শনিবার ১৩ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩০শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম
বৃষ্টিস্নাত কক্সবাজারে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মোংলায় কোস্ট গার্ড স্টেশনে দুর্বৃত্তদের হামলা ও ভাঙচুর, আহত বেশ কয়েকজন সদস্য উপকূলীয় সাত অঞ্চলে ৬০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়ার আভাস ইট মেরে মোটরসাইকেল চালককে আহত,গ্রেপ্তার ২ মন্ত্রিসভার বিশেষ বৈঠকে প্রস্তাবিত বাজেট অনুমোদন ইতিহাসের সর্বোচ্চ বাজেট নিয়ে আজ সংসদে যাচ্ছে তারেক রহমানের সরকার ৫৪ বছরে বাজেটের মঞ্চে অর্থমন্ত্রীদের আলোচিত যত বক্তব্য বিরোধী দলের এলাকাতেও সমান উন্নয়ন হবে : প্রধানমন্ত্রী ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারির ঘটনা সশস্ত্র বাহিনীর ওপর বড় আঘাত ছিল: প্রধানমন্ত্রী জর্ডানের ঘাঁটিতে মিসাইল আঘাত হানার দাবি ইরানের
Advertise with us

গ্রামে ১০ থেকে ১৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না,অতিষ্ঠ মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ৬৫ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

গ্রামে ১০ থেকে ১৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না,অতিষ্ঠ মানুষ

রাজধানী ঢাকাসহ দেশজুড়ে ঘণ্টায় ঘণ্টায় লোডশেডিং হচ্ছে। এতে অসহ্য গরমে অতিষ্ঠ জনজীবন। দিনে-রাতে সব সময় বিদ্যুৎ যাচ্ছে। কোনও কোনও জেলায় সাত থেকে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে ১০ থেকে ১৫ ঘণ্টার বেশি লোডশেডিং দেওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে মানুষের। একদিকে তীব্র গরম, অন্যদিকে বিদ্যুৎ না থাকায় ভোগান্তি বেড়েছে তাদের। সবচেয়ে বিপাকে আছে এসএসসি পরীক্ষার্থীরা।

ময়মনসিংহ শহরে পাঁচ-ছয়, গ্রামে ১২ ঘণ্টার বেশি লোডশেডিং

ময়মনসিংহ শহরে দিনে-রাতে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা আর গ্রামে ১২ ঘণ্টার বেশি লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন জেলার মানুষজন। গ্রামের কেউ কেউ বলছেন, লোডশেডিং নয়; মাঝেমধ্যে বিদ্যুৎ আসে।

নগরীর ব্রাহ্মপল্লী এলাকার বাসিন্দা কামরুল হাসান বলেন, ‘শুক্রবার ছুটির দিন ছিল। এদিনও পাঁচ ঘণ্টা লোডশেডিং ছিল। শনিবার সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত চার বারে চার ঘণ্টা লোডশেডিং ছিল। গত ১০ দিনের বেশি সময় ধরে প্রতিদিন চার-পাঁচ ঘণ্টা লোডশেডিং থাকছে। এতে এসএসসি পরীক্ষার্থীরা ক্ষতির মুখে পড়েছে। পরীক্ষা চলাকালীন লোডশেডিং কম হলে ভালো হতো। কিন্তু এটি আরও বাড়ছে।’

জেলা সদরের গোপালনগর গ্রামের কৃষক আলমাস বলেন, ‘এখন লোডশেডিং বুঝি না। আমাদের গ্রামে ১৫ ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ থাকে না। বেশিরভাগ এলাকায় একই অবস্থা। মাঝেমধ্যে বিদ্যুৎ আসে। আধাঘণ্টা থাকার পর আবার চলে যায়। গত কয়েক বছরের মধ্যে এমন লোডশেডিং আমরা দেখি নাই।’

এ ব্যাপারে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির ময়মনসিংহের নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদুল হক বলেন, ‘শনিবার (২৫ এপ্রিল) বিকাল ৫টার সময় ময়মনসিংহ জোনে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১ হাজার ৩০৭ মেগাওয়াট। বিপরীতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা গেছে ৯৫৭ মেগাওয়াট। এই হিসেবে লোডশেডিং ছিল সর্বোচ্চ ৩৫০ মেগাওয়াট। তবে এই লোডশেডিং ঘণ্টায় ঘণ্টায় পরিবর্তন হয়।’

যশোরে শহরে পাঁচ, গ্রামে ১০ ঘণ্টার বেশি লোডশেডিং

যশোর শহরের ষষ্ঠীতলাপাড়া এলাকার এসএসসি পরীক্ষার্থী তাবাচ্ছুম মানহা ঐশী। রবিবার ইংরেজি প্রথম পত্রের পরীক্ষা তার। ঘনঘন লোডশেডিংয়ে পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটছে বলে জানিয়েছেন। পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে উদ্বেগে আছেন। ঐশীর ভাষ্য, ‘গত শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত তিনবারে তিন ঘণ্টার বেশি লোডশেডিং হয়েছে। এরপর শনিবার সকাল থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত তিনবার লোডশেডিং। একবার বিদ্যুৎ গেলে ৪০ মিনিট থেকে দেড় ঘণ্টা পর আসে। দিনে-রাতে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। এতে পড়াশোনা ও প্রস্তুতিতে ব্যাঘাত ঘটছে আমার।

এই শিক্ষার্থীর অভিভাবক সুমাইয়া খাতুন বলেন, ‘গরমে বিদ্যুৎ চলে গেলে সারা শরীর ঘেমে যায়। পড়াশোনা করার উপায় থাকছে না। সবাই তো আর আইপিএস বা জেনারেটর ব্যবহার করতে পারে না।’

চাহিদা মতো বিদ্যুৎ না পেয়ে দিন কিংবা রাতের বেশিরভাগ সময় কষ্ট করতে হচ্ছে মানুষকে। ভোগান্তি তৈরি হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্যেও। বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, যশোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির চাহিদার তুলনায় ২৫-৩৫ শতাংশ পাচ্ছেন সরবারহ। এতে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের শিকার হচ্ছে মানুষ। তবে শহরের চেয়ে গ্রামে লোডশেডিং বেশি দিতে হচ্ছে।

যশোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ জেনারেল ম্যানেজার মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান খান বলেন, ‘সমিতিতে মোট গ্রাহক ৫ লাখ ৯৬ হাজার। প্রতিদিনই প্রায় চাহিদা ১৩৮ মেগাওয়াট। সেখানে সরবরাহ হচ্ছে ৯০ মেগাওয়াট বা তার চেয়ে কম। আবার গরম বেশি পড়লে সরবারহ আরও কমে যাচ্ছে। চলতি মাসজুড়েই একই অবস্থা। আমার কিছুই করার নেই।’

ওজোপাডিকোর নির্বাহী প্রকৌশলী নাসির উদ্দিন বলেন, ‘যশোর শহরে বিদ্যুতের মোট চাহিদা ৫৬ মেগাওয়াট। বৃহস্পতিবার আমরা পেয়েছি ৪৫ মেগাওয়াট। এতে লোডশেডিং বেশি হচ্ছে। তবে আদানি কেন্দ্রটি সচল হলে আশা করছি লোডশেডিং কমে আসবে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে প্রচারণা চালানো হচ্ছে।’

যশোর শহরে পাঁচ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না আর গ্রামে তা ১০ ঘণ্টার বেশি গড়াচ্ছে। দিনের তুলনায় সন্ধ্যায় লোডশেডিং বেশি হচ্ছে। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ঘন ঘন বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ায় জনজীবনে দুর্ভোগ নেমে এসেছে।

সদরের নারাঙ্গালি গ্রামের তবিবর রহমান বলেন, ‘বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহের কারণে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনায় মারাত্মক বিঘ্ন ঘটছে। অন্ধকারে বা পর্যাপ্ত আলো না থাকায় তারা মনোযোগ দিয়ে পড়তে পারছে না। ফলে শিক্ষাজীবন ব্যাহত হচ্ছে। প্রতিদিন ১০ ঘণ্টা বিদ্যুত থাকে না। অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছি আমরা।’

চাচড়া এলাকার মাছ চাষি জাহিদ হোসেন গোলদার বলেন, ‘বৈশাখ মাসে পুকুরে সারাক্ষণ পানি দিতে হয়। দিনের বড় একটা সময় লোডশেডিং থাকায় সেচ কার্যক্রম বন্ধ থাকছে, এতে মাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে।’

কিশোরগঞ্জেও একই অবস্থা

কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার ছাতিরচর ইউনিয়নের কামাল মিয়া বলেন, ‘২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১২ ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ থাকছে না। একটু পর পর চলে যায়। আমার মেয়ে এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। গরম আর রাতের অন্ধকার মিলিয়ে পড়াশোনা ঠিকমতো করতে পারছে না। ভোগান্তির পাশাপাশি দুশ্চিন্তায় আছি।’

ইটনা উপজেলার শিমুল বাগের জসীম দাদ খাঁ বলেন, ‘হাওরে ধান কাটার সময় চলছে। বিদ্যুৎ যায় আর আসে। সারাদিন ধানকাটার কাজ করে বাসায় ফিরেও কোনও স্বস্তি নেই। প্রচণ্ড গরম। ভোগান্তির শেষ নেই। সরকারের কাছে আবেদন যত দ্রুত সম্ভব বিদ্যুতের সমস্যার যেন সমাধান করে। আমি অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছি।’

নারায়ণগঞ্জে ১০-১৪ ঘণ্টার বেশি লোডশেডিং

নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি উপজেলার মধ্যে বন্দর, সোনারগাঁ, আড়াইহাজার ও রূপগঞ্জে গড়ে প্রতিদিন ১০-১৪ ঘণ্টার বেশি লোডশেডিং হচ্ছে। এর মধ্যে বন্দরে পাঁচ-সাত, সোনারগাঁয়ে ১০-১২, আড়াইহাজারে ১২-১৬, রূপগঞ্জে ১০-১২ এবং নারায়ণগঞ্জ শহরে অর্থাৎ সদরে দুই-তিন ঘণ্টা লোডশেডিং থাকে।

নারায়ণগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ অফিস সূত্রে জানা গেছে, পাঁচটি উপজেলার মধ্যে বন্দর, সোনারগাঁ, আড়াইহাজার ও রূপগঞ্জে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে নারায়ণগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ ও নারায়ণগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২। নারায়ণগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর প্রতিদিন ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা হলেও ৩০-৪০ শতাংশ কম পাওয়া যাচ্ছে। নারায়ণগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর ২০০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে মিলছে ১৪০।

নোয়াখালীতে ১০-১২ ঘণ্টা লোডশেডিং

নোয়াখালীতে লোডশেডিংয়ের কারণে জনজীবনে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদের মানুষ লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ। ভ্যাপসা গরমে চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছেন তারা। এ ছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্যেও দেখা দিয়েছে মন্দা। বিদ্যুতের কারণে শিল্পনগরীগুলোতে নষ্ট হচ্ছে শ্রমঘণ্টা। প্রতিদিন প্রায় ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা লোডশেডিংয়ে থাকতে হচ্ছে গ্রামের বাসিন্দাদের। তবে শহরে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা থাকছে লোডশেডিং।

পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির তথ্যমতে, নোয়াখালীতে তাদের ৮ লাখ ২০ হাজার গ্রাহক। প্রতিদিন পিক-আওয়ারে তাদের চাহিদা ২০০ মেগাওয়াট। কিন্তু তারা প্রতিদিন গড়ে ১২০ থেকে ১৫০ মেগাওয়াট করে সরবরাহ করতে পারছে। অন্যদিকে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের নোয়াখালী জেলা শহরের চাহিদা প্রতিদিন ৩৬ মেগাওয়াট থাকলেও তারা গড়ে ১৫ মেগাওয়াট করে বরাদ্দ পাচ্ছে। সেটিই গ্রাহকদের মাঝে সরবরাহ করা হয়।

নোয়াখালী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার মোহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, ‌‘আমাদের চাহিদা ২০০ মেগাওয়াট থাকলেও প্রতিদিন গড়ে ১২০ থেকে ১৫০ মেগাওয়াট করে বরাদ্দ পাচ্ছি। প্রাপ্ত বরাদ্দ থেকেই ভাগ করে সরবরাহ দিতে হচ্ছে। এজন্য বেশি পরিমাণ লোডশেডিং থাকছে।’

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের নোয়াখালীর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হাবিবুর বাহার বলেন, ‘আমাদের মোট চাহিদার অর্ধেকও বরাদ্দ পাচ্ছি না। যার কারণে কিছু ফিডার বন্ধ রেখে বাকি সংযোগগুলো চালাতে হয়। এতে লোডশেডিং সৃষ্টি হয়। গ্রাহক পর্যায় থেকে বিভিন্ন সময় আমাদের কাছে অনেক অভিযোগ আসে। কিন্তু কিছুই করার নেই।’

রংপুরে গ্রামাঞ্চলে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং

রংপুরে ভয়াবহ লোডশেডিং আর প্রচণ্ড তাপদাহে জনজীবন অচল হয়ে পড়েছে। সকাল থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত এক ঘণ্টা পর পর লোডশেডিং চলছে। এতে ছোট ছোট কলকারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। নগরীর শপিংমল আর মার্কেটগুলোতে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে সারাদিনই লোডশেডিং চলছে। বিশেষ করে গ্রামে দিনে দুই-তিনবার বিদ্যুৎ এসে এক ঘণ্টা থেকে চলে যাচ্ছে। অর্থাৎ ১০ ঘণ্টার বেশি লোডশেডিং থাকে। রাতের ১১টা কিংবা ১২টার আগে বিদ্যুৎ আসে না। সবমিলিয়ে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং থাকছে।

এসএসসি পরীক্ষার্থী মোসলেমা তাবাসসুম বলেন, ‘এখন তো বিদ্যুৎ না থাকলে বিকল্প হিসেবে কুপি ব্যবহার হয় না। মমবাতি জ্বালিয়ে পড়তে বসলেও গরমে অতিষ্ঠ হয়ে পড়ি। দিনে-রাতে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না।’

এ ব্যাপারে নেসকোর রংপুরের সহকারী প্রকৌশলী আমিন উদ্দিন বলেন, ‘জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদার তুলনায় কম বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়ায় লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।’

উপজেলাগুলোতে আরও ভয়াবহ অবস্থা। কখন বিদ্যুৎ দেবে তা পল্লী বিদ্যুতের কর্মকর্তারাই জানেন না। সন্ধ্যার পর থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত বেশিরভাগ গ্রামে বিদ্যুৎ থাকে না। দিনে দুই-তিন ঘণ্টার বেশি থাকে না।

বরিশালে শহরে পাঁচ ঘণ্টা, গ্রামাঞ্চলে ১০ ঘণ্টার বেশি লোডশেডিং

বরিশালে শহরে পাঁচ ঘণ্টা এবং গ্রামাঞ্চলে ১০ ঘণ্টার বেশি লোডশেডিং থাকছে প্রতিদিন। সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। তার মধ্যে সন্ধ্যা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দোকান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় লোকসান হচ্ছে তাদের।

নগরীর রূপাতলির ৩৩ কেভি সাবস্টেশনের কন্ট্রোল রুম সূত্র জানিয়েছে, প্রতিদিন বরিশাল ও ঝালকাঠিতে বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে ৯০ থেকে ৯৫ মেগাওয়াট। সেখানে পাওয়া যাচ্ছে ৪২ মেগাওয়াট। এ কারণে পিক-আওয়ার ও অফ পিক-আওয়ারে শহরে পাঁচ ঘণ্টা লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।

নগরীর কাউনিয়ার বাসিন্দা মিজানুর রহমান ও সার্কুলার রোডের বাসিন্দা সাদেক হোসেন জানিয়েছেন, দিনে-রাতে পাঁচ ঘণ্টার বেশি লোডশেডিং থাকে। এতে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। বিশেষ করে রাতে ঘুমের মধ্যে বিদ্যুৎ চলে গেলে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে হয় শিশুদের নিয়ে।

নগরীর চকবাজারের ব্যবসায়ী মিনাল কান্তি সাহা ও মোহাম্মদ শাহিন জানান, বিদ্যুৎ সংকটে ব্যবসা-বাণিজ্যে অচল অবস্থা তৈরি হয়েছে। প্রতিবার গেলে এক ঘণ্টার বেশি সময় লোডশেডিং থাকে। এ কারণে ক্রেতা ধরে রাখা যায় না। এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে প্রতিদিনের দোকানের খরচ তুলতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

বরিশাল বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ কেন্দ্র-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মঞ্জুর কুমার স্বর্ণকার জানান, তার আওতাধীন এলাকায় বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে ৭৯ মেগাওয়াট। বরাদ্দ পাচ্ছেন ৫০ মেগাওয়াট। ফলে লোডশেডিং দিতে বাধ্য হচ্ছেন।

বরিশাল বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ কেন্দ্র-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মঞ্জুরুল ইসলাম জানান, তার আওতাধীন এলাকায় বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে ৩৯ মেগাওয়াট। তাকে সরবরাহ করা হচ্ছে ২১ মেগাওয়াট।

রাজশাহীর জনজীবন বিপর্যস্ত

ঘন ঘন লোডশেডিং ও তীব্র তাপপ্রবাহে রাজশাহীর জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ সংকট শহর ও গ্রামাঞ্চলে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া পণ্য উৎপাদন, কৃষি, শিক্ষা, ব্যবসা ও দৈনন্দিন জীবনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।

স্থানীয় বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় গ্রামাঞ্চলে দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। নেসকো কর্মকর্তারা জানান, গরমের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়েছে, কিন্তু জাতীয় গ্রিড থেকে পর্যাপ্ত সরবরাহ না পাওয়ায় ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।

গোদাগাড়ী উপজেলার কৃষক মুক্তার হোসেন বলেন, ‘এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকলে দুই ঘণ্টা থাকে না। নিয়মিত সেচ দিতে না পারায় উৎপাদন খরচ বাড়ছে। এতে লাভের মুখ দেখা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।’

শহরাঞ্চলের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। তীব্র গরম ও লোডশেডিংয়ে দুপুরের পর রাস্তাঘাট প্রায় ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। রিকশাচালক, দিনমজুর ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। কাজের সময় কমে যাওয়ায় আয়ও কমে গেছে। অনেকেই ছায়া ও গাছের নিচে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছেন। শিক্ষা খাতেও বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। এসএসসি পরীক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে রয়েছে।

নগরীর উপশহর এলাকার বাসিন্দা ব্যবসায়ী মাহবুব উল ইসলাম বিপুল বলেন, তীব্র গরমে ঘন ঘন বিদ্যুৎ না থাকায় পরিবার নিয়ে ভোগান্তিতে পড়েছি। একই সঙ্গে ব্যবসাতেও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।

চুয়াডাঙ্গায় ঘণ্টায় ঘণ্টায় লোডশেডিং

চুয়াডাঙ্গা জেলাজুড়ে বেড়েছে ঘন ঘন লোডশেডিং। চাহিদার তুলনায় গড়ে ৩৫ থেকে ৪৬ শতাংশ বিদ্যুতের ঘাটতি দেখা দেওয়ায় প্রতি ঘণ্টায় লোডশেডিং হচ্ছে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।

চুয়াডাঙ্গায় বর্তমানে তাপমাত্রা ৩৫ থেকে ৪০ ডিগ্রির মধ্যে ওঠানামা করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তীব্র লোডশেডিং, সব মিলিয়ে জনজীবনে নেমে এসেছে চরম অস্বস্তি। শহর থেকে গ্রাম, সব জায়গাতেই একই চিত্র। ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে বাসাবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, দিনে-রাতে ১২ থেকে ১৫ বার, কোথাও কোথাও তারও বেশি লোডশেডিং হচ্ছে।

চুয়াডাঙ্গা জোনাল পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ডিজিএম মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন জানান, তাদের জোনে মোট গ্রাহক সংখ্যা ৮৪ হাজার। এর মধ্যে আবাসিক গ্রাহক ৭৪ হাজার। চাহিদা ২০ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১২ থেকে ১৩ মেগাওয়াট, যার ফলে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

ফরিদপুরে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং

ফরিদপুরে টানা কয়েকদিনের তীব্র গরম ও দিনরাত ঘনঘন লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে জনজীবন। ঘরে-বাইরে সবখানে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে বাসিন্দাদের। বিশেষ করে নয়টি উপজেলার মধ্য বোয়ালমারী ও আলফাডাঙ্গায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত চলছে লোডশেডিং। দিনরাত মিলে গড়ে ৯-১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সেবা পাচ্ছেন গ্রাহকরা। উপজেলা সদর থেকে গ্রামের পরিস্থিতি আরও নাজুক পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, চাহিদার তুলনায় ফরিদপুরে বিদ্যুৎ সরবরাহ কম থাকায় লোডশেডিং হচ্ছে। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির বোয়ালমারী জোনাল অফিসার দিপু হালদার বলেন, ‘বোয়ালমারীর দুটি উপকেন্দ্র (বোয়ালমারী পুরো উপজেলা ও আলফাডাঙ্গার কিছু অংশ) পিক আওয়ারে চাহিদা ২৪ মেগাওয়াট এবং অফপিক আওয়ারে চাহিদা ১৮-২০ মেগাওয়াট। চাহিদার তুলনায় বর্তমানে ৪০-৫০ শতাংশ বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও প্রচণ্ড গরমের কারণে লোডশেডিং বেড়েছে। পল্লী বিদ্যুৎ হচ্ছে সাপ্লাই কোম্পানি। উৎপাদনের সাথে সম্পর্ক নেই। যা পাওয়া যায় তাই সাপ্লাই করতে হয়।’

ফরিদপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার এস এম নাসির উদ্দীন জানান, শুক্রবার সন্ধ্যায় জেলায় পিক আওয়ারে ১০৬ মেগাওয়াট চাহিদা সেখানে পাচ্ছি ৭৫ মেগাওয়াট। অফ পিক আওয়ারে চাহিদা ৭০ মেগাওয়াট সেখানে পাচ্ছি ৪৫ মেগাওয়াট। তবে ১৫ ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের অভিযোগ সঠিক নয়। গড়ে ২৪ ঘণ্টায় ১০ ঘণ্টার বেশি লোডশেডিং চলছে।

গাজীপুরে ভয়াবহ লোডশেডিং, জনজীবনে দুর্ভোগ

গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে লোডশেডিং। শহরাঞ্চলে কিছুটা সহনীয় হলেও গ্রামে গড়ে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। এতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। কৃষি, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে শিক্ষাক্ষেত্র সবখানেই এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর মহাব্যবস্থাপক (জিএম) আবুল বাশার আজাদ বলেন, ‘এই জোনে মোট বিদ্যুতের চাহিদা ৪৮৪ মেগাওয়াট। সরবরাহ মিলছে ৩১২ মেগাওয়াট। চাহিদার তুলনায় ১৭২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম সরবরাহ করা হচ্ছে। বিদ্যুৎ না পাওয়ায় গড়ে ৩০ শতাংশ লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। এতে জেলায় গড়ে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না।’

তবে স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, ৪০ থেকে ৫০ মিনিট পর পর বিদ্যুৎ চলে যায়। ফ্যান বন্ধ হয়ে গেলে গরমে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। দিনে-রাতে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং থাকে।

ময়মনসিংহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর শ্রীপুরের মাওনা জোনাল অফিসের উপ-মহাব্যবস্থাপক শান্তনু রায় বলেন, ‘মাওনা জোনে বিদ্যুতের চাহিদা ১২০ মেগাওয়াট এবং শ্রীপুরে ২১২ মেগাওয়াট। আমরা ৩টা গ্রিড থেকে পুরো উপজেলাতে পাওয়ার পাই। শ্রীপুর গ্রিডে পাচ্ছি ২৫ শতাংশের মতো লোডশেডিং। শ্রীপুরে ডিমান্ড আছে ১০৫ মেগাওয়াটের মতো। ক্যালকুলেশনে ৮০ মতো আসে পিক আওয়ারে। অফ পিক আওয়ারে লোডশেডিং আরও কম থাকে।’

Facebook Comments Box
Advertise with us
Advertise with us
আরও
Advertise with us

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

রবিসোমমঙ্গলবুধবৃহশুক্রশনি
 
১০১১
১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭৩০ 

ফলো করুন দেশবার্তা-এর খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক
মো: সামসুদ্দীন চৌধুরী
সম্পাদকীয় কার্যালয়