
নিজস্ব প্রতিবেদক | বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬ | প্রিন্ট | ৩ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) খাতে প্রায় ২৪৫ কোটি টাকার বিদেশি বিনিয়োগ আনতে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের এমক্যাশ সেবায় ৪৯ শতাংশ শেয়ার হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত ঘিরে আর্থিক খাতে নানা প্রশ্ন ও আলোচনা শুরু হয়েছে। বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের বয়স, একই নামে নতুন কোম্পানি নিবন্ধন, বোর্ড সভা এগিয়ে এনে অনুমোদন দেওয়া এবং বিনিয়োগের উৎস সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য না থাকায় পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
ইসলামী ব্যাংক এটিকে কৌশলগত বিদেশি বিনিয়োগ হিসেবে দেখালেও, বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে নতুন করে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কি না–তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইসলামী ব্যাংকের মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস এমক্যাশে প্রায় ২৪৪ কোটি ৯৫ লাখ টাকার বিদেশি মুদ্রা বিনিয়োগ করবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান বি১০০ হোল্ডিংস এলএলসি। এই বিনিয়োগের বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটি এমক্যাশের সর্বোচ্চ ৪৮ দশমিক ৯৯ শতাংশ শেয়ার পাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস কোম্পানিতে কমপক্ষে ৫১ শতাংশ মালিকানা একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের হাতে থাকতে হয়। সেই নিয়ম মেনেই এমক্যাশে সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানা ধরে রাখবে ইসলামী ব্যাংক। নতুন এই বিনিয়োগের ফলে এমক্যাশের পরিশোধিত মূলধন বেড়ে ৫০০ কোটি টাকায় উন্নীত হবে বলে জানিয়েছে ব্যাংকটি। তবে এই বিনিয়োগ প্রক্রিয়া ঘিরে কয়েকটি বিষয় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এমক্যাশের প্রায় ৪৯ শতাংশ শেয়ার যে প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হচ্ছে–বি১০০ হোল্ডিংস এলএলসি–তা তুলনামূলক নতুন একটি কোম্পানি। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির বয়স মাত্র দুই মাস ১৮ দিন। একটি নতুন প্রতিষ্ঠানের কাছে দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল আর্থিক প্ল্যাটফর্মের প্রায় অর্ধেক মালিকানা দেওয়ার সিদ্ধান্ত কতটা যৌক্তিক–তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে একই সময়ে B100 M-Cash SPV নামে আরেকটি কোম্পানি নিবন্ধিত হয়েছে, যেখানে সরাসরি এমক্যাশের নাম ব্যবহার করা হয়েছে। এই কোম্পানিটি নিবন্ধিত হয়েছে মাত্র ১৭ দিন আগে। কিন্তু এমক্যাশের শেয়ার হস্তান্তরের চুক্তি করা হয়েছে বি১০০ হোল্ডিংসের সঙ্গে, ওই নতুন কোম্পানিটির সঙ্গে নয়। কেন এই দুই কোম্পানির মধ্যে আলাদা কাঠামো রাখা হয়েছে–তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, বি১০০ হোল্ডিংস এলএলসি এবং বি১০০ এম-ক্যাশ এসপিভি–দুটি প্রতিষ্ঠানের ঠিকানাও একই স্থানে। এতে পুরো বিনিয়োগ কাঠামোটি পূর্বপরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হয়েছে কি না–সেই প্রশ্নও উঠছে।
বোর্ড সভা নিয়েও তৈরি হয়েছে নতুন আলোচনা। ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভা ১০ মার্চ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও সেটি এগিয়ে এনে ৮ মার্চ করা হয় এবং ওই সভাতেই এমক্যাশে বিদেশি বিনিয়োগের অনুমোদন দেওয়া হয়। এত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কেন নির্ধারিত সময়ের আগেই নেওয়া হলো–এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা। অনলাইন তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, কোম্পানিটির কর্মী সংখ্যা ১১ থেকে ৫০ জনের মধ্যে এবং পেশাদার নেটওয়ার্ক লিংকডইনে তাদের অনুসারীর সংখ্যাও খুবই কম। ফলে প্রায় ২৫০ কোটি টাকার বিনিয়োগের আর্থিক সক্ষমতা ও উৎস নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘‘এমক্যাশ ইসলামী ব্যাংকের একটি সেবা, যেমন ডাচ-বাংলা ব্যাংকের ‘রকেট’ রয়েছে। এটি বিকাশ বা নগদের মতো আলাদা সহযোগী প্রতিষ্ঠান নয়।’
তিনি বলেন, ‘শেয়ারবাজারের মাধ্যমে আমরা জেনেছি তারা বিদেশি বিনিয়োগ আনার ঘোষণা দিয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে কোনো অনুমোদন চাওয়া হয়নি। বিদেশি বিনিয়োগ আনতে হলে অবশ্যই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন প্রয়োজন। যদি তারা আমাদের কাছে আবেদন করে, তাহলে আমরা সংশ্লিষ্ট শেয়ারহোল্ডারদের তথ্য এবং বিনিয়োগের উৎস যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেব।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, এমক্যাশ একটি গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল আর্থিক সেবা প্ল্যাটফর্ম হওয়ায় এখানে বড় ধরনের শেয়ার হস্তান্তরের আগে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মালিকানা (Beneficial Ownership), অর্থের উৎস এবং আর্থিক সক্ষমতা যাচাই করা জরুরি।
এই প্রেক্ষাপটে আর্থিক খাত সংশ্লিষ্টদের অনেকেই মনে করছেন, বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বিস্তারিত তদন্ত ও যাচাই-বাছাই প্রয়োজন। কারণ এটি কেবল একটি কোম্পানির বিনিয়োগ নয়, বরং দেশের ডিজিটাল আর্থিক সেবা খাতের স্বচ্ছতা ও জনআস্থার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। সূত্র খবেরর কাগজ
দ.ব.ম



