
নিজস্ব প্রতিবেদক | বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬ | প্রিন্ট | ৭ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ খাতে নাজুক পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। উৎপাদনের তুলনায় চাহিদা বেশি হওয়ায় সারা দেশে বিদ্যুৎসংকট ক্রমেই তীব্র আকার ধারণ করছে। রাজধানীর বাইরে প্রতিদিন ৮ থেকে ১৩ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে চোখের সামনেই বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে রিকশার ব্যাটারি চার্জে। তবে দেশে মোট কতটি ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করছে এবং এগুলোর জন্য কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই সরকারসংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছে।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, অবৈধ ও নিয়ন্ত্রণহীনভাবে পরিচালিত এসব ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে রাজধানীর পাশাপাশি জেলা ও গ্রাম পর্যায়ে। এসব রিকশার অধিকাংশই অননুমোদিতভাবে চার্জ করা হয়, যা জাতীয় গ্রিডের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। এর ফলে একদিকে বিদ্যুৎসংকট আরও প্রকট হচ্ছে, অন্যদিকে সরকার হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব।
সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীসহ সারা দেশে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ভ্যানের নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান সরকারি কোনো কর্তৃপক্ষের কাছেই নেই। পাশাপাশি অবৈধভাবে এসব বাহন চার্জ করতে গিয়ে কী পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে, তারও কোনো হিসাব বিদ্যুৎ বিভাগের কাছে নেই। তবে বিভিন্ন গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট খাতের কর্মকর্তাদের ধারণা অনুযায়ী, দেশে এক কোটির বেশি এমন যান চলাচল করছে, যার বড় অংশই অনিবন্ধিত।
বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির তথ্যমতে, সারা দেশে বর্তমানে ৭০ থেকে ৮০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করছে। পাশাপাশি ভ্যানসহ তিন চাকার অন্য গাড়ি তো রয়েছেই। আর রাজধানীতেই ১২ লাখ থেকে ১৫ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করে। এসব রিকশার কোনোটি ৪টি, আবার কোনোটি ৬টি ব্যাটারিতে চলে। সাধারণত ১২ ভোল্টের এসব ব্যাটারি চার্জ হতে সময় লাগে ৫ থেকে ৭ ঘণ্টা। প্রতিবার একটি রিকশায় চার্জ দিতে বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয় গড়ে ৬ থেকে ১০ ইউনিট। প্রতিদিন ১৫ লাখ রিকশার চার্জে বিদ্যুৎ খরচ হয় ৯০ লাখ থেকে দেড় কোটি ইউনিট। সে হিসেবে মাসে খরচ হয় ২৭ কোটি থেকে ৪৫ কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) জানিয়েছে, প্রতিদিন জাতীয় গ্রিড থেকে অন্তত ৭ থেকে ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে শুধু ব্যাটারিচালিত রিকশা চার্জিংয়ের জন্য। এসব চার্জিং স্টেশনের অধিকাংশই অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এতে বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।
ঢাকা মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর ৮টি জোনে বৈধ স্টেশনের পাশাপাশি রয়েছে ৪৮ হাজারের বেশি অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট এবং প্রায় ১ হাজার গ্যারেজ, যেখানে নিয়মিত ব্যাটারি চার্জিং কার্যক্রম চলছে। এসব গ্যারেজের অনেকটিতেই বৈধ বিদ্যুৎসংযোগ থাকলেও তার আড়ালে অবৈধ সংযোগ ব্যবহার করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, সারা দেশে ৬০ থেকে ৮০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা রয়েছে। রাজধানীতে চলছে ১২ লাখ থেকে ১৫ লাখ। এর সঙ্গে দৈনিক ১ হাজার যোগ হচ্ছে। ঢাকার বাইরে কত যোগ হচ্ছে, তা কল্পনাও করা যাবে না। সবাই এখন এই ব্যাটারি রিকশায় ঝুঁকছেন। এতে আমাদের চাল উৎপাদন কমে গেছে, ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পও এখন আমদানিনির্ভর হচ্ছে।
তিনি জানান, যাত্রী কল্যাণ সমিতি থেকে এসব রিকশা নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সরকারের এ বিষয়ে কোনো মনোযোগই নেই। সরকার ব্যস্ত রয়েছে ‘প্রজেক্ট’ নিয়ে। এভাবে অটোরিকশা লাগামহীনভাবে চলতে থাকলে আগামী দুই বছরের মধ্যে ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহর অচল হয়ে যাবে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী ও এর আশপাশের এলাকায় প্রায় ৫০ হাজার অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে। এ ছাড়া প্রায় ১ হাজার গ্যারেজে নিয়মিত অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জিং কার্যক্রম চলছে, যার একটি বড় অংশই অবৈধ সংযোগনির্ভর।
অবৈধ অটোরিকশায় দৈনিক কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ অপচয় হচ্ছে? এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের সদস্য (বিতরণ ও পরিচালন) মো. আবদুর রহিম মল্লিক কোনো নির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে এ বিষয়ে কোনো তথ্য নেই। আমরাও জানতে আগ্রহী– এই অটোরিকশাগুলোর সংখ্যা কত এবং তারা কত বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে।’
এ বিষয়ে আপনাদের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কি না- জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখনো কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। কোনো পরিকল্পনা আছে কি না, জানতে চাইলে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের এই সদস্য সঠিক কোনো জবাব দিতে পারেননি।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের কাছেও ব্যাটারি রিকশার সংখ্যা সম্পর্কে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। সংস্থাগুলো ঢাকা মহানগর পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেয়। যোগাযোগ করা হলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গণমাধ্যম শাখার উপ-কমিশনার এন এম নাসির উদ্দিন জানান, ‘ব্যাটারিচালিত রিকশা বা ইজিবাইকের কোনো তালিকা আমাদের কাছে নেই।’
যদিও গত মঙ্গলবার ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সংস্থাটির প্রশাসকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সভায় অবৈধ রিকশা নিয়ন্ত্রণে সরকারি নীতিমালা প্রণয়নের কথা বলা হয়। সভায় জানানো হয়, রাজধানীতে লাইসেন্সবিহীন ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় যানজট তীব্র হচ্ছে এবং নগরবাসীর নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে।
পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, দেশে তীব্র বিদ্যুৎসংকট চললেও ব্যাটারিচালিত রিকশার বিষয়ে সরকারের কার্যকর কোনো নজরদারি নেই। কোথায় এসব রিকশার যন্ত্রাংশ তৈরি হচ্ছে বা কোথায় গ্যারেজ রয়েছে– সেসব বিষয়েও তদারকি করা হচ্ছে না।
তিনি বলেন, সরকারের নীতিমালা থাকলেও তার বাস্তবায়ন নেই। নিয়মিত তদারকি ও সংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেটকে জবাবদিহির আওতায় আনা না গেলে এই খাত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়। ফলে প্রতিদিনই বাড়ছে ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা, বাড়ছে বিদ্যুৎ চুরি। কিন্তু জাতীয় সম্পদের এই অপচয় যেন দেখার কেউ নেই।
রাজধানীর বাইরেও ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইকের দাপট বিরাজমান। এসব যান চার্জ দিতে গিয়ে একইভাবে ব্যাপক বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে। খবরের কাগজের ময়মনসিংহ বিভাগীয় প্রতিনিধি জানিয়েছেন, নগরীতে অনুমোদিত ইজিবাইক ৭ হাজার, ব্যাটারিচালিত রিকশা ১২ হাজার থাকলেও প্রতিদিন গড়ে এর দ্বিগুণ ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করে। প্রতিদিন এসব যানের ব্যাটারি চার্জ দিতে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ লাগছে। যেখানে জনগণের সাধারণ চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে বিদ্যুৎ বিভাগ, সেখানে তিন চাকার ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত রিকশা বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
নগরীর অনেক জায়গায় ইজিবাইক চার্জ দেওয়ার জন্য গ্যারেজ রয়েছে। অধিকাংশ ইজিবাইক রাতে আবাসিক লাইনে চার্জ দেওয়া হয়, যা বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।
রাজশাহী ব্যুরো জানায়, বিদ্যুৎসংকটের এই সময়ে নগরীর মোট চাহিদার ৫ থেকে ১০ শতাংশই ব্যয় হচ্ছে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইকের ব্যাটারি চার্জ দিতে। রাজশাহী সিটি করপোরেশনের তথ্য মতে, নগরীতে বৈধ অটোরিকশার সংখ্যা প্রায় ১৬ হাজার হলেও বাস্তবে প্রায় ৩০ হাজার অটোরিকশা চলাচল করছে। নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসির (নেসকো)র তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহীতে দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৩০০ থেকে সাড়ে ৩৫০ মেগাওয়াট। এর মধ্যে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চার্জ দিতে প্রতিদিন প্রায় ১৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে। অর্থাৎ মোট চাহিদার আনুমানিক ৪ থেকে ৫ শতাংশ বিদ্যুৎ যাচ্ছে এই খাতে। অবৈধ অটোরিকশার হিসাব যুক্ত করলে এই পরিমাণ বেড়ে ২৫-৩০ মেগাওয়াট হতে পারে। গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ায় এমনিতেই লোডশেডিং হচ্ছে। রাতে অসংখ্য রিকশার ব্যাটারিতে চার্জ দেওয়ার কারণে বিদ্যুতের ওপর চাপ আরও বাড়ছে।
খুলনা প্রতিনিধি জানান, নগরীর গোবরচাকা বাগানবাড়ি, শেখপাড়া বাজার, বসুপাড়া হাজী ইসমাইল রোড ও পৈপাড়া এলাকায় ইজিবাইকের চারটি চার্জিং পয়েন্ট গড়ে তোলা হয়েছে। প্রতিটি চার্জিং পয়েন্টে দিন-রাত গড়ে ৫০ থেকে ৭০টি ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত রিকশায় চার্জ দেওয়া হয়। এসব এলাকা ছাড়াও, নগরীর সোনাডাঙ্গা আলীর ক্লাব, মহিবাড়ি খালপাড়, সেনাডাঙ্গা বাইপাস রোড, লায়ন্স স্কুলের কাছে শেরে বাংলা রোড, হরিণটানা, কৃষ্ণনগর, খালিশপুর ও দৌলতপুর এলাকায় অলিগলিতে তিন শতাধিক চার্জিং পয়েন্ট আছে। এসব পয়েন্টে অবৈধ বিদ্যুৎসংযোগ নিয়ে ইজিবাইক ও রিকশার ব্যাটারি চার্জ দেওয়া হচ্ছে।
রংপুর প্রতিনিধি জানান, যানজটের শহর হিসেবে পরিচিত রংপুর সিটি করপোরেশনে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দৌরাত্ম্য দিন দিন বেড়েই চলছে। এখানে বিদ্যুতের বড় অংশ খরচ হয় এসব যানের ব্যাটারিতে চার্জ দিতে গিয়ে। বসতবাড়ির বিদ্যুৎ দিয়ে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক চার্জ দেওয়া হচ্ছে। ফলে বাসা বাড়ির লাইনের বিদ্যুৎ খরচ বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যুতের খুঁটি থেকে অবৈধ সংযোগ নিয়ে চার্জ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। একটা রিকশার ব্যাটারি রিকশা ৮ ঘণ্টা চার্জ দিতে হয়।
কুমিল্লা প্রতিনিধি জানান, নগরীতে কমপক্ষে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক চলাচল করে। এ ছাড়াও জেলার ১৭ উপজেলা মিলিয়ে এ সংখ্যা ৫০ হাজারের বেশি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি জানান, জেলায় গ্রাহকচাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম হওয়ায় বিদ্যুতের লোডশেডিং বেড়েছে। প্রতিদিন জেলা শহরে ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। গ্রামাঞ্চলে এই সময়কাল ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত। তবে বিদ্যুতের ঘাটতির মাঝেই জেলা শহরে প্রতিদিন প্রায় কয়েক মেগাওয়াট বিদ্যুৎ গিলে খাচ্ছে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক। অনুমোদনের চেয়ে প্রায় ৩ গুণ চলছে এসব যানবাহন। মূলত, জেলা শহরে ৩ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ১ হাজার ইজিবাইক চলাচলের অনুমোদন রয়েছে। তবে প্রকৃত পক্ষে চলাচল করছে ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার ব্যাটারি চালিত রিকশা। বিপুল পরিমাণ এই রিকশা-ইজিবাইক চার্জ করার জন্য গড়ে উঠেছে অসংখ্য গ্যারেজ। বেশির ভাগ গ্যারেজে রয়েছে বিদ্যুতের চোরাই সংযোগ।
