
নিজস্ব প্রতিবেদক | শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬ | প্রিন্ট | ২ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

দেশের মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার আনতে যাচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ভ্যাট নিবন্ধিত (বিআইএনধারী) প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য মাসিক ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা শিথিল করে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে, অর্থাৎ প্রতি তিন মাস পরপর রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ রাখা হচ্ছে।
পাশাপাশি ভ্যাট প্রশাসনকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও ব্যবসাবান্ধব করতে রিটার্ন দাখিল এবং অডিট কার্যক্রম সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় (অটোমেটেড) করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ ধরনের সংস্কার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনিক ব্যয় ও সময় কমানোর পাশাপাশি কর ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নতুন ব্যবস্থার আওতায় বছরে ১২ বার রিটার্ন দাখিলের পরিবর্তে মাত্র ৪ বার, অর্থাৎ প্রতি তিন মাসে একবার রিটার্ন জমা দিতে হবে। এতে বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের প্রশাসনিক ব্যয় ও সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে ভ্যাট ব্যবস্থার আওতা সম্প্রসারণ করে আরও বেশি প্রতিষ্ঠানকে কর নেটওয়ার্কের অন্তর্ভুক্ত করাও সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। এর মাধ্যমে রাজস্ব আদায় প্রক্রিয়া আরও বিস্তৃত ও কার্যকর করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “বর্তমান মাসিক রিটার্ন ব্যবস্থা অনেক ছোট ও মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি বড় চাপ। নিয়মিত হিসাব সংরক্ষণ, রিটার্ন প্রস্তুত এবং নির্ধারিত সময়ে জমা দেওয়ার কারণে অনেক উদ্যোক্তা ভ্যাট ব্যবস্থাকে জটিল মনে করেন। আমরা এমন একটি ব্যবস্থা চালু করতে চাই, যাতে ব্যবসায়ীরা সহজে ভ্যাট কাঠামোর মধ্যে থাকতে পারেন এবং স্বেচ্ছায় নিবন্ধিত হতে আগ্রহী হন।”
তিনি জানান, বর্তমানে প্রতি মাসের কার্যক্রমের হিসাব পরবর্তী মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে জমা দিতে হয়। নতুন প্রস্তাব কার্যকর হলে তিন মাসের তথ্য একসঙ্গে করে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে রিটার্ন দাখিল করা যাবে। ফলে ব্যবসা পরিচালনায় সময় ও খরচ দুটোই কমবে।
ব্যবসাবান্ধব ভ্যাট ব্যবস্থার দিকে অগ্রযাত্রা
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরেই ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো মাসিক রিটার্ন ব্যবস্থার পরিবর্তে ত্রৈমাসিক রিটার্ন চালুর দাবি জানিয়ে আসছিল। তাদের মতে, ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রতি মাসে হিসাব প্রস্তুত করা, পেশাদার সহায়তা নেওয়া এবং অনলাইনে রিটার্ন জমা দেওয়া একটি অতিরিক্ত আর্থিক ও প্রশাসনিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
এনবিআর মনে করছে, রিটার্ন দাখিলের প্রক্রিয়া সহজ করা গেলে করদাতার সংখ্যা বাড়বে এবং স্বেচ্ছা প্রতিপালন (ভলান্টারি কমপ্লায়েন্স) আরও উন্নত হবে। একই সঙ্গে বর্তমানে ভ্যাট ব্যবস্থার বাইরে থাকা অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও নিবন্ধনের আওতায় আসতে উৎসাহিত হবে।
সম্পূর্ণ ডিজিটাল হবে রিটার্ন ও অডিট
নতুন ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভ্যাট প্রশাসনের পূর্ণাঙ্গ ডিজিটালাইজেশন। এনবিআর সূত্র জানায়, ভবিষ্যতে ভ্যাট রিটার্ন দাখিল সম্পূর্ণ অনলাইন ও স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে সম্পন্ন হবে। এতে ব্যবসায়ীদের আলাদা করে কাগজপত্র জমা দেওয়ার প্রয়োজন পড়বে না।
বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠান ইআরপি (এন্টারপ্রাইজ রিসোর্স প্ল্যানিং) সফটওয়্যারের মাধ্যমে তাদের ক্রয়-বিক্রয়, স্টক ও হিসাব সংরক্ষণ করবে, তারা অডিটের ক্ষেত্রেও বিশেষ সুবিধা পাবে। ভ্যাট কর্মকর্তারা সরাসরি ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণ করে অডিট সম্পন্ন করতে পারবেন। ফলে আগের মতো বিপুল পরিমাণ নথিপত্র জমা দেওয়া এবং দীর্ঘ ম্যানুয়াল অডিট প্রক্রিয়ার প্রয়োজন কমে যাবে।
রাজস্ব প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রযুক্তিনির্ভর এই ব্যবস্থা একদিকে যেমন ব্যবসার খরচ কমাবে, অন্যদিকে কর ফাঁকি শনাক্ত ও রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতাও বাড়াবে।
ভ্যাট নিবন্ধনের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে
এনবিআরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রায় ৭ লাখ ৭৫ হাজার ভ্যাট নিবন্ধিত (বিআইএনধারী) প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে পরিচালিত বিশেষ ভ্যাট নিবন্ধন অভিযানে ১ লাখ ৩১ হাজার নতুন প্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত হওয়ার ফলে এই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর আগে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল প্রায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার।
রাজস্ব বোর্ড আগামী অর্থবছরগুলোতে ভ্যাট নিবন্ধনের সংখ্যা ২০ লাখে উন্নীত করার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এজন্য করদাতা-বান্ধব ও সহজতর ভ্যাট ব্যবস্থাপনা চালুর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বর্তমানে কী নিয়ম রয়েছে
বর্তমান ভ্যাট আইন অনুযায়ী, প্রতিটি ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানকে প্রতি মাসের কার্যক্রমের হিসাব পরবর্তী মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে অনলাইনে মূসক-৯ দশমিক ১ ফরমে দাখিল করতে হয়। রিটার্নে বিক্রয়, ক্রয়, আমদানি, প্রদেয় ভ্যাট, ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট, কর সমন্বয় এবং সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া ভ্যাটের বিস্তারিত তথ্য উল্লেখ করতে হয়।
এ ব্যবস্থায় একজন করদাতাকে বছরে ১২ বার রিটার্ন দাখিল করতে হয়। পাশাপাশি মূসক চালান, স্টক রেজিস্টার, ক্রয়-বিক্রয়ের হিসাবসহ বিভিন্ন নথিপত্র সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক। নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন জমা না দিলে জরিমানা, সুদ এবং অন্যান্য প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।
কর বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রস্তাবিত ত্রৈমাসিক রিটার্ন ব্যবস্থা বাস্তবায়িত হলে ব্যবসা সহজীকরণে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হবে। একই সঙ্গে ডিজিটাল অডিট ও স্বয়ংক্রিয় রিটার্ন ব্যবস্থার মাধ্যমে ভ্যাট প্রশাসনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং রাজস্ব আহরণ—তিন ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
