বৃহস্পতিবার ১৪ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩১শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

Advertise with us

মোটরসাইকেলমালিকদের ওপর কর বসতে পারে, যৌক্তিকতা কতটা

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ১৪ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

মোটরসাইকেলমালিকদের ওপর কর বসতে পারে, যৌক্তিকতা কতটা

আগামী বাজেটে মোটরসাইকেলমালিকদের ওপর করের খড়্গ নেমে আসতে পারে। যাঁদের মোটরসাইকেল আছে, তাঁদের আয়করের আওতায় আনার চিন্তাভাবনা চলছে। তাঁদের ওপর অগ্রিম কর (এআইটি) বসানো হতে পারে। উবার, পাঠাওয়ের চালকসহ যেসব ব্যক্তি নিজের মোটরসাইকেলে ‘রাইড শেয়ারিং’ করে সংসার চালান, তাঁদের ওপরও অগ্রিম কর বসবে।

অগ্রিম কর মানে হলো ব্যক্তির করযোগ্য আয় হবে ধরে নিয়ে আগাম টাকা নিয়ে নেওয়া। প্রশ্ন উঠেছে, মোটরসাইকেলচালক মানেই কি করযোগ্য আয় করা ব্যক্তি?

এখন করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে তিন লাখ টাকা। অর্থাৎ এর চেয়ে বার্ষিক আয় বেশি হলে আয়কর দিতে হয়।

বহু মোটরসাইকেলচালক আছেন, যাঁদের করযোগ্য আয় নেই। তাঁদের কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) নেই। বছর শেষে আয়কর রিটার্নও জমা দিতে হয় না।

অনেককে পরিবার থেকে মোটরসাইকেল কিনে দেওয়া হয় সহজে যাতায়াতের জন্য।

শিক্ষার্থীদের অনেকে মোটরসাইকেল চালান। টিউশনের টাকা বা অস্থায়ী কাজের আয় দিয়ে তাঁরা বাইক চালান। অনেক ডেলিভারিম্যান (পণ্য সরবরাহকারী) নিজের মোটরসাইকেলে এই সেবা দিয়ে থাকেন।

গ্রামগঞ্জে অনেকে মোটরসাইকেল চালান। তাঁদের বিশাল অংশ করজালের আওতার বাইরে আছে। তাঁদের এখন অগ্রিম কর দিতে হতে পারে।

মোটরসাইকেলচালক এবং এ খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, করযোগ্য আয় না থাকা মানুষের কাছ থেকে অগ্রিম আয়কর নেওয়ার কোনো যুক্তি নেই। সরকার যদি শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত নেয়, সেটা অনেকটা জোর করে টাকা নেওয়ার মতো হবে।

বাংলাদেশ মোটরসাইকেল অ্যাসেম্বলার্স অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মতিউর রহমান বলেন, মোটরসাইকেল কেনা ও নিবন্ধনের সময় ক্রেতারা নানা ধরনের কর ও মাশুল দেন। সেটার পরিমাণ অনেক বেশি। এখন আবার অগ্রিম কর বসানো অযৌক্তিক হবে।

মতিউর রহমান আরও বলেন, মোটরসাইকেল বিক্রির অবস্থা খুব খারাপ। সরকারের উৎসাহ পেয়ে দেশে কারখানা করার পর থেকে একের পর এক ধাক্কা আসছে, অযৌক্তিক নীতি করা হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করা হচ্ছে না। এটা শিল্পের জন্য ক্ষতিকর।

কর কত হতে পারে

আগামী (২০২৬-২৭) অর্থবছরের বাজেটে করসংক্রান্ত প্রস্তাব নিয়ে সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠক করেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তারা। ওই বৈঠকে মোটরসাইকেলমালিকদের করের আওতায় আনা নিয়ে আলোচনা হয়।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, সভায় কম সিসির (ইঞ্জিনক্ষমতা) মোটরসাইকেলের অগ্রিম কর আরোপ না করা নিয়ে একমত পোষণ করা হয়। তবে ১১১-১২৫ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে বছরে ২ হাজার টাকা; ১২৬-১৬৫ সিসির ক্ষেত্রে ৫ হাজার টাকা এবং ১৬৫ সিসির বেশি মোটরসাইকেলের মালিকদের ওপর বছরে ১০ হাজার টাকা অগ্রিম আয়কর আরোপ করা হতে পারে।

কীভাবে অগ্রিম নেওয়া হবে, তা নিয়ে আলোচনা হয়নি। এনবিআরের কর বিভাগের কর্মকর্তারা মোটরসাইকেলমালিকদের ওপর অগ্রিম কর বসানোর বিষয়টি নিয়ে আরও পর্যালোচনা করছেন। শুল্ক-কর প্রস্তাব নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বিষয়টি চূড়ান্ত হতে পারে।

যানবাহনের ক্ষেত্রে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, প্রাইভেট কার, জিপ, পিকআপ, বাস, ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহনের মালিকদের অগ্রিম কর দিতে হয়। এসব যানবাহনমালিকের কাছ থেকে বছরে যানবাহনপ্রতি আড়াই হাজার থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত অগ্রিম কর নেওয়া হয়, যা চূড়ান্ত কর দায়। যানবাহনমালিকের করযোগ্য আয় না থাকলেও তা ফেরত দেওয়া হয় না।

মোটরসাইকেলমালিকদের এই অগ্রিম কর নেই। এখন অগ্রিম কর বসালে অন্য যানবাহনমালিকদের মতো স্বাভাবিকভাবেই চূড়ান্ত কর দায় হিসেবেই আরোপিত হবে। মোটরসাইকেলমালিকদের করযোগ্য আয় না থাকলেও তাঁদের বাধ্য হয়ে অগ্রিম কর দিতে হবে।

এনবিআরের আয়কর বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এখন রয়েল এনফিল্ডসহ দামি মোটরসাইকেল বাজারে পাওয়া যায়। সামর্থ্যবান লোকেরাই বেশি সিসির দামি মোটরসাইকেল কেনেন। বেশি সিসির মোটরসাইকেলের মালিকদের অগ্রিম করের আওতায় আনা যায় কি না, তা চিন্তাভাবনা করছে এনবিআর।

কেন অগ্রিম কর বসায় এনবিআর

কর কর্মকর্তারা মনে করেন, করদাতার সামাজিক অবস্থান, আয়, বাড়ি-গাড়িসহ সম্পদের পরিমাণ—এসব দেখে বোঝা যায় তাঁর করযোগ্য আছে। এ ধরনের করদাতার কাছ থেকে এনবিআর অগ্রিম কর আদায় করে।

কর কর্মকর্তারা ধরে নেন, তাঁদের করযোগ্য আয় আছে, এখন অগ্রিম কর দিলেও সমস্যা নেই। বছর শেষে রিটার্ন দেওয়ার সময় অগ্রিম কর দেওয়া করদাতারা তা সমন্বয় করতে পারবেন।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, মোটরসাইকেলের সব মালিকের করযোগ্য আয় আছে—এটা ধরে নেওয়া যৌক্তিক কি না।

বিশ্লেষকেরা মনে করেন, উৎসে বা অগ্রিম কর আদায় হলো এনবিআরের কর আদায়ের একটি সহজ পথ। রাজস্ব আদায়ের চাপে পড়ে কয়েক বছর ধরে এনবিআর এই সহজ পথে গেছে। বিভিন্ন খাতে উৎসে কর বা অগ্রিম কর বসিয়ে কর আদায় করা হয়।

বহু পেশাজীবী আছেন, যাঁদের কাছ থেকে যথেষ্ট কর আদায় করা যাচ্ছে না। বহু টিআইএনধারী আছেন, যাঁরা রিটার্ন জমা দেন না। তাঁদের কাছ থেকে বাড়তি কর আদায় করতে না পেরে সহজ পথে হাঁটার চেষ্টা দেখা যায়।

এনবিআরের আয়করনীতি বিভাগের সাবেক সদস্য সৈয়দ আমিনুল করিম বলেন, ধনী পরিবারের সন্তানেরা অনেক দামি মোটরসাইকেল চালান। তাঁদের ওপর অগ্রিম কর বসানো যেতে পারে। খেটে খাওয়া মানুষ, যাঁদের করযোগ্য আয় নেই, এমন মোটরসাইকেলমালিকদের ওপর অগ্রিম কর বসানো ঠিক নয়। এটা যৌক্তিকভাবে ভেবে দেখতে হবে।

মোটরসাইকেল বিক্রি কমছে

বর্তমানে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা প্রায় ৫০ লাখ। যদিও এই হিসাব স্বাধীনতার পর থেকে নিবন্ধিত সব মোটরসাইকেলের। এর একটি অংশ আর সড়কে চলে না।

মোটরসাইকেল খাতের কোম্পানিগুলোর দুই সংগঠন বাংলাদেশ মোটরসাইকেল অ্যাসেম্বলার্স ও ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএএমএ) এবং মোটরসাইকেল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এমএমইএবি) হিসাব অনুযায়ী, ২০১৮ সালের পর থেকে দেশে মোটরসাইকেল উৎপাদনে ১০টির মতো কারখানা স্থাপিত হয়েছে।

সুপরিচিত ভারতীয় ও জাপানি ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল এখন দেশেই উৎপাদিত হয়। কারখানা করতে বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা।

২০১৮ সালের মোটরসাইকেলশিল্প উন্নয়ন নীতিমালা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের মধ্যে দেশে বার্ষিক ১০ লাখ মোটরসাইকেল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু মোটরসাইকেল বিক্রি কমছে।

কোম্পানিগুলোর তথ্য, ২০২২ সালে দেশে ৬ লাখ মোটরসাইকেল বিক্রি হয়েছিল। ২০২৫ সালে তা কমে নেমেছে ৪ লাখ ৬৪ হাজারে।

জাপানের ইয়ামাহার কারিগরি সহায়তায় মোটরসাইকেলের কারখানা করা এসিআই মোটরসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুব্রত রঞ্জন দাস বলেন, বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি ‘প্রেডিক্টেবল’ (অনুমানযোগ্য) নীতিমালা দরকার। বারবার নীতি বদলালে বিনিয়োগ হয় না।

সুব্রত রঞ্জন দাস আরও বলেন, বেশির ভাগ মানুষ মোটরসাইকেল চালান প্রয়োজনের খাতিরে, গণপরিবহনের সংকটে। তাঁরা গাড়ি কিনতে পারেন না, কারণ দাম বেশি। করপোরেট কোম্পানিগুলোর বিক্রয় প্রতিনিধিদের অন্যতম বাহন মোটরসাইকেল।

সুব্রত রঞ্জন দাস বলেন, মোটরসাইকেল দেশের অর্থনীতির একটি ‘লাইফলাইন’। এখানে কর বসিয়ে সরকারের যতটা সুবিধা হবে, তার চেয়ে বেশি বিপাকে পড়বেন মানুষ। এটা যৌক্তিকভাবে বিবেচনায় নেওয়া দরকার।

ঢাকার রাস্তায় অনেকেই মোটরসাইকেল চালিয়ে সংসার চালান। তাঁদের একজন সুমন রহমান। গতকাল বুধবার কারওয়ান বাজারে যাত্রীর অপেক্ষায় ছিলেন তিনি।

অগ্রিম কর আরোপের বিষয়ে জানালে সুমন রহমান বলেন, ‘দিনে সাত থেকে আট ঘণ্টা মোটরসাইকেল চালালে শরীরে কিছু থাকে না। কোমর, ঘাড়সহ বিভিন্ন জায়গায় ক্ষয় হয়। এই কাজ আর করতে চাই না। সরকার একটা চাকরি দিক।’

Facebook Comments Box
Advertise with us
Advertise with us
আরও
Advertise with us

ফলো করুন দেশবার্তা-এর খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক
মো: সামসুদ্দীন চৌধুরী
সম্পাদকীয় কার্যালয়