সোমবার ১৮ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৪ঠা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

Advertise with us

ডিমের বাজার কেন অস্থির, দাম বাড়ালো কারা

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   সোমবার, ১৮ মে ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ২ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

ডিমের বাজার কেন অস্থির, দাম বাড়ালো কারা

বাজারে ফার্মের মুরগির ডিমের দাম আরও বেড়েছে। গত এক সপ্তাহে প্রতি ডজন ডিমের দাম বেড়েছে ২০ টাকা। আর এক মাসের মধ্যে ডজনে দাম বেড়েছে ৩০-৪০ টাকা। এ নিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ মানুষজন। ডিমের চড়া দামের কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের প্রোটিন ও সাধারণ পুষ্টির চাহিদা পূরণ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। মাছ ও মাংসের আকাশচুম্বী দামের কারণে সাধারণ মানুষ যে পুষ্টির ঘাটতি মেটাতে ডিমের ওপর নির্ভর করতেন, তা বেড়ে এখন ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে।

কেন বাড়লো

ব্যবসায়ীরা বলছেন, উৎপাদন হ্রাস ও সরবরাহ ঘাটতি এবং বাজারে উচ্চ চাহিদার কারণে ডিমের দাম বেড়েছে। এক মাসের ব্যবধানে ডজনে বেড়েছে ৩০-৪০ টাকা। বেশি দামে কেনায় বেশি দামে বিক্রি করতে হয়।

রাজধানীর বাজারে ফার্মের মুরগির লাল ডিমের ডজন ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর পাইকারিতে ১৪৫ টাকায় ডজন কিনছেন বলে জানিয়েছেন একাধিক ব্যবসায়ী।

খামারিরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে ডিমের কম দাম থাকায় অনেক লেয়ার খামারি লোকসানের মুখে পড়েছেন। ফলে পোলট্রি খাতের অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা খামার বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন। বিভিন্ন অঞ্চলে মুরগির রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ায় অন্তত ২০ শতাংশ খামার বন্ধ হয়ে গেছে। যা সরাসরি ডিমের উৎপাদনে বড় প্রভাব ফেলেছে। আবার বাজারে মাছ, ব্রয়লার মুরগি ও গরুর মাংসের দাম অনেক চড়া। নিম্ন আয়ের মানুষ প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে ডিমের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। ফলে চাহিদা হঠাৎ অনেকটাই বেড়ে গেছে। এটিও দাম বাড়ার আরেকটি কারণ। সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে খামার থেকে বাজারে ডিম নিয়ে আসার পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে। এটিও দাম বাড়ার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একাধিক ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টির কারণে ডিমের নিয়মিত সরবরাহে সাময়িক ব্যাঘাত ঘটেছে, যা পাইকারি বাজারে দামের ওপর চাপ তৈরি করেছে। সরবরাহ কমে যাওয়ার বিপরীতে উচ্চ চাহিদা তৈরি হওয়ায় খুচরা ও পাইকারি উভয় বাজারে ডিমের দাম বাড়ানো হয়েছে।

চট্টগ্রামে ডজনে বেড়েছে ৪০ টাকা

চট্টগ্রামে এক মাসের ব্যবধানে ডিমের দাম বেড়েছে ডজন প্রতি ৪০ টাকা। এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে এক ডজন বিক্রি হতো ১১০ টাকা, বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকা।

নগরের বহদ্দারহাট কাঁচা বাজারের ডিমের আড়তদার মারুফ হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত এপ্রিল মাসে প্রতি ডজন ডিম পাইকারিতে বিক্রি করেছি ১০০ টাকায়। বর্তমানে ১৪০ টাকায় বিক্রি করছি। এর মধ্যে গত তিন-চার দিনের ব্যবধানে ডজনে ২০-২৫ টাকা বেড়েছে। আগে ৯০-৯৫ টাকায় ডজন কিনে ১০০ টাকায় বিক্রি করতাম। এখন ১৩০-৩৫ টাকায় কিনে ১৪০ টাকায় বিক্রি করছি। বেশি দামে কিনে বেশি দামে বিক্রি করছি।’

রাউজান উপজেলার ভাই ভাই পোলট্রি খামারের মালিক লাভু বড়ুয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বর্তমানে লেয়ার মুরগির একদিনের বাচ্চা বিক্রি হচ্ছে ৪৫-৫০ টাকা। প্রতি বস্তা খাদ্য দুই হাজার ৮৫০ টাকা থেকে তিন হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। সেইসঙ্গে ওষুধপত্রসহ আছে পরিচর্যা। যে কারণে কম টাকায় ডিম বিক্রি করতে পারছি না। আগে ৯০ টাকায় ডজন বিক্রি করলেও এখন ১২০ টাকায় বিক্রি করছি আমরা।’

রাজশাহীতে প্রতি পিসে দুই-তিন টাকা বাড়িয়েছেন খামারিরা

রাজশাহীর পবা উপজেলার মড়িয়া গ্রামের পোলট্রি খামারি হামিম আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে, ‘খামার থেকে আজ সাদা ডিমের পিস ৯ টাকা ৪০ পয়সা এবং লাল ডিম ১০ টাকা ৬০ পয়সা বিক্রি করেছি। এক মাস আগে সাদা ডিমের পিস ৭ টাকা ৪০ পয়সা এবং লাল ৯ টাকায় বিক্রি করেছি। প্রতি পিসে ২ টাকা বাড়িয়েছি।’

ডিমের দাম বাড়ানোর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘মুরগির খাদ্য, ওষুধ, ব্যাংকের সুদ, জ্বালানি তেলসহ বিভিন্ন জিনিসের দাম বেড়েছে। এ ছাড়া গত তিন মাসে অনেকগুলো মুরগি মারা গেছে। এতে ব্যাপক লোকসান হয়েছে। ওই সময় কেউ খবর নেয়নি, আর এখন ডিমের দাম একটু বাড়ায় চারদিকে হইচই পড়ে গেছে। লোকসান দিতে দিতে এমন অবস্থা হয়ে গিয়েছিল যে, নিজের ছেলের স্কুলড্রেসটা কিনতে পারিনি।’

বাঘা উপজেলার গড়গড়ি ইউনিয়নের খায়েরহাট গ্রামের পোলট্রি খামারি বাবুল ইসলাম বলেন, ‘লাল ডিমের পিস ১০ টাকা ৬০ পয়সা বিক্রি করছি। এক মাস আগে একই ডিম ৭ টাকা ২০ পয়সা বিক্রি করেছিলাম।’

কেন ডিমের দাম বাড়িয়েছেন এমন প্রশ্নের জবাবে বাবুল ইসলাম বলেন, ‘মুরগির খাদ্য, ওষুধসহ অন্যান্য জিনিসের দাম বাড়ায় আমাদেরও বাড়াতে হয়েছে। আবার যারা আমাদের কাছ থেকে কিনে নিয়ে যান তাদের একটা সিন্ডিকেট আছে। আমরা কম দামে বিক্রি করলেও তারা সিন্ডিকেট করে বেশি দামে বিক্রি করে।’

বাবুল ইসলাম জানান, সাত-আট বছর আগে এক বস্তা মুরগির খাবার ১৪০০ থেকে ১৪৫০ টাকায় কিনেছিলাম। বর্তমানে ২৪০০ টাকায় কিনতে হয়। দুই-তিন বছর আগে একটা ওষুধ ২৫০ টাকায় কিনেছিলাম। সেটা এখন সাড়ে ৬০০ টাকায় কিনতে হয়। আগে এক হাজার মুরগির খাঁচা তৈরি করতে খরচ হতো ১ লাখ ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা। তা এখন তৈরি করতে ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে।

ময়মনসিংহে ১০০ ডিমের দাম বেড়েছে ৩২০ টাকা

ময়মনসিংহে এক মাসের ব্যবধানে ১০০ ডিমের দাম বেড়েছে ৩২০ টাকার মতো। এক মাস আগে যেখানে ১০০ ডিম বিক্রি হয়েছিল ৮০০ টাকা, এখন ১ হাজার ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বার্ডফ্লু রোগে আক্রান্ত হয়ে ব্যাপক হারে মুরগি মরে যাওয়ায় উৎপাদন কমে যাওয়ায় দাম বেড়েছে বলে জানালেন খামারিরা।

সদরের কাতলাসেন এলাকার খামারি লোকমান হোসেন বলেন, ‘এপ্রিলের মাঝামাঝিতে ১০০ ডিম ৮০০ টাকায় বিক্রি করেছি। তখন উৎপাদন বেশি থাকায় লোকসানে বিক্রি করতে হয়েছি। এরপর বার্ড ফ্লুতে আক্রান্ত হয়ে বেশিরভাগ মুরগি মরে গেছে। এ কারণে উৎপাদন কমে গেছে ডিমের। সেজন্য দাম বেড়েছে।’

একই এলাকার খামারি কামাল হোসেন বলেন, ‘ডিমের উৎপাদন একদিকে কমে গেছে অন্যদিকে বর্তমান বাজারে সবজি ও মাছের চড়া দামের কারণে ডিমের চাহিদা বেড়েছে। এ কারণেও দাম বেড়েছে। তবে বিদ্যুৎ না থাকায় এবং বার্ডফ্লু রোগের কারণে অনেক মুরগি মরে যাওয়ায় খামারিরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।’

ডিমের পাইকারি ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত এক মাস ধরে ধাপে ধাপে ডিমের দাম বেড়েছে। বর্তমানে চাহিদা বেশি থাকায় খামারিরা আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন। তারা বেশি মুনাফা নিচ্ছেন। আমাদের লাভ সীমিত। ডজনে ৫ টাকা লাভ হয় আমাদের।’

কুমিল্লায় পিসে বেড়েছে ৩ টাকা

কুমিল্লার কংসনগর এলাকার খামারি মো. রেজাউল করিম বলেন, ‘রমজানে ডিমের দাম কম ছিল। এর মধ্যে মুরগির খাদ্যের দাম বেড়েছে। পরিবহন খরচ বেড়েছে, শ্রমিক খরচও বেড়েছে। গরমে ডিমের উৎপাদন কম তাই খরচ মেটাতে বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে। আমরা ১০ টাকা ৮০ পয়সায় বিক্রি করছি পিস। যা আগে ৮ টাকায় বিক্রি করতাম। এখন বেশি দামে বিক্রি করছি। তবে কিছুদিনের মধ্যে দাম কমবে আশা করা যায়।’

নারায়ণগঞ্জে বেড়েছে ৩-৪ টাকা

নারায়ণগঞ্জ রূপগঞ্জের তানভীর পোলট্রি ফার্মের মালিক তানভীর হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‌‘আমার খামারে ২৪০০ লেয়ার মুরগি থেকে ১৮০০ ডিম উৎপাদন হয়। আগের তুলনায় ২০-২৫ শতাংশ উৎপাদন কমেছে। অথচ আগে ২২০০-এর মতো ডিম উৎপাদন হতো। এখন চাহিদাও বেড়েছে। এজন্য দাম বেড়েছে। এখন ১০ টাকা দরে প্রতি পিস বিক্রি করিছি, যা আগে ছিল সাড়ে ৭ থেকে ৮ টাকা।’

দাম বাড়ানোর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘গরমের কারণে উৎপাদন কমেছে। এ ছাড়া মুরগির খাবারের দাম বেড়েছে। আবার নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে অনেক মুরগি মারা গেছে। এসব কারণে দাম বাড়াতে হয়েছে।’

খুলনার ফারজানা পোলট্রি খামারির মালিক আবদুল মান্নান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‌‘৫০ কেজির এক বস্তা মুরগির খাবারে ১২৫ টাকা বেড়েছে। গত এক মাসে অনেক মুরগি মারা গেছে গরমে। কারণ বিদ্যুৎ থাকে না। ফলে ডিমের দাম বেড়েছে এক সপ্তাহ হলো। আগে ছয় মাস আমরা লোকসান দিয়ে ডিম বিক্রি করেছি। তখন তো এত শোরগোল হয়নি। যখন আমরা লোকসান কমাতে দাম বাড়ালাম তখন শোরগোল শুরু হলো। খামার থেকে সাদা ডিম সাড়ে ১০ টাকা ও লাল ডিম সোয়া ১১ টাকা পিস দরে পাইকারি বিক্রি করছি।’

গাজীপুরে প্রতি পিসে বেড়েছে ৩ টাকা

গাজীপুরের পোলট্রি খামারি জুলফিকার আলী ভুট্টু বলেন, ‘বর্তমানে লাল ডিমের হালি ৪৩ টাকা ৬০ পয়সা এবিং সাদা ডিম ৪১ টাকা ৩০ পয়সায় বিক্রি করছি। এক মাস আগে লাল ডিমের হালি ২৯ টাকা এবং সাদা ২৫ টাকায় বিক্রি করেছি।’

ডিমের দাম বাড়ানোর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘শীত মৌসুম এবং বাজারে শাকসবজি ছিল, এজন্য বাজারে চাহিদাও কম ছিল। এখন গরমকালে বাজারে আগের মতো শাকসবজি নেই। তাই ডিমের দাম বাড়তি। ডিমের দাম বাড়ার আরেকটি কারণ হলো গরমে ডিমের উৎপাদন কম।’

Facebook Comments Box
Advertise with us
Advertise with us
Advertise with us

ফলো করুন দেশবার্তা-এর খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক
মো: সামসুদ্দীন চৌধুরী
সম্পাদকীয় কার্যালয়