
নিজস্ব প্রতিবেদক | সোমবার, ০১ জুন ২০২৬ | প্রিন্ট | ৯ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

বিহারের সিওয়ান জেলায় এক ২৪-২৫ বছর বয়সী মুসলিম যুবককে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করার নৃশংস অভিযোগ উঠেছে। নিহত যুবকের নাম শাহজাদ আলী, তিনি পেশায় একজন বাবুর্চি ছিলেন। এই ঘটনায় পুরো এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ও শোকের ছায়া নেমে এসেছে। মাত্র আড়াই মাস আগেই শাহজাদের বড় ভাই নওশাদ আলীর লাশ একটি গাছ থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছিল। পরিবারের দাবি, দুই ভাইকেই পরিকল্পিতভাবে খুন করা হয়েছে।
ঘটনাটি ঘটেছে গত ৩০ মে বারহারিয়া থানার অন্তর্গত শিবরাজপুর গ্রামে। শাহজাদের স্ত্রী মবিনা খাতুন জানান, ঘটনার দিন একদল লোক তাঁদের বাড়িতে এসে শাহজাদকে বাইরে ডেকে নিয়ে যায়। এরপর দীর্ঘ সময় পার হলেও তিনি বাড়ি না ফেরায় পরিবারের লোকজন খোঁজখবর শুরু করেন। কয়েক ঘণ্টা পর তাঁরা জানতে পারেন যে শাহজাদকে নির্মমভাবে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে।
পুলিশের কাছে দেওয়া লিখিত অভিযোগে মবিনা খাতুন দাবি করেছেন, অভিযুক্তরা শাহজাদকে একটি গাছের সঙ্গে বেঁধে লাঠি, লাথি ও ঘুষি মেরে নির্মমভাবে নির্যাতন করে। এই অমানবিক অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। শুধু তাই নয়, মৃত্যুর আগে শাহজাদের কাছে থাকা নগদ প্রায় ৫,০০০ টাকাও ছিনিয়ে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
এই ঘটনায় শিবরাজপুর গ্রামের বাসিন্দা অমিত চৌধুরী, প্রমেন্দ্র মাঞ্জি, ছত্তু মাঞ্জি, অবধ কিশোর চৌধুরীসহ মোট আটজনের নাম উল্লেখ করে থানায় এফআইআর দায়ের করা হয়েছে।
পরিবারের এক আত্মীয় মোহাম্মদ মিঠু শাহ জানিয়েছেন, শাহজাদ ও তাঁর পরিবার বিভিন্ন বিয়ে বা সামাজিক অনুষ্ঠানে রান্নার কাজ করতেন। কয়েক মাস আগে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি একটি অনুষ্ঠানের জন্য শাহজাদকে বুক করতে চেয়েছিল। কিন্তু অন্য ব্যস্ততার কারণে শাহজাদ সেই কাজ করতে রাজি হননি।
পরিবারের দাবি, এই সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করেই ক্ষোভের সূত্রপাত। মিঠু শাহ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “রান্না করা ওদের পেশা। ওরা কোথায় কাজ করবে, সেটা সম্পূর্ণ ওদের নিজেদের সিদ্ধান্ত। কাজ করতে রাজি না হওয়ার জন্য কাউকে এভাবে পিটিয়ে মেরে ফেলা যায়?”
এই ট্র্যাজেডি শাহজাদের পরিবারের জন্য পাহাড়সম কষ্ট নিয়ে এসেছে। প্রায় আড়াই মাস আগে শাহজাদের বড় ভাই নওশাদ আলীর রহস্যজনক মৃত্যু হয়। তাঁকে একটি গাছে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল। তখনো পরিবারের পক্ষ থেকে হত্যার অভিযোগ তোলা হলেও কোনো সুরাহা হয়নি।
এখন দুই উপার্জনক্ষম ভাইকে হারিয়ে সম্পূর্ণ দিশেহারা দুটি পরিবার। শাহজাদের চার সন্তান এবং নওশাদের আট সন্তান রয়েছে। ১২টি ছোট ছোট শিশু এবং দুই বিধবা স্ত্রীকে নিয়ে এখন অথৈ সাগরে পড়েছেন শাহজাদের বৃদ্ধ বাবা কায়ামুদ্দিন শাহ। কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি বলেন, “আমার দুই ছেলেকেই ওরা মেরে ফেলল। এখন এই ছোট ছোট বাচ্চাদের কে দেখবে? আমরা পুলিশের কাছে গেলে ওরা আমাদেরই থানা থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেয়।”
এলাকাবাসীর সূত্রে জানা গেছে, শাহজাদের লাশ দাফন করার সময় স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ আশ্বাস দিয়েছিল যে দুই দিনের মধ্যে সমস্ত আসামিকে গ্রেফতার করা হবে। কিন্তু নির্দিষ্ট সময় পার হয়ে গেলেও এখনো পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি।
পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দারা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, আগামী ১০ তারিখের মধ্যে যদি সমস্ত অভিযুক্তকে আইনের আওতায় আনা না হয়, তবে পুরো এলাকা নিয়ে থানা ঘেরাও এবং তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য সরকারের কাছে ৫০ লাখ রুপি ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়েছে নিহতের স্বজনরা।
স্থানীয় সূত্রে ঘটনার পেছনে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার দিকে ইঙ্গিত করা হলেও, পুলিশের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সাম্প্রদায়িক কোণ থাকার কথা নিশ্চিত করা হয়নি। এলাকায় শান্তি বজায় রাখতে পুলিশি নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
