
নিজস্ব প্রতিবেদক | সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬ | প্রিন্ট | ১৪ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজপথে রক্ত ঝরানো একাধিক ঘটনার বিচার এখন শেষ ধাপে। এর মধ্যে মানবতাবিরোধী অপরাধের তিনটি আলোচিত মামলা রয়েছে চূড়ান্ত পর্যায়ে। এর মধ্যে দুটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রেখেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। আরেকটি পৌঁছেছে যুক্তিতর্কে। নিষ্পত্তির দ্বারপ্রান্তে থাকা এসব মামলার রায় চলতি মাসেই ঘোষণা হতে পারে বলে আশা করছে প্রসিকিউশন।
ট্রাইব্যুনাল সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত বেশ কয়েকটি মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বিচারকাজ চলছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ও ২-এ। এর মধ্যে কুষ্টিয়ায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ড নিয়ে করা দুটি মামলা রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রেখেছেন ট্রাইব্যুনাল-২। এর একটিতে একমাত্র আসামি জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনু। অন্যটিতে আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফসহ চারজন।
এছাড়া রাজধানীর রামপুরায় নির্মাণাধীন ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা এক তরুণকে গুলি করাসহ দুজনকে হত্যার ঘটনায় করা মামলাটি রয়েছে যুক্তিতর্কের পর্যায়ে। যদিও এ মামলার রায়ের জন্য দিন ধার্য ছিল চলতি বছরের ৪ মার্চ। তবে প্রসিকিউশন থেকে নতুন করে ডিজিটাল অ্যাভিডেন্স জমা দেওয়ায় পুনরায় শুরু হয় কিছু সাক্ষ্যকার্যক্রম।
সিএভি ইনু-হানিফের মামলা
প্রসিকিউশনের তথ্যমতে, হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে জুলাই-আগস্ট আন্দোলন দমনে উসকানি, প্ররোচনা, ষড়যন্ত্রসহ সুনির্দিষ্ট আটটি অভিযোগ আনা হয়। তার সরাসরি নির্দেশে কুষ্টিয়ায় প্রাণ হারিয়েছেন ছয়জন। এসব অভিযোগ প্রমাণে জাসদের এই সভাপতির বিরুদ্ধে তদন্ত কর্মকর্তাসহ সাক্ষ্য দিয়েছেন ১০ জন। দীর্ঘ সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন সম্পন্ন করে রাষ্ট্রপক্ষ-আসামিপক্ষ। গত ১৪ মে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল। এছাড়া ১০ জুন হানিফসহ চারজনের বিরুদ্ধে হওয়া মামলার জন্যও একই নির্দেশনা দেন ট্রাইব্যুনাল-২।
এ মামলায় হানিফ ছাড়া অন্য আসামিরা হলেন- কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সদর উদ্দিন খান, সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী ও শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান আতা। চারজনই বর্তমানে পলাতক। তাদের হয়ে আইনি লড়াই করেন সরকারি খরচে নিয়োগ পাওয়া আইনজীবী আমির হোসেন।
কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যা ছাড়াও এই চারজনের বিরুদ্ধে উসকানি-প্ররোচনাসহ তিনটি অভিযোগ আনা হয়। আর এসব প্রমাণে তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ১৯ জন সাক্ষীকে হাজির করে রাষ্ট্রপক্ষ। সাক্ষ্যগ্রহণের এ ধাপ শেষ হলে গত ৭ জুন চার আসামিরই সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়ে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন সম্পন্ন করে প্রসিকিউশন। এরপর পলাতক আসামিদের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন স্টেট ডিফেন্স আইনজীবী। যুক্তিতর্কে নিজের মক্কেলদের নির্দোষ দাবি করা হয়।
কুষ্টিয়ায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় প্রাণ হারানো ছয়জন হলেন, শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী ও চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ।
পুনরায় শেষ ধাপে রামপুরা মামলা
রামপুরায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তৎকালীন কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ পাঁচজনকে আসামি করেছে প্রসিকিউশন। এর মধ্যে গ্রেপ্তার রয়েছেন রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকার। হাবিবুর ছাড়া পলাতক অন্যরা হলেন- খিলগাঁও জোনের সাবেক এডিসি মো. রাশেদুল ইসলাম, রামপুরা থানার সাবেক ওসি মো. মশিউর রহমান ও রামপুরা থানার সাবেক এসআই তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়া।
এ মামলায় গত ১০ জুন পুনরায় সাফাই সাক্ষ্য দেন এএসআই চঞ্চল। এদিনের জবানবন্দিতে বেশ কিছু অভিযোগ আনেন ট্রাইব্যুনাল-১ এর সামনে। ভয়ভীতি দেখিয়ে স্বীকারোক্তি নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। এমনকি প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহার বিরুদ্ধে প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগও আনা হয়।
পুলিশের এই এএসআইয়ের পক্ষে আইনি লড়াই করা আইনজীবী সারওয়ার জাহান নিপ্পনও নিজের মক্কেলকে নির্দোষ হিসেবে দাবি করেন। ভুক্তভোগী তরুণ আমির হোসেনকে নিচ থেকে গুলি করা হয়েছে বলেও যুক্তি তুলে ধরেন এই আইনজীবী। এ নিয়ে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞের মতামত চেয়ে ট্রাইব্যুনালে একটি আবেদনও জমা দিয়েছেন তিনি। সর্বশেষ ১১ জুন আসামিপক্ষে আরেকজনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে যুক্তিতর্কের জন্য দিন ঠিক করেছেন ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেল। যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হলেই মামলাটি রায়ের দিন নির্ধারণ করা হবে।
তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রামপুরার বনশ্রী-মেরাদিয়া সড়কের পাশে থাকা একটি নির্মাণাধীন ভবনে পুলিশের গুলিতে আহত হন আমির হোসেন। একই দিন বনশ্রী এলাকায় নাদিম ও মায়া ইসলাম নামের আরও দুজন মারা যান। এ ঘটনায় চঞ্চলসহ পুলিশের পাঁচ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে।
ট্রাইব্যুনাল সংশ্লিষ্টদের মতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত বিচারাধীন মামলাগুলোর মধ্যে এ তিনটি সবচেয়ে অগ্রসর পর্যায়ে রয়েছে। ফলে এসব মামলার রায় ঘোষণা এলে ট্রাইব্যুনালের বিচারিক কার্যক্রমে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।
এ প্রসঙ্গে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, ট্রাইব্যনালে বর্তমানে তিনটি আলোচিত মামলার বিচারকাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। অর্থাৎ এসব মামলার রায় ঘোষণা চলতি মাসেই আসতে পারে বলে আমরা আশা করছি।
তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনালে জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু এবং আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফদের বিরুদ্ধে আলাদা দুটি মামলা হয়েছিল। দুটি মামলাতেই আমরা সাক্ষ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করেছি। দুজনেরই কুষ্টিয়ায় সংঘটিত হত্যাযজ্ঞে সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। তাদের দিকনির্দেশনা পেয়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট নেতাকর্মীরা তৎকালীন পুলিশের সহযোগিতায় কুষ্টিয়ায় হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছেন। এতে ছয়জন নিরিহ মানুষ নিহতসহ অসংখ্য লোকজন আহত হন। তাদের বিরুদ্ধে প্রত্যেকটি চার্জে (অভিযোগ) সাক্ষীরা যেসব সাক্ষ্য দিয়েছেন, সেসব সন্দেহাতীতভাবে আমরা প্রমাণ করতে পেরেছি। একইসঙ্গে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেছি।
রামপুরার মামলা প্রসঙ্গে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, এ মামলার অন্যতম আসামি চঞ্চল চন্দ্র সরকার নিজেই গুলি করার দায় স্বীকার করেছেন। এমন একটি ভিডিও বক্তব্য আমরা আদালতে দাখিল করেছি। ফরেনসিক প্রতিবেদন অনুযায়ী ভিডিওটি এডিটেড বা এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) দিয়ে তৈরি নয়। এটা চঞ্চলেরই বক্তব্য ছিল। নিজের পক্ষে দেওয়া সাক্ষ্যেও পরোক্ষভাবে স্বীকার করেছেন যে, তিনি এরকম কথোপকথন করেছিলেন। সবকিছু মিলিয়ে এ মামলাটিও সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। অতএব এই তিনটি রায় চলতি মাসের মধ্যে ঘোষণা হবে বলে আমাদের প্রত্যাশা।
