
নিজস্ব প্রতিবেদক | বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬ | প্রিন্ট | ১৭ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

চলতি অর্থবছরের ১১ মাসের ৯ মাসেই রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য খাতে যা বাড়িয়েছে উদ্বেগ। মে মাসের পতনের পেছনে ঈদের ছুটিকে প্রধান কারণ দায়ী করা হলেও রপ্তানিকারকদের দাবি—বাস্তবতা আরও জটিল।
পোশাক রপ্তানি কারকদের মতে, বৈশ্বিক অর্থনীতির মন্থর গতি, চলমান যুদ্ধ ও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া, পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব—সব মিলিয়েই রপ্তানি খাত চাপে পড়েছে।
তবে প্রশ্ন রয়ে গেছে, এসব কারণের মধ্যে কোনটি আসলে রপ্তানি আয়ের এই দীর্ঘস্থায়ী পতনের মূল চালিকাশক্তি এবং কেন এত মাস পরও ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না খাতটি?
চলতি বছরের মে মাসে দেশের রপ্তানি আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে ৭ দশমিক ০৯ শতাংশ। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) প্রকাশিত সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাসে রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৪৪০ কোটি ২৮ লাখ ডলারে, যা ২০২৫ সালের একই মাসে ছিল ৪৭৩ কোটি ৭৯ লাখ ডলার।
চলতি অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে মোট রপ্তানি আয় ৪ হাজার ৩৭৯ কোটি ডলারে নেমে এসেছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের ৪ হাজার ৪৯৪ কোটি ডলারের তুলনায় ২ দশমিক ৫৫ শতাংশ কম।
কেন রপ্তানি নেতিবাচক
‘বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির পেছনে একক কোনো কারণ নয়, বরং বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা চ্যালেঞ্জ একসঙ্গে কাজ করছে। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার মতো প্রধান বাজারগুলোতে মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ভোক্তা চাহিদা কমেছে। ফলে রপ্তানি আদেশও হ্রাস পেয়েছে।’ এ মন্তব্য করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান।
এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘একই সঙ্গে যুদ্ধ ও ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বৈশ্বিক বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে ব্যাহত করেছে। দেশের ভেতরে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট, বিনিময় হারে অস্থিরতা এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে দুর্বল করেছে।’
এর পাশাপাশি অল্প কয়েকটি পণ্য ও বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা রপ্তানি খাতকে বহিরাগত ধাক্কার প্রতি আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে জানিয়ে বলেন, ‘এর ফলে টানা নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি কেবল সাময়িক সংকট নয়, বরং রপ্তানি কাঠামোর কিছু গভীর দুর্বলতারও ইঙ্গিত দিচ্ছে।’
রপ্তানি প্রবৃদ্ধি প্রসঙ্গে সাম্প্রতিক নেতিবাচক প্রবণতা নিয়ে মন্তব্য করে বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘দেশের রপ্তানি আয় ধারাবাহিকভাবে নেতিবাচক থাকা অস্বাভাবিক নয়। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন অর্ডারের ঘাটতি এখনো স্পষ্ট।’
তার মতে, রপ্তানির সামগ্রিক চাপে মূল কারণ হলো বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়া এবং নতুন কার্যাদেশ না আসা।
মাসভিত্তিক কিছু ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘গত মাসে যে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে, সেটি মূলত পরিসংখ্যানগত প্রভাবের ফল।’ তিনি ব্যাখ্যা করেন, আগের বছরের একই মাসে ঈদের কারণে প্রথম সপ্তাহে কার্যক্রম প্রায় বন্ধ ছিল, ফলে ওই সময় রপ্তানি কম ছিল। সেই তুলনায় চলতি বছরে পুরো মাসজুড়ে উৎপাদন ও চালান সচল থাকায় স্বাভাবিকভাবেই প্রবৃদ্ধি বেশি দেখা গেছে।’
মাসিক প্রবৃদ্ধির এ ধরনের ওঠানামাকে অতিরিক্ত ইতিবাচকভাবে দেখার সুযোগ নেই দাবি করেন তিনি বলেন, ‘গত মাসের যে ফিগার দেখানো হয়েছে, সেটির সঙ্গে আমি পুরোপুরি একমত নই। কারণ এটি বাস্তব চাহিদা বৃদ্ধির প্রতিফলন নয়, বরং ক্যালেন্ডার ও কাজের দিনের পার্থক্যের ফল।’
হাতেম জোর দিয়ে বলেন, ‘প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হচ্ছে নতুন রপ্তানি অর্ডার নিশ্চিত করা এবং বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখা, যা ছাড়া টেকসই প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়।’
তবে ইপিবি জানায়, বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি গন্তব্যগুলোতে দেশীয় পণ্যের চাহিদা এখনো শক্তিশালী অবস্থায় রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে।
একই সময়ে স্পেন, নেদারল্যান্ডস, পোল্যান্ড, কানাডা, চীন, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবেও রপ্তানি বেড়েছে। এটি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি ও রপ্তানি পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
চলমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিস্থিতির মধ্যেও সবশেষ রপ্তানি পরিসংখ্যান বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের স্থিতিস্থাপকতা তুলে ধরছে বলে উল্লেখ করেছে ইপিবি। মে মাসে মাসভিত্তিক শক্তিশালী পুনরুদ্ধার, অপ্রচলিত রপ্তানি খাতের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি এবং গুরুত্বপূর্ণ বাজারগুলোতে ইতিবাচক পারফরম্যান্স—সব মিলিয়ে এটি রপ্তানি বহুমুখীকরণ, বাজার সম্প্রসারণ ও দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্য সক্ষমতার দিকে দেশের অগ্রযাত্রাকেই নির্দেশ করছে।
উত্তরণের উপায়
রপ্তানিকারক ও অর্থনীতিবিদরা সমস্বরে উত্তরণের পথে একই ধরনের মতামত দিয়েছেন। তাদের মতে, রপ্তানি আয়ের নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে বাংলাদেশকে স্বল্পমেয়াদি সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কারে জোর দিতে হবে।
প্রথমত, তৈরি পোশাকের বাইরে ওষুধ, চামড়া, আইসিটি, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য ও হালকা প্রকৌশল খাতে রপ্তানি বহুমুখীকরণ জরুরি।
দ্বিতীয়ত, উৎপাদন ব্যয় কমাতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, দক্ষ অবকাঠামো এবং দ্রুত কাস্টমস সেবা নিশ্চিত করতে হবে।
তৃতীয়ত, নতুন বাজার অনুসন্ধান ও বিদ্যমান বাজারে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রযুক্তি, দক্ষতা উন্নয়ন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
পাশাপাশি, বিনিয়োগবান্ধব নীতি, স্থিতিশীল বিনিময় হার ও ব্যবসা পরিচালনার সহজ পরিবেশও রপ্তানি পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হলেও অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বাড়িয়ে বাংলাদেশ রপ্তানি খাত আরও সহনশীল ও টেকসই করে তুলতে পারে।
রপ্তানি আয়ের সামগ্রিক চিত্র
দেশের মোট রপ্তানি আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাত চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২৬) জুলাই-মে সময়ে ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। এ সময়ে খাতটির রপ্তানি আয় হয়েছে ৩ হাজার ৫৩১ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৩ হাজার ৬৫৫ কোটি ডলার।
আরএমজি খাতের মধ্যে নিটওয়্যার পণ্যের রপ্তানি ৪ দশমিক ২৬ শতাংশ কমে ১ হাজার ৮৭৮ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। একই সময়ে ওভেন গার্মেন্টসের রপ্তানি ২ দশমিক ৪২ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৫২ কোটি ডলারে।
হোম টেক্সটাইল খাতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। এ খাতের রপ্তানি আয় ৩ দশমিক ৪৮ শতাংশ বেড়ে ৮৫ কোটি ৩০ লাখ ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৮২ কোটি ৫০ লাখ ডলার।
সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে হিমায়িত ও জীবন্ত মাছ রপ্তানি থেকে আয় ০ দশমিক ৪৭ শতাংশ বেড়ে ৪১ কোটি ২০ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৪১ কোটি ডলার।
তবে কৃষিপণ্য রপ্তানি ৪ দশমিক ৫১ শতাংশ কমে ৮৮ কোটি ৬০ লাখ ডলারে নেমে এসেছে, যা এক বছর আগে ছিল ৯২ কোটি ৮০ লাখ ডলার। বিপরীতে ওষুধ শিল্পের রপ্তানি ১০ দশমিক ৭৩ শতাংশ বেড়ে ২১ কোটি ৮০ লাখ ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের অর্থবছর ছিল ১৯ কোটি ৭০ লাখ ডলার।
একই সময়ে প্লাস্টিকপণ্যের রপ্তানি ৫ দশমিক ৭১ শতাংশ বেড়ে ২৮ কোটি ৬০ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি ৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ বেড়ে ১১০ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে, যা আগের বছর ছিল ১০৫ কোটি ডলার।
খাতভিত্তিক হিসাবে, চামড়া রপ্তানি ২ শতাংশ বেড়ে ১২ কোটি ২০ লাখ ডলার হয়েছে। চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি ১৪ দশমিক ১১ শতাংশ বেড়ে ৩৬ কোটি ৩০ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। তবে চামড়ার জুতা রপ্তানি ১ দশমিক ২৩ শতাংশ কমে ৬১ কোটি ৩০ লাখ ডলারে নেমে এসেছে।
পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি ৩ দশমিক ১৭ শতাংশ বেড়ে ৭৯ কোটি ৩০ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। বিশেষায়িত টেক্সটাইল পণ্যের রপ্তানি ১ দশমিক ১৮ শতাংশ কমে ৩৫ কোটি ৭০ লাখ ডলারে নেমেছে।
চামড়াবহির্ভূত জুতার রপ্তানি ২ দশমিক ৪৭ শতাংশ কমে ৪৮ কোটি ২০ লাখ ডলারে দাঁড়ালেও সাইকেল রপ্তানিতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। এ খাতের রপ্তানি ২৮ দশমিক ৩১ শতাংশ বেড়ে ১৩ কোটি ৯০ লাখ ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১০ কোটি ৮০ লাখ ডলার।
