নিজস্ব প্রতিবেদক | রবিবার, ১৭ মে ২০২৬ | প্রিন্ট | ২০ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
১৮২৭ সালে আনিওস জেডলিক (১৮০০-১৮৯৫) প্রথম বৈদ্যুতিক মোটর তৈরি করেন। সেটি তিনি একটি ছোট গাড়ি চালানোর জন্য ব্যবহার করেছিলেন।
১৮৯৬ সালে বাইসাইকেল তৈরির শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান পোপ ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম ব্যবহারোপযোগী বৈদ্যুতিক গাড়ি বাজারে নিয়ে আসে।
১৯০০ থেকে ১৯১০ সাল ছিল বৈদ্যুতিক গাড়ির সুসময়। তখন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ৩৮ শতাংশ ছিল বৈদ্যুতিক গাড়ির দখলে।
২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি টেসলা গ্রাহকদের বৈদ্যুতিক গাড়ি সরবরাহ শুরু করে।
২০১৫ সালে বাংলাদেশে বৈদ্যুতিক গাড়ি নিবন্ধন দেওয়া শুরু হয়।
২০২৪ সালে বিশ্বে ১ কোটি ৭০ লাখ বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রি হয়, যা আগের বছরের চেয়ে ২৫ শতাংশ বেশি।
২০২৬ সালের ১৪ মে পর্যন্ত বাংলাদেশে নিবন্ধিত হয়েছে ৬৬৯টি বৈদ্যুতিক যান।
তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী ও ব্যবসায়ী রাইসুল ইসলাম নিজের জ্বালানি তেলচালিত গাড়িটি বিক্রি করে দিয়ে একটি বৈদ্যুতিক গাড়ি কেনেন গত বছরের আগস্টে। তাঁর কাছে জানতে চেয়েছিলাম, বৈদ্যুতিক গাড়ি ব্যবহারের অভিজ্ঞতা কেমন? তিনি বললেন, ‘খুব ভালো।’
কেন ভালো, তা–ও ব্যাখ্যা করলেন রাইসুল। তিনি বললেন, আগে তিনটি তেলচালিত গাড়ি তিনি ব্যবহার করেছেন—অ্যাক্সিও, অ্যালিয়ন ও প্রিমিও। ঢাকায় তিনি ও তাঁর স্ত্রী একটি গাড়ি ব্যবহার করেন। চিকিৎসক স্ত্রী সপ্তাহে দুবার মানিকগঞ্জ যান। রাইসুল নিজেও মাঝেমধ্যে ঢাকার বাইরে যান।
রাইসুল বলেন, সব মিলিয়ে সর্বশেষ গাড়িটি চালাতে মাসে তাঁর জ্বালানি তেল কেনার পেছনে খরচ হতো ৪০ হাজার টাকা। এখন বৈদ্যুতিক গাড়িটি (প্রয়োজনে তেলেও চালানো যায়) চালাতে মাসে হাজার চারেক টাকা বাড়তি বিদ্যুৎ বিল আসে। আর তেল লাগে ২ হাজার টাকার মতো।
বৈদ্যুতিক গাড়িটি রাইসুল কিনেছেন রানার অটোমোবাইলস থেকে। চীনের বিওয়াইডি ব্র্যান্ডের গাড়িটির দাম প্রায় ৭০ লাখ টাকা। রানার অটোমোবাইলস তাঁর বাসার গ্যারেজে চার্জার বসিয়ে দিয়েছে। সঙ্গে দিয়েছে একটি বহনযোগ্য বা পোর্টেবল চার্জার। একবার পুরো চার্জ দিলে গাড়িটি ১০০ কিলোমিটার যায়।
ঢাকার বাইরে গেলে কীভাবে চার্জ দেন—জানতে চাইলে রাইসুল বলেন, ‘ধরেন চট্টগ্রাম যাচ্ছি। কুমিল্লায় তিনটি চার্জিং স্টেশন আছে। আধা ঘণ্টা লাগে চার্জ দিতে। গাড়ি চার্জে দিয়ে চা-কফি পান করি। তারপর রওনা দিই।’ তিনি বলেন, ‘গ্রামের বাড়িতে গেলে পোর্টেবল চার্জার দিয়ে চার্জ দিই। তাতে অবশ্য একটু বেশি সময় লাগে, ঘণ্টা তিনেক।’
এটা হলো বৈদ্যুতিক গাড়ি বা ইলেকট্রিক ভেহিকেলের (ইভি) একজন ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা। তাঁর মতো অনেকেই এখন বৈদ্যুতিক গাড়ি কিনছেন। তাতে রাস্তায় বৈদ্যুতিক গাড়ি বাড়ছে। সঙ্গে বাড়ছে চার্জিং স্টেশন।
ক্র্যাক প্লাটুন চার্জিং সলিউশন নামে একটি প্রতিষ্ঠান ব্যবসায়ীদের চাহিদার ভিত্তিতে চার্জিং স্টেশন স্থাপনের কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালন তানভীর শাহরিয়ার প্রথম আলোকে বলেন, তারা এ পর্যন্ত ৩২টি চার্জিং স্টেশন বসিয়েছে। তাদের বাইরে অন্য প্রতিষ্ঠান বসিয়েছে ৬টি। পাঁচ বছরের মধ্যে দেশে ৫ হাজারের মতো চার্জিং স্টেশন বসবে বলে তিনি ধারণা করছেন।
তানভীর শাহরিয়ার বলেন, ১ লিটার জ্বালানি তেলে একটি গাড়ি ৭ থেকে ১০ কিলোমিটার চলে। সর্বোচ্চ মাইলেজ (১ লিটারে কত কিলোমিটার চলে) ধরেও হিসাব করে দেখা যায়, প্রতি কিলোমিটারে খরচ ১৩ টাকা। বৈদ্যুতিক গাড়ি বাড়িতে চার্জ দিলে কিলোমিটারে খরচ পড়ে ২ টাকার আশপাশে। আর বাণিজ্যিক চার্জিং স্টেশনে খরচ সাড়ে ৩ থেকে ৪ টাকা।
এদিকে দেশে বৈদ্যুতিক গাড়ির কারখানাও হচ্ছে। নতুন বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা চলছে। শুধু গাড়ি বা সেডান কার ও স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিকেল (এসইউভি) নয়; দুই চাকার যান, তিন চাকার যান, বাস, ট্রাক ও ট্রাক্টর দেশে সংযোজন করে বাজারে ছাড়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সরকারও বৈদ্যুতিক যানবাহনকে উৎসাহ দিচ্ছে। ইতিমধ্যে শুল্কছাড় দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে দেশে বৈদ্যুতিক যানবাহনশিল্প উন্নয়নে নীতিমালা করছে শিল্প মন্ত্রণালয়। নাম ‘ইলেকট্রিক ভেহিকেল শিল্প উন্নয়ন’ নীতিমালা।
বৈদ্যুতিক গাড়ি কীভাবে এল
ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিকবিষয়ক প্রকৌশলীদের বৈশ্বিক সংগঠন আইইইইর ২০১২ সালের একটি সম্মেলনে সংগঠনটির সদস্য মাসিমো গুয়ার্নিয়েরি ‘ফিরে দেখা: বৈদ্যুতিক গাড়ি’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ তুলে ধরেন। এতে বলা হয়, ১৮২৭ সালে স্লোভাক-হাঙ্গেরীয় যাজক আনিওস জেডলিক (১৮০০-১৮৯৫) প্রথম একটি বৈদ্যুতিক মোটর তৈরি করেন। সেটি তিনি একটি ছোট গাড়ি চালানোর জন্য ব্যবহার করেছিলেন।
নিবন্ধ অনুযায়ী, ১৮৯৬ সালে বাইসাইকেল তৈরির শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান পোপ ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি আমেরিকার প্রথম ব্যবহারোপযোগী বৈদ্যুতিক গাড়ি বাজারে নিয়ে আসে। সঙ্গে আরও অনেকে বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদন শুরু করে।
১৯০০ থেকে ১৯১০ সাল ছিল বৈদ্যুতিক গাড়ির সুসময়। মাসিমো গুয়ার্নিয়েরির নিবন্ধ অনুযায়ী, তখন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ৪০ শতাংশ বাষ্পচালিত, ৩৮ শতাংশ বৈদ্যুতিক এবং ২২ শতাংশ ছিল জ্বালানিচালিত গাড়ির দখলে। বাষ্পচালিত ইঞ্জিনগুলো চালু করতেই ২৫ থেকে ৪৫ মিনিট সময় লাগত। বৈদ্যুতিক গাড়ি শুধু স্বল্প দূরত্বে চলাচল করতে পারত। কারণ, চার্জ ফুরিয়ে যেত। জ্বালানি তেলের গাড়িতে শব্দ বেশি এবং ধোয়া হতো। পরে যুক্তরাষ্ট্রে অনেকগুলো তেলের খনি আবিষ্কার হয় এবং তেলের দাম কমে যায়। একই সঙ্গে জ্বালানি তেলের গাড়ির ইঞ্জিনে বড় ধরনের উন্নতি আসে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে একের পর মহাসড়ক হতে থাকে। সব মিলিয়ে জনপ্রিয় হয় জ্বালানি তেলের গাড়ি। চার্জ ফুরিয়ে যাওয়ার দুর্বলতার কারণে ১৯২০ সালের পর বৈদ্যুতিক গাড়ি বাজার থেকে প্রায় হারিয়ে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের তথ্যপ্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্কের কোম্পানি টেসলা মোটরসের মাধ্যমে বৈদ্যুতিক গাড়ি আবার জনপ্রিয় হতে শুরু করে। ২০০৮ সালে টেসলা গ্রাহকদের বৈদ্যুতিক গাড়ি সরবরাহ শুরু করে। একই সময়ে বিশ্বের বড় বড় গাড়ি কোম্পানিগুলো বৈদ্যুতিক গাড়িতে বিনিয়োগ শুরু করতে বাধ্য হয়।
ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির (আইইএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বে ১ কোটি ৭০ লাখ বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রি হয়, যা আগের বছরের চেয়ে ২৫ শতাংশ বেশি। ওই বছর গাড়ির বাজারের ২০ শতাংশের বেশি ছিল বৈদ্যুতিক গাড়ির দখলে।
দূষণ ও জ্বালানি তেলনির্ভরতা কমাতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বৈদ্যুতিক গাড়ির জন্য নানা ধরনের নীতিসহায়তা ও ভর্তুকি দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের মধ্যে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের সংকট তৈরি হলে বৈদ্যুতিক গাড়ির চাহিদা আরও বেড়ে যায়।
বৈদ্যুতিক গাড়ির এই ফিরে আসার পেছনে বড় ভূমিকা ছিল লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারির। লিথিয়াম ব্যাটারি খুব হালকা হওয়ার পরও প্রচুর শক্তি ধরে রাখতে পারে। ফলে ছোট আকারের ব্যাটারি ব্যবহার করেও গাড়ি একবার চার্জে দূরের পথে চলার সক্ষমতা অর্জন করে। গাড়ি চালানোর খরচও কমে যায়।
বাংলাদেশে বৈদ্যুতিক গাড়ি
বাংলাদেশে ২০১৫ সালে বৈদ্যুতিক গাড়ি নিবন্ধন দেওয়া শুরু হয়। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) জানিয়েছে, শুরুর বছরগুলোয় নিবন্ধন খুব একটা হয়নি। সাম্প্রতিককালে বেশি হচ্ছে। সব মিলিয়ে গত ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত নিবন্ধিত হয়েছে ৬৬৯টি বৈদ্যুতিক যান।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে সম্পূর্ণ তৈরি বৈদ্যুতিক গাড়ি (সিবিউ) এসেছিল ৭৭টি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৭৮।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান লাইটক্যাসেল পার্টনার্স গত ডিসেম্বরে বাংলাদেশে বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজার নিয়ে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করে। তাতে উল্লেখ করা হয়, চার চাকার বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে চীনের বিওয়াইডি শীর্ষে রয়েছে। তারা প্রতি মাসে গড়ে ৫০টি করে প্রায় ৩০০টি গাড়ি বিক্রি করেছে এ পর্যন্ত। মার্সিডিজ-বেঞ্জ মাসে গড়ে ১২টি গাড়ি বিক্রি করছে। বিএমডব্লিউ এক্সিকিউটিভ মোটরসের মাধ্যমে একটি পূর্ণ বৈদ্যুতিক গাড়ির মডেল বিক্রি করে। তাদের বিক্রির সুনির্দিষ্ট তথ্য জানা যায়নি। দেশে প্রায় ২০টি টেসলা আমদানি করা হয়েছে, যার মধ্যে ১২টি বিক্রির খবর পাওয়া গেছে বলেও উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে।
বাজারে এখন ৩৫ লাখ টাকা দামের ছোট আকারের ব্যক্তিগত ব্যবহারের বৈদ্যুতিক গাড়ি পাওয়া যায়। বিওয়াইডির গাড়ির সর্বনিম্ন দাম ৪৮ লাখ টাকা। তবে তারা আজ রোববার ৪০ লাখ টাকার কমে একটি গাড়ি বাজারে ছাড়বে। গাড়ি বিক্রেতারা বলছেন, তেলচালিত নতুন গাড়ির দাম বৈদ্যুতিক গাড়ির দামের প্রায় সমান। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেশি। তবে পুরোনো বা রিকন্ডিশন গাড়ির দাম বৈদ্যুতিক গাড়ির চেয়ে কিছুটা কম।
দেশে ৫৫ লাখের বেশি অনিয়ন্ত্রিত তিন চাকার বৈদ্যুতিক যান রয়েছে। এসব যান অনুমোদনহীন বলে উল্লেখ করেছে লাইটক্যাসল পার্টনার্স। তাদের নিবন্ধে আরও বলা হয়, বাংলাদেশে দুই চাকার বৈদ্যুতিক যানের বাজার গত ছয়-সাত বছরে পাঁচ গুণ বেড়েছে। ২০২০ সালে বিআরটিএ ই-বাইক নিবন্ধন দেওয়া শুরু করে। এখন মাসে গড়ে ৫০টি ই-বাইক নিবন্ধন দেওয়া হয়।
দেশে ওয়ালটন, রানার, আকিজ মোটরস, এডিসন মোটরস ও কোয়াকির মতো দেশি-বিদেশি কোম্পানি দুই চাকার বৈদ্যুতিক যান বিক্রি করে। এর বাইরে যন্ত্রাংশ আমদানি করে অনেকেই ই-বাইক সংযোজন করে।
দেশে বৈদ্যুতিক যানের কারখানা
২০১৯ সালে নিজস্ব প্রযুক্তিতে বিদ্যুৎ ও সৌরবিদ্যুৎনির্ভর লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারিচালিত একটি অটোরিকশা তৈরি করেন বাঘ ইকো মোটরস লিমিটেডের চেয়ারম্যান কাজী জসিমুল ইসলাম। তবে এটির অনুমোদন পেতে ব্যাপক ভোগান্তি ও দীর্ঘসূত্রতার মধ্যে পড়তে হয় তাঁকে।
বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পর ২০২২ সালে অটোরিকশাটির অনুমোদন ও নিবন্ধন পাওয়া যায়। কিন্তু এরপরও সেই অটোরিকশা রাস্তায় নামাতে নানা প্রশাসনিক জটিলতায় পড়েছেন কাজী জসিমুল ইসলাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, অটোরিকশা বৈধভাবে রাস্তায় নামাতে হলে আঞ্চলিক পরিবহন কমিটির (আরটিসি) অনুমোদন নিতে হয়। এখন পর্যন্ত শুধু ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও ময়মনসিংহে অনুমোদন পাওয়া গেছে। দুই জেলায় ১০০টির মতো অটোরিকশা চলছে। তিনি বলেন, অনুমোদন–জটিলতার কারণে তাঁর কারখানা কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।
বাংলাদেশে বৈদ্যুতিক গাড়ি তৈরির কারখানা করেছে বাংলাদেশ অটো ইন্ডাস্ট্রিজ। এর অংশীদার চীনা প্রতিষ্ঠান ডংফেং মোটর গ্রুপ লিমিটেড। কারখানাটি চট্টগ্রামের মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে। সেখানে তারা জমি নিয়েছে ১০০ একর। বিনিয়োগ দাঁড়াবে ১ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ অটো ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান এ মান্নান খান বলেন, তাঁদের কারখানায় গ্যাস–সংযোগের পাইপলাইন বসানোর কাজ চলছে। আগামী জুনের মধ্যে কাজটি শেষ হবে। জুলাইয়ে তাঁরা গাড়ি উৎপাদনে যেতে পারবেন।
মান্নান খান আরও বলেন, তাঁরা এসইউভি, সেডান কার, ট্রাক, অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল উৎপাদন করবেন। বাস সংযোজনের পরিকল্পনাও রয়েছে। তাঁরা ৩০ লাখ টাকার আশপাশের দামে বৈদ্যুতিক গাড়ি বাজারে ছাড়তে পারবেন।
২০২৪ সালে বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রি শুরু করে চীনের সুপরিচিত গাড়ি নির্মাতা কোম্পানি বিওয়াইডি। তখন থেকে বিওয়াইডির পরিবেশক সিজি-রানার বাংলাদেশ লিমিটেড। এটি রানার গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান।
বাংলাদেশের বাজারে চীনের বিওয়াইডির বৈদ্যুতিক গাড়ি সরবরাহ ও উৎপাদন করবে রানার গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান রানার অটোমোবাইলস পিএলসি। এ জন্য বিওয়াইডি অটো ইন্ডাস্ট্রি কোম্পানির সঙ্গে একটি চুক্তি করেছে। এই খবর জানিয়ে গত ২০ মার্চ ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) ঘোষণা দিয়েছে রানার অটোমোবাইলস। কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ বিওয়াইডির সঙ্গে একটি ‘মাস্টার সাপ্লাই অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচার’ (প্রধান সরবরাহ ও উৎপাদন) চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি অনুমোদন দিয়েছে।
সরকারি নীতিসহায়তা
বিএনপি সরকার তার নির্বাচনী ইশতেহারে কার্বন নিঃসরণ ও জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানোর ওপর জোর দিয়েছে। গণপরিবহন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে একাধিক দফা বৈঠক করেছেন। গত ২ মার্চ এমন একটি বৈঠক থেকে বেরিয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক সাংবাদিকদের বলেন, প্রধানমন্ত্রী ১৮০ দিনের বৈদ্যুতিক বাসভিত্তিক গণপরিবহন ব্যবস্থা চালু করতে চান। শুরুটা হবে নারীদের জন্য বিশেষ বাস দিয়ে।
সামছুল হক বলেন, বৈদ্যুতিক বাস চালুর বিষয়টি তাঁর ভালো লেগেছে। দূষণ কমাতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এ বিষয়ে জোর দিচ্ছে। ১৫-২০ বছর পরে হয়তো ডিজেলচালিত বাসই আর উৎপাদিত হবে না।
এদিকে গত ৩০ এপ্রিল স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক বাস আমদানিতে সব ধরনের শুল্ক ও কর তুলে নিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এরপর ৩ মে মন্ত্রিসভার বৈঠকে অন্যান্য বৈদ্যুতিক বাসে শুধু মূল্য সংযোজন কর (মূসক/ভ্যাট) ১৫ শতাংশ বহাল রেখে সব শুল্ককর অব্যাহতি দেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ৫ টন বা তার বেশি ধারণক্ষমতাসম্পন্ন ট্রাকের ক্ষেত্রেও এ সুবিধা প্রযোজ্য হবে।
দেশে বৈদ্যুতিক গাড়িশিল্পকে উৎসাহিত করতে নীতিমালার খসড়া করেছে শিল্প মন্ত্রণালয়। তাতে বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানির ক্ষেত্রে আমদানি শুল্ক, নিবন্ধন ফি কমানো এবং এ ধরনের গাড়ি কেনায় ব্যাংকঋণের সীমা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
খসড়া নীতিমালায় বলা হয়, বৈদ্যুতিক গাড়ি সিবিউ অবস্থায় আমদানি শুল্ক ৮৯ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। এই শুল্ক কমিয়ে ৩৭ শতাংশ করার প্রস্তাব করা যেতে পারে। দেশে এ ধরনের গাড়ি সংযোজনের জন্য যন্ত্রাংশ আমদানির ক্ষেত্রে শুল্কহার ১৫ দশমিক ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি তৈরিতে শুল্কহার প্রস্তাব করা হয়েছে ২৬ দশমিক ২০ শতাংশ।
খসড়া নীতিমালায় আরও বলা হয়, নতুন বৈদ্যুতিক গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে ব্যাংক থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ পাওয়া যাবে, যার মেয়াদ হবে ৮ বছর। ২০৩০ সালের মধ্যে সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা সরকারি ও করপোরেট সংস্থাগুলোর জন্য কেনা গাড়ির ৩০ শতাংশ হবে বৈদ্যুতিক। ২০৩০ সাল পর্যন্ত বৈদ্যুতিক গাড়ির নিবন্ধন, ট্যাক্স টোকেন ও ফিটনেস সনদ দেওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রিম আয়কর (এআইটি) সম্পূর্ণ মওকুফ ও নিবন্ধন ফি ৫০ শতাংশ কমানোর প্রস্তাব রয়েছে খসড়া নীতিমালায়।
গাড়িশিল্পের কারখানা মালিকদের সমিতি বাংলাদেশ অটোমোবাইল অ্যাসেম্বেলার্স অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও রানার গ্রুপের চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান খান বলেন, তিনি দেশে বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদনের পক্ষে। এতে দেশে বিনিয়োগ বাড়বে, কর্মসংস্থান হবে। সরকারি নীতিমালা এমন হওয়া উচিত, যেখানে দেশে উৎপাদনকে উৎসাহ দেওয়া হবে। তাঁর মতে, নীতিসহায়তার মাধ্যমে দেশে সংযোজিত ও উৎপাদিত হলে বৈদ্যুতিক গাড়ির দাম নাগালের মধ্যে আসবে। আগামী পাঁচ বছর পর দেশে নতুন যত গাড়ি বিক্রি হবে, তার অর্ধেক হবে বৈদ্যুতিক গাড়ি।