাপী এ সম্মেলনের শেষ দিনের প্রথম অধিবেশনে এসব বিষয় উঠে আসে। গতকাল বৃহস্পতিবারের এ অধিবেশনে ব্যাংক খাতের সংকট, সুশাসন ও ঋণপ্রবাহের দুর্বলতার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন আমন্ত্রিত আলোচকেরা। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক বরকত-এ-খোদা। আলোচনায় অংশ নেন জাতীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ। স্বাগত ভাষণ দেন বিআইবিএমের অধ্যাপক শাহ মো. আহসান হাবিব।

আস্থার সংকটে ব্যাংক
ব্যাংকিং খাতের ঋণপ্রবাহ সরকারমুখী হয়ে পড়েছে বলে মনে করেন জাতীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ। তাঁর মতে, বেসরকারি খাতে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর মনোযোগ কমে যাওয়ায় শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। দীর্ঘ মেয়াদে এ পরিস্থিতি অর্থনীতিতে ঋণের চাপ বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে সরকারের ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধের সক্ষমতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।

ব্যাংক ও শিল্পকারখানার বেসরকারিকরণ নিয়ে আলোচনা হলেও রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও সুবিধা বণ্টনে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ভূমিকা বড় বাধা বলেও মন্তব্য করেন এই অর্থনীতিবিদ। তাঁর মতে, ব্যাংক খাতের সংস্কার শুধু আর্থিক নীতিমালায় সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না, সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।

অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ দাবি করেন, দেশের ব্যাংকিং খাত অত্যন্ত দুর্বল ও ভঙ্গুর অবস্থায় পৌঁছেছে। অনিয়মের কারণে ব্যাংকের ওপর মানুষের আস্থা কমে গেছে। যদি বাজারের নিয়ম পুরোপুরি অনুসরণ করা হতো, তাহলে অনেক দুর্বল ব্যাংক এত দিন টিকে থাকতে পারত না। বরং নানা উদ্যোগে সেগুলো চালু রাখা হয়েছে, এসব উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন তিনি।

অল্পসংখ্যক প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও ধনীর স্বার্থে রাষ্ট্রীয় সুবিধা দেওয়ার প্রবণতাই মূলত ব্যাংক খাতের এই অবস্থার জন্য দায়ী উল্লেখ করে মাহবুব উল্লাহ বলেন, বাংলাদেশ একটি শোষণমূলক রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে, যেখানে সাধারণ মানুষের পরিবর্তে সুবিধা পেয়েছে প্রভাবশালী গোষ্ঠী। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে এসব গোষ্ঠীর উত্থান ঘটেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এই জাতীয় অধ্যাপক বলেন, কয়েকটি ব্যাংক এখনো ভালোভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এসব ব্যাংকের অভিজ্ঞতা থেকে অন্যদের শেখার সুযোগ রয়েছে। তবে ব্যাংক খাতের মৌলিক সমস্যা সমাধান করতে হলে রাষ্ট্রের চরিত্র ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনতে হবে। অল্প কয়েকজনের স্বার্থের পরিবর্তে সাধারণ মানুষের স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দেন তিনি।

অলস অর্থ, তবু তারল্যসংকট
মূল প্রবন্ধে অধ্যাপক বরকত-এ-খোদা ব্যাংক খাতের বিপরীতমুখী পরিস্থিতি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, কিছু দুর্বল ও শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক তীব্র তারল্যসংকটে রয়েছে। অথচ পুরো ব্যাংকিং খাতে অলস বা অতিরিক্ত তারল্য বেড়ে রেকর্ড ছাড়িয়েছে। তাঁর উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে অলস তারল্যের পরিমাণ ৪ ট্রিলিয়ন টাকার বেশি হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৩৯ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ, একদিকে কিছু ব্যাংকের হাতে গ্রাহকের চাহিদা মেটানোর মতো পর্যাপ্ত অর্থ নেই, অন্যদিকে পুরো খাতের একটি বড় অংশের অর্থ ঋণ হিসেবে বিনিয়োগ হচ্ছে না।

বরকত-এ-খোদা অস্বাভাবিক খেলাপি ঋণের পেছনে তিনটি কারণ চিহ্নিত করেন; রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্বল সুশাসন, নমনীয় নীতিমালা এবং বারবার ঋণ পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়া, আর বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির ধীরগতি।

অর্থ পাচার ও অনিয়মের ক্ষতি
ব্যাংক খাতের ক্ষতির পেছনে অর্থ পাচার, জাল ঋণ ও আর্থিক অনিয়মের কথাও তুলে ধরেন বরকত-এ-খোদা। তাঁর হিসাবে, ভুয়া ঋণ ও দুর্নীতির মাধ্যমে প্রায় ৫ লাখ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। আর প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠী আড়াই থেকে ৩ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বরকত-এ-খোদা বলেন, ব্যাংকের কিছু পরিচালক ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী যথাযথ জামানত ছাড়াই ঋণ নিয়েছেন। রাজনৈতিক ব্যক্তি, ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের একাংশের যোগসাজশে অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়েছে। সূত্র আজকের পত্রিকা

 

Facebook Comments Box
Advertise with us

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

Advertise with us
আরও
Advertise with us

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

ফলো করুন দেশবার্তা-এর খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক
মো: সামসুদ্দীন চৌধুরী
সম্পাদকীয় কার্যালয়