
নিজস্ব প্রতিবেদক | সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬ | প্রিন্ট | ১৮ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, চিন্তক ও লেখক অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হককে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে তার মরদেহ বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে রাখা হয়েছে।
সোমবার (৬ জুলাই) সকাল থেকে প্রিয় শিক্ষক ও লেখককে শেষবারের মতো দেখতে এবং ফুলেল শ্রদ্ধা জানাতে সেখানে ভিড় করেন তার বন্ধু, স্বজন, সহকর্মী, শিক্ষার্থী ও অসংখ্য শুভানুধ্যায়ী।
শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী বলেন, ‘অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন আমাদের সমাজ ও মননশীলতার এক আলোকবর্তিকা। মুক্তবুদ্ধি ও সত্যের পক্ষে তার আপসহীন কণ্ঠস্বর তরুণ প্রজন্মকে আজীবন পথ দেখাবে।’
বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে শ্রদ্ধা নিবেদনের পাশাপাশি মরহুমের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী, বিশিষ্ট নাগরিক, বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধি এবং সাধারণ মানুষ অংশ নেন।
পরে বাদ জোহর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে আরেক দফা জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর তাকে মিরপুর শহিদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হবে।
কলমের কালিতে আর যুক্তির ধারালো শানদার তর্কে আজীবন সত্যের সন্ধানে লড়েছেন অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। গতকাল রবিবার দুপুরে হঠাৎ থেমে গেল সেই লড়াই। পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন আধুনিক বাংলাদেশের বৌদ্ধিক মানচিত্রের অন্যতম রূপকার (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর।
আবুল কাসেম ফজলুল হকের পুত্রবধূ প্রকাশক রাজিয়া রহমান জলি জানান, রবিবার দুপুরে পরিবারের সঙ্গে একটি রেস্তোরাঁয় খেতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন আবুল কাসেম ফজলুল হক। দ্রুত একটি ক্লিনিকে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
মৃত্যুর আগে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বাংলা একাডেমির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছিলেন। ২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবর অন্তর্বর্তী সরকার তাকে বাংলা একাডেমির সভাপতি হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল।
আবুল কাসেম ফজলুল হক ১৯৪০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মুহাম্মদ আবদুল হাকিম এবং মা জাহানারা খাতুন।
১৯৫৯ সালে ময়মনসিংহ জিলা স্কুল থেকে প্রবেশিকা এবং ১৯৬১ সালে আনন্দমোহন কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। পরবর্তীকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। কর্মজীবনের একটি বড় সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে শিক্ষকতায় অতিবাহিত করেছেন এবং বিভাগীয় সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।
অধ্যাপনা ছাড়াও তিনি দেশের মানুষের মুক্তি, গণতন্ত্র ও অগ্রগতির প্রশ্নে সব সময় কলম ধরেছেন। ১৯৮২ সাল থেকে তিনি ‘লোকায়ত’ নামক মননশীল পত্রিকা সম্পাদনা করে আসছিলেন, যা সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। এ ছাড়া আহমদ শরীফ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ‘স্বদেশ চিন্তা সংঘ’-এর সভাপতি হিসেবে ২০০০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করেন এবং বাংলাদেশের মুক্তি ও উন্নয়নের জন্য ‘আটাশ দফা’ কর্মসূচি প্রণয়ন করেন। ২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবর অন্তর্বর্তী সরকার তাকে বাংলা একাডেমির সভাপতি হিসেবে নিয়োগ দেয়।
পারিবারিক জীবনে তিনি ফরিদা প্রধানের সঙ্গে দাম্পত্য জীবন কাটিয়েছেন। তাদের দুই সন্তান–মেয়ে শুচিতা শারমিন ও ছেলে ফয়সল আরেফিন দীপন। জাগৃতি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ফয়সল আরেফিন দীপন ২০১৫ সালে দুষ্কৃতকারীদের হামলায় নিহত হন, যা দেশের বুদ্ধিজীবী মহলে গভীর শোকের ছায়া ফেলেছিল।
আবুল কাসেম ফজলুল হককে একজন নীতিবাদী রাজনৈতিক দার্শনিক হিসেবে গণ্য করা হয়। রাষ্ট্র, সমাজ, অর্থনীতি, দর্শন ও মনোবিজ্ঞানের মতো জটিল বিষয়গুলোকে তিনি সাধারণ মানুষের বোধগম্য করে নিজস্ব যুক্তিগ্রাহ্য ভাষায় তুলে ধরেন। তার লেখা বইয়ের সংখ্যা একুশটির বেশি। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘মুক্তিসংগ্রাম’, ‘উনিশ শতকের মধ্যশ্রেণি ও বাঙলা সাহিত্য’, ‘রাজনীতি ও দর্শন’, ‘বাঙলাদেশের রাজনীতিতে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা’, ‘অবক্ষয় ও উত্তরণ’ এবং ‘মানুষের স্বরূপ’। এ ছাড়া বার্ট্রান্ড রাসেলের বেশ কিছু রচনার অনুবাদসহ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘সাম্য’ গ্রন্থটির সম্পাদনাও তিনি করেছেন।
তার সৃজনশীল কর্ম ও রাষ্ট্রচিন্তার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পেয়েছেন একাধিক সম্মাননা। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বাংলাদেশ লেখক শিবির পুরস্কার (১৯৭৪), বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮১), আলাওল সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯৭) এবং অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার (২০০৬)।
তিনি রাষ্ট্রভাষা বাংলা রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন। তিনি নিরপেক্ষ রাজনৈতিক চিন্তা ও তত্ত্বের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন। তার রচনা স্বদেশ ভাবনা ও রাজনৈতিক চিন্তায় ঋদ্ধ।
