
নিজস্ব প্রতিবেদক | রবিবার, ১৫ মার্চ ২০২৬ | প্রিন্ট | ৯৫ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দেশে পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেল সরবরাহে যে সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল সেটিসহ সব ধরনের বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। রোববার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে এ সিদ্ধান্তের কথা জানান জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
তিনি বলেন, জনগণের ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করা এবং বোরো মৌসুমে কৃষকদের জ্বালানির চাহিদা বিবেচনায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, “পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ১৫ মার্চ থেকে দেশের সব বিতরণ পয়েন্ট থেকে চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি তেল বিতরণ অব্যাহত থাকবে।”
অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে প্রভাব পড়ায় জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। সেই পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার কয়েকটি পদক্ষেপ নেয়, যার মধ্যে ছিল জ্বালানি তেল বিক্রিতে সীমা নির্ধারণ। এর মধ্যে কয়েকটি জ্বালানি তেলের জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে দেশে তেলের ঘাটতি নিয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তখন অনেক ক্রেতা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি জ্বালানি কিনতে শুরু করলে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ৬ মার্চ থেকে পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেল বিক্রিতে সীমা বেঁধে দেওয়া হয়।
সেই নির্দেশনায় মোটরসাইকেলের জন্য দিনে দুই লিটার জ্বালানি বিক্রির সীমা ঠিক করা হয়েছিল। স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিকেল ও মাইক্রোবাসের জন্য ২০ থেকে ২৫ লিটার সীমা ছিল।
পিকআপ বা লোকাল বাসের জন্য ৭০ থেকে ৮০ লিটার এবং দূরপাল্লার বাস, ট্রাক, কভার্ড ভ্যান বা কনটেইনার ট্রাকের জন্য দিনে ২০০ থেকে ২২০ লিটার পর্যন্ত জ্বালানি বিক্রির সীমা ঠিক করা হয়েছিল।
পরে রাইডশেয়ারিং বাইক চালকদের চাহিদা বিবেচনায় তাদের সীমা দুই লিটার থেকে বাড়িয়ে পাঁচ লিটার করা হয়। এখন এসব সীমা তুলে নেওয়ায় চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি কেনার সুযোগ তৈরি হলো।
দাম বাড়ানোর পরিকল্পনা নেই
দেশের অর্থনীতি যতদিন আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ সামাল দিতে পারবে, ততদিন জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পরিকল্পনা সরকারের নেই বলে ভাষ্য জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেও সরকার এখনো দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য অপরিবর্তিত রেখেছে। “বাংলাদেশের অর্থনীতি যতদিন পর্যন্ত এই চাপ সহ্য করতে পারবে, ততক্ষণ পর্যন্ত জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি করার কোনো পরিকল্পনা বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের নেই।”
বিশ্বের অনেক দেশেই ইতোমধ্যে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী অমিত বলেন, “আমরা পত্রপত্রিকা ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দেখছি, প্রায় ৮৫ দেশে জ্বালানির দাম বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালনে ৫০ থেকে ৬০ সেন্ট পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে, অস্ট্রেলিয়ায়ও ৭০ থেকে ৭৫ সেন্ট পর্যন্ত বেড়েছে।” তিনি বলেন, “জনগণের কষ্টের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই সরকার এখনো জ্বালানি তেলের দাম না বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে।”
‘পেট্রোল পুরোপুরি দেশি নয়’
পেট্রোল সরবরাহ নিয়ে এক প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, “অনেক সময় ধারণা করা হয় পেট্রোল পুরোপুরি দেশীয় উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল, কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি এত সরল নয়।”
তিনি বলেন, “পেট্রোল আমরা সরাসরি আমদানি করি না, কিন্তু এটি কনডেনসেট থেকে তৈরি হয়। সেই কনডেনসেটের পুরোটা আবার দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে পাওয়া যায় না।” অমিত বলেন, “কনডেনসেটও অনেক সময় আমদানি করতে হয়। সরকার করুক বা বেসরকারি খাত করুক, সেটি বাস্তবতার অংশ।”
রুশ তেল প্রসঙ্গ
রাশিয়ার জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে আলোচনা চলছে। “রাশিয়ার ক্রুড (অপরিশোধিত) তেল সরাসরি দেশের শোধনাগারে প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব কি না, সে বিষয়ে প্রযুক্তিগত দিক বিবেচনা করা হচ্ছে।”
প্রতিমন্ত্রী বলেন, “একটি সম্ভাবনা হলো রাশিয়ার ক্রুড তেল অন্য কোনো দেশে রিফাইন করে আনা। আবার তারা যে ধরনের সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে, সেটি আমাদের শোধনাগারে প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব কি না, সেটিও আমরা যাচাই করছি।” অমিত বলেন, এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির কাছ থেকে বিস্তারিত ‘প্রযুক্তিগত স্পেসিফিকেশন’ চাওয়া হয়েছে।
জ্বালানি সরবরাহে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন দেশের সঙ্গে জ্বালানি সহযোগিতা নিয়ে নিয়মিত যোগাযোগ করা হচ্ছে বলে জানান জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অমিত। তিনি বলেন, “আমাদের বন্ধু রাষ্ট্রগুলো বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতা করতে আগ্রহ দেখিয়েছে। আমরা তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি।”
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বোরো মৌসুম ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের সময় জ্বালানি সরবরাহে যাতে কোনো বড় সংকট তৈরি না হয়, সে লক্ষ্যেই আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখা হয়েছে। “আমরা চেষ্টা করছি অন্তত এই গুরুত্বপূর্ণ মৌসুমে যেন কোনো বড় জ্বালানি সংকট তৈরি না হয়।”
