
নিজস্ব প্রতিবেদক | রবিবার, ০৫ জুলাই ২০২৬ | প্রিন্ট | ২১ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

২০২১ সালের ৪ আগস্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার নারায়ণপুরে একসঙ্গে ১৭ জনের প্রাণহানির মর্মান্তিক ঘটনা নাড়িয়ে দিয়েছিল পুরো দেশকে। সেই ঘটনার পর বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতে কোটি টাকা ব্যয়ে জেলার পাঁচ উপজেলায় স্থাপন করা হয় ১৬টি বজ্রনিরোধক দণ্ড। কিন্তু কয়েক বছর না পেরোতেই অধিকাংশ দণ্ডই অকার্যকর হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে আকাশে মেঘ জমলেই আবারও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন কৃষকসহ সাধারণ মানুষ। ফলে কোটি টাকার এই সরকারি প্রকল্প আদৌ কতটা কার্যকর হয়েছে তা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন।
সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় গিয়ে দেখা গেছে, বেশ কয়েকটি বজ্রনিরোধক দণ্ডে মরিচা ধরেছে, কোথাও যন্ত্রাংশ নষ্ট, আবার কোথাও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের কোনো চিহ্ন নেই।
স্থানীয়দের অভিযোগ, স্থাপনের পর বেশির ভাগ দণ্ডের আর কোনো তদারকি হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা বললেও কার্যকর উদ্যোগের অভাবে কোটি টাকার এই প্রকল্পের সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।
কীভাবে কাজ করে বজ্রনিরোধক দণ্ড
সংশ্লিষ্টরা জানান, সাধারণত ভবন বা স্থাপনার সবচেয়ে উঁচু স্থানে এই দণ্ড বসানো হয়। মেঘ ও মাটির মধ্যে উচ্চমাত্রার বৈদ্যুতিক বিভব সৃষ্টি হলে দণ্ডটির সূক্ষ্ম ও ধারালো প্রান্ত আশপাশের বাতাসকে আয়োনাইজ করে বজ্রপাতের জন্য একটি নিরাপদ পথ তৈরি করে। বজ্রপাত ঘটলে দণ্ডটি সেই বিপুল বিদ্যুৎশক্তি নিজের মাধ্যমে গ্রহণ করে মাটিতে প্রবাহিত করে। সাধারণত অ্যালুমিনিয়াম বা তামার মতো উচ্চমানের বিদ্যুৎ পরিবাহী ধাতু দিয়ে তৈরি এ দণ্ডের সঙ্গে মোটা তামার তার বা ক্যাবল সংযুক্ত থাকে, যা বিদ্যুৎকে নিরাপদে মাটির গভীরে পৌঁছে দেয়। ফলে ভবন, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম এবং মানুষের প্রাণহানির ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। তবে চাঁপাইনবাবগঞ্জে বসানো বজ্রনিরোধক দণ্ডগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন আছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় বজ্রপাতের প্রবণতা ও মৃত্যুহার বিবেচনায় সরকার ২০১৫ সালে বজ্রপাতকে ‘দুর্যোগ’ ঘোষণা করে। সে জন্য ২০২১-২২ অর্থবছরে বজ্রনিরোধক যন্ত্র স্থাপনে সাড়ে ১৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। এ কর্মসূচির আওতায় দেশের ১৫ জেলার ১৩৫ উপজেলায় মোট ৩৩৫টি বজ্রপাত নিরোধক দণ্ড এবং বজ্রপাত নিরোধক যন্ত্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ সময় চাঁপাইনবাবগঞ্জের পাঁচ উপজেলায় ১৬টি বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন করা হয়।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের শিবতলা মহল্লার বাসিন্দা শহিদুল ইসলাম বলেন, প্রতি বছরই বর্ষা মৌসুম এলেই বজ্রপাতের ঘটনা বেড়ে যায়। আকাশে মেঘ দেখলেই মানুষের মধ্যে আতঙ্ক কাজ করে। বিশেষ করে কৃষক, আমচাষি, দিনমজুর ও মাঠে কাজ করা মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। গত কয়েক বছর ধরে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বজ্রপাতে অনেক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তারপরও মনে হচ্ছে কার্যকর কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সরকার কোটি টাকা ব্যয়ে জেলার বিভিন্ন স্থানে ১৬টি বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন করেছে। কিন্তু এত মানুষ মারা যাওয়ার পরও যদি বজ্রপাতে প্রাণহানি না কমে, তাহলে এসব দণ্ড বসিয়ে লাভ কি।
শিবগঞ্জের পাকা ইউনিয়নের বাসিন্দা রবিউল ইসলাম বলেন, বজ্রনিরোধক দণ্ডর কার্যকারিতা নেই। তাই এগুলোর কার্যকারিতা পরীক্ষা করে সংস্কার বা নতুন প্রযুক্তির ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আরও বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন, তালগাছসহ বজ্র সহনশীল গাছ লাগানো এবং মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। তাহলে হয়তো ভবিষ্যতে প্রাণহানি অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার নারায়ণপুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল কুদ্দুস বলেন, বজ্রপাত এখন আমাদের জন্য বড় আতঙ্কের নাম। বর্ষা এলেই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। কৃষকরা জীবিকার তাগিদে মাঠে কাজ করেন, আমবাগানে যান, কিন্তু কখন বজ্রপাত হবে কেউ বলতে পারে না।
তিনি বলেন, কয়েক বছর আগে আমাদের জেলায় একসঙ্গে ১৭ জনের মৃত্যুর ঘটনা এখনও মানুষ ভুলতে পারেনি। এরপর সরকার বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন করেছে, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আবারও একের পর এক প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। এতে মনে হচ্ছে শুধু দণ্ড বসালেই হবে না, সেগুলো নিয়মিত পরীক্ষা, রক্ষণাবেক্ষণ ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বজ্রপাতের আগাম সতর্কবার্তা, নিরাপদ আশ্রয় এবং জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি। মানুষের জীবন রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি তার।
বজ্রনিরোধক দণ্ডগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্নের উদাহরণ মিলেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তার কার্যালয়ে।
কার্যালয়ের সামনেই একটি বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন করা থাকলেও গত ১৫ জুন বজ্রপাতে অফিসের কম্পিউটার, ফটোকপি মেশিনসহ মূল্যবান বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সদর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা কাঞ্চন কুমার দাস জানান, দণ্ডটি থাকা সত্ত্বেও বজ্রপাতের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়নি। তাই তিনি এসব বজ্রনিরোধক দণ্ডের কার্যকারিতা পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় সংস্কার বা প্রতিস্থাপনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. শাহিনুর আলম বলেন, বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। এসব যন্ত্র নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন হয়। কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে তা মেরামতের জন্য দক্ষ টেকনিশিয়ান দরকার। নিয়মিত পরীক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণ না হলে যন্ত্রগুলোর কার্যকারিতা কমে যেতে পারে। তাই এসব দণ্ড সচল রাখতে প্রয়োজনীয় জনবল ও কারিগরি সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। কিন্তু আমাদের সেই সক্ষমতা নেই। একই সঙ্গে বজ্রপাত সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আরও বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন, যাতে প্রাণহানি কমিয়ে আনা সম্ভব হয়।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ড. সাইমুম পারভেজ বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে বজ্রপাতে প্রাণহানির ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, আবহাওয়ার অস্বাভাবিকতা এবং উন্মুক্ত এলাকায় মানুষের চলাচল বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন কারণে এই ঝুঁকি বাড়ছে। প্রাণহানি কমাতে সরকার বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এর অংশ হিসেবে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বেশি করে তালগাছসহ বজ্রপাত-সহনশীল গাছ রোপণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি আধুনিক বজ্রপাত প্রতিরোধী ক্যাচিং মেশিন বা বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা স্থাপনের কাজও চলছে। একই সঙ্গে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া এবং নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দিকেও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।
এ বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মো. মুসাকে একাধিকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে গত ১৫ দিনে বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১৬ জন নারী-পুরুষ ও শিশু। এর মধ্যে অধিকাংশই আম সংগ্রহ কিংবা ঝড়ে পড়া আম কুড়াতে গিয়ে বজ্রাঘাতের শিকার হয়েছে। ৩ জুন বিকেল থেকে সন্ধ্যার মধ্যে সদর, শিবগঞ্জ ও নাচোল উপজেলায় বজ্রপাতে আরও ছয়জনের মৃত্যু হয়। সর্বশেষ ১৫ জুন শিবগঞ্জে আমবাগানে ফুটবল খেলার সময় একজনের মৃত্যু হয়।
