বৃহস্পতিবার ১৪ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩১শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

Advertise with us

জ্বরের ৯৮% রোগীর ছিল চিকুনগুনিয়া

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ৮ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

জ্বরের ৯৮% রোগীর ছিল চিকুনগুনিয়া

ঢাকা, চট্টগ্রামসহ সারাদেশে গত বছর ব্যাপক মাত্রায় জ্বরের প্রকোপ দেখা দিয়েছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় চিকুনগুনিয়া শনাক্ত হয়েছিল। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে তা ধরা পড়েনি। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, গত বছর জ্বরে আক্রান্ত ৯৮ শতাংশ রোগী পরবর্তী সময়ে মশাবাহিত গুরুতর রোগ চিকুনগুনিয়ায় সংক্রমিত হয়েছেন।

ঢাকা ও চট্টগ্রামের পাঁচটি হাসপাতালের ৪৪২ জন রোগীর ওপর গবেষণা চালিয়ে এমন তথ্য পেয়েছেন একদল চিকিৎসক-গবেষক। তারা জানান, গবেষণা ছিল বহুমাত্রিক ক্রস-সেকশনাল। গত বছরের আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে এটি পরিচালিত হয়।

গবেষণায় দেখা যায়, চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত রোগীর ৬০ শতাংশ নারী ও ৪০ শতাংশ পুরুষ। অনেককেই জ্বরে ভুগতে হয় টানা কয়েক সপ্তাহ। তাই পাঁচ দিনের ওপরে ভর্তি থাকতে হয় হাসপাতালেও।

গবেষকরা জানান, এসব রোগীর মধ্যে শুধু শরীরের গিঁটে ব্যথায় কাতর হয়েছে সর্বোচ্চ ৯৭ শতাংশ। ৭১ শতাংশের শরীরে মিলেছে অস্থিসন্ধিতে দুলুনি ও স্পর্শকাতরতা। এসব কারণে আক্রান্ত রোগীর ৭০ শতাংশই চলাফেরা ও দৈনন্দিন কাজকর্মে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হন। আক্রান্তদের মধ্যে সর্বোচ্চ ৭৬ শতাংশই টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত এবং আইজিএম পজিটিভ ৭৪ শতাংশের। রোগটি নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন ও বিষণ্ন ছিলেন ৪৯ শতাংশ।

গবেষণাটির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্তের কারণে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে জীবনমানের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব তুলে ধরা। গবেষণায় রোগীর মধ্যে চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার আগে জ্বরে আক্রান্ত সর্বোচ্চ ৪৩৩ জন, যা মোট রোগীর প্রায় ৯৮ শতাংশ। সর্বনিম্ন তিন দিন থেকে টানা কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত জ্বরে কাবু থাকতে হয় এসব রোগীকে। ২২ শতাংশ রোগীকে একেবারে শয্যাশায়ী থাকতে হয়।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল, ঢাকার পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ডেল্টা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রোগীদের ওপর গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়। দেশের তিনটি উন্নত ল্যাবে এসব রোগীর জিনোম সিকোয়েন্স করা হয়। গত ১৭ এপ্রিল জার্মানির মিউনিখে অনুষ্ঠিত ইউরোপীয় সোসাইটি অব ক্লিনিক্যাল মাইক্রোবায়োলজি অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেসের (ইএসসিএমআইডি) বৈশ্বিক সম্মেলনে গবেষণাটি উপস্থাপন করা হয়। সেখানে এটি প্রশংসা কুড়িয়েছে। গবেষণাটি পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশনের প্রাতিষ্ঠানিক পর্যালোচনা বোর্ড দ্বারাও অনুমোদিত।

বৃহৎ এই গবেষণার নেতৃত্বে ছিলেন ট্রপিক্যাল ডিজিজ অ্যান্ড হেলথ রিসার্চ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ডা. মোহাম্মদ জাহিদ হাসান, ঢাকা মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক মো. শাহাবুল হুদা চৌধুরী, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুনা ইসলাম, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. আবু সাইফ মোহাম্মদ লুৎফুল কবির ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. এইচ এম হামিদুল্লাহ মেহেদী, ডেল্টা মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের প্রধান সাদিয়া ইসলাম, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের রেসিডেন্ট (ল্যাবরেটরি মেডিসিন) তানজিন নাহার, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ডা. জান্নাতুল ফারদৌস, আশিয়ান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক রিফায়া তাসনিম, পপুলার মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক কাজী তরিকুল ইসলাম ও আসিফ আহমেদ, সাউদার্ন মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক মো. আতিকেল ইসলাম চৌধুরী, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জুনিয়র কনসালট্যান্ট মাধবী কর্মকার, পিআই রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট মো. মাহির ফয়সাল আকাশ ও জুনিয়র কনসালট্যান্ট মহিউদ্দিন শরীফ।

গবেষণায় চিকুনগুনিয়ায় কাবু হওয়া রোগীদের মধ্যে ৭১ শতাংশের মাঝে হাঁটু, গোড়ালি ও অস্থিসন্ধিতে গুরুতর প্রভাবিত করার প্রমাণ মিলেছে। অন্য উপসর্গের মধ্যে ৫৯ শতাংশ রোগীর পেশি ব্যথা, ৫৩ শতাংশের ফুসকুড়ি, ৪২ শতাংশের বমি, ১৫ শতাংশের ডায়রিয়া, চোখের পেছনে ব্যথা ১৩ শতাংশের, মুখের ঘা ১২ দশমিক ২ শতাংশের এবং মাথাব্যথা পাওয়া গেছে সাড়ে ৭ শতাংশের। আরটি-পিসিআর পজিটিভ মিলেছে ২৭ শতাংশের। পেটে ব্যথা ৯ দশমিক ৭ শতাংশ, ৬ শতাংশ রোগী পেট ফোলা থাকার তথ্য-প্রমাণও মিলেছে। রোগটি নিয়ে মাঝারিভাবে বিষণ্ন ছিলেন ৫০ শতাংশ। রোগীদের অস্থিসন্ধি আক্রান্ত হওয়ার অনুপাত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশের ছিল হাঁটুতে ব্যথা। ৫৮ শতাংশের গোড়ালি, ছোট জয়েন্টগুলোতে ৪৮ শতাংশের, ৩০ শতাংশের ব্যথা ছিল কনুইয়ে।

এ প্রসঙ্গে ট্রপিক্যাল ডিজিজ অ্যান্ড হেলথ রিসার্চ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ডা. মোহাম্মদ জাহিদ হাসান বলেন, দেশে সর্বশেষ ২০১৭ সালে প্রাদুর্ভাবের পর ২০২৫ সালে চিকুনগুনিয়ার ভয়াবহ পুনরুত্থান ঘটে। ক্রমান্বয়ে রোগীর হার আশঙ্কাজনক হারে বাড়তে থাকায় দুশ্চিন্তায় পড়ে যায় সবাই। তাই চিকুনগুনিয়া রোগীদের মহামারি সংক্রান্ত বৈশিষ্ট্য নিরূপণ করা এই গবেষণার প্রধান লক্ষ্য ছিল।

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. আবু সাইফ মোহাম্মদ লুৎফুল কবির বলেন, চট্টগ্রামে ২০২৫ সালের জুলাই-আগস্টের দিকে টানা কয়েক মাস চিকুনগুনিয়ার ভয়াবহতা দেখা যায়। সে সময়টিতে হাসপাতাল ও ডাক্তারদের ব্যক্তিগত চেম্বারে প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা, যা থেকে বাদ যায়নি শিশু থেকে বয়স্করাও। আট বছর পর কেন এত বেশি রোগী রোগটিতে আক্রান্ত হয়েছে তার বিস্তারিত তুলে ধরতেই গবেষণাটির উদ্যোগ নেওয়া হয়, যা ভবিষ্যতে চিকিৎসা সেবা প্রদানে বড় ভূমিকা রাখবে।

ডা. এইচ এম হামিদুল্লাহ মেহেদী বলেন, ‘গবেষণায় পুরুষদের চেয়ে নারীরা চিকুনগুনিয়ায় বেশি আক্রান্ত হয়েছে। আক্রান্তদের জীবনযাত্রার মানের উল্লেখযোগ্য অবনতিও ঘটেছে, যেখানে নারীরা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রমাণ মিলেছে। রোগীরা শরীরের প্রতিটি জয়েন্টে অতিমাত্রায় ব্যথায় কাতর হওয়ার একাধিক তথ্য পেয়েছি গবেষণায়।’

গবেষকরা জানান, মৃদ্যু, মাঝারি ও তীব্র– এ তিন ক্যাটেগরিতে রোগীর দৈনন্দিন চলাফেরা, নিজের প্রতি যত্ন নেওয়া, স্বাভাবিক কাজকর্মে নেতিবাচক প্রভাব, মানসিক বিষণ্নতাকে মূল্যায়ন করা হয়েছে। গবেষণাকাজে বর্ণনামূলক এবং অনুমানমূলক পরিসংখ্যান ব্যবহার করে ডেটা বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যাতে রোগীর সামগ্রিক স্বাস্থ্য অবস্থা মূল্যায়ন করা যায়। চিকুনগুনিয়ার আদ্যোপান্ত তুলে ধরতে বেশি বেশি গবেষণার ওপর জোর দিয়েছেন গবেষকরা।

চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ২০২৫ সালের জুন থেকে চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত রোগী শনাক্তের হার ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। বিশেষ করে জুলাই থেকে দেশের অন্য এলাকার তুলনায় চট্টগ্রামে কয়েক গুণ বেড়ে যায় রোগী শনাক্তের হার, যা অব্যাহত ছিল ডিসেম্বর পর্যন্ত।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য বলছে, চিকুনগুনিয়া ভাইরাস দমনে কোনো ওষুধ বা টিকা নেই। উপসর্গের মোকাবিলা করাটাই প্রধান চিকিৎসা। ১১৯টি দেশের প্রায় ৫৬০ কোটি মানুষই এটির বিপদে আছে। তাই এ রোগ থেকে সতর্কতা অবলম্বন জরুরি।

Facebook Comments Box
Advertise with us

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

Advertise with us
আরও
Advertise with us

ফলো করুন দেশবার্তা-এর খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক
মো: সামসুদ্দীন চৌধুরী
সম্পাদকীয় কার্যালয়