মঙ্গলবার ১৬ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২রা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

Advertise with us

মরা করতোয়ায় ১১২২ কোটি টাকার প্রকল্পের প্রস্তুতি

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ১৯ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

মরা করতোয়ায় ১১২২ কোটি টাকার প্রকল্পের প্রস্তুতি

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে করতোয়া নদীর দক্ষিণমুখী প্রবাহের মুখে নির্মিত একটি স্লুইচগেট বছরের পর বছর কার্যত বন্ধ। গেটের কারণেই বগুড়ামুখী অংশে নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। উৎসমুখে পানির পথ সংকুচিত হয়ে পড়ায় একসময় উত্তরবঙ্গের জীবনরেখা হিসেবে পরিচিত করতোয়া এখন দখল, দূষণ ও ভরাটের চাপে মৃতপ্রায়। নদীর প্রবাহ ফিরিয়ে আনার প্রশ্নে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগও নেই।

এদিকে সম্প্রতি করতোয়া পুনরুদ্ধার ও উন্নয়নের নামে ১ হাজার ১২২ কোটি টাকার নতুন প্রকল্প অনুমোদনের প্রস্তুতি চলছে। তবে পরিবেশ আন্দোলনকারীদের দাবি পানি প্রবাহ নিশ্চিত না করলে কোনো প্রকল্পই টিকবে না।

ওপারে স্রোত, এপারে মৃত নদী

গোবিন্দগঞ্জের করতোয়ার উৎসমুখ এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, স্লুইচগেটের উত্তর পাশে এখনো নদীর অস্তিত্ব স্পষ্ট। সেখানে পানির প্রবল প্রবাহ রয়েছে। কিন্তু গেটের দক্ষিণে বগুড়ামুখী অংশে নামতেই দৃশ্যপট বদলে যায়। কোথাও নদীর তলদেশ জেগে উঠেছে, কোথাও চর পড়েছে। আবার কোথাও নদীর জায়গা দখল করে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন স্থাপনা।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রবেশমুখে থাকা স্লুইচগেট কয়েক যুগ ধরে বন্ধ থাকায় ভাটির দিকে ১২৩ কিলোমিটার এলাকায় পর্যাপ্ত পানি পৌঁছায় না। ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ হারিয়ে গেছে। প্রবাহ না থাকায় নদীতে পলি জমেছে, কমেছে গভীরতা, বেড়েছে দখল।

গোবিন্দগঞ্জের প্রবীণ বাসিন্দা পাইলট স্কুলের শিক্ষক আলিম উদ্দিন বলেন, ‘কয়েক দশক আগেও শুকিয়ে যাওয়া করতোয়া নদীতে বড় বড় নৌকা চলত। আর এখন হেঁটেই পার হওয়া যায়।’

গেটের পাশের বাসিন্দা আকরাম হোসেন বলেন,‘একসময় এই নদীপথে খুলনা থেকে নৌকায় নারকেলসহ বিভিন্ন পণ্য আসত। নদী ঘিরে জেলেদের জীবিকাও গড়ে উঠেছিল। কিন্তু আশির দশকে বন্যা নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে উৎসমুখ এলাকায় বাঁধ ও স্লুইচগেট নির্মাণের পর নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ধীরে ধীরে নদীটির শীর্ণ দশা শুরু হয়।

ইতিহাসবিদদের মতে, প্রাচীন পুন্ড্রবর্ধন জনপদের বিকাশে এ নদীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। সরকারিভাবেও এই তথ্যের প্রমাণ মিলেছে। নতুন করে হাতে নেওয়া পুনঃখনন প্রকল্পের প্রস্তাবনায় উল্লেখ করা হয়েছে, করতোয়া মূলত পূর্ব তিস্তা নদীর তিনটি প্রধান শাখার একটি। ১৭৮৭ সালের ভয়াবহ বন্যার পর তিস্তার গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদী ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়। ফলে করতোয়ার মূল উৎস তিস্তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

জেলা নদী রক্ষা কমিটির সদস্য জিয়াউর রহমান বলেন, উৎস পরিবর্তনের পরও করতোয়া মৌসুমি বৃষ্টি, আঞ্চলিক জলপ্রবাহ ও প্রাকৃতিক সংযোগের মাধ্যমে টিকে আছে। কিন্তু বিভিন্ন স্থানে পানি নিয়ন্ত্রণ কাঠামো, ভরাট, দখল ও দূষণের কারণে নদীটির সংকট তীব্র হয়।

নদী ঘিরে দখলের প্রতিযোগিতা
পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ার পর সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে নদীর জমিতে। বগুড়া শহর, শিবগঞ্জ, মহাস্থান, শাজাহানপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় নদীর তীর ও তলদেশ দখল করে গড়ে উঠেছে দোকানপাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, স্থাপনা ও নানা অবকাঠামো। বহু স্থানে নদীর প্রস্থ সংকুচিত হয়ে গেছে। নদী শুকিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়েছে নদীর জায়গা দখলের প্রতিযোগিতা। একসময় যে জমি নদীর অংশ ছিল, এখন তার অনেকটাই ব্যক্তিগত ব্যবহার ও স্থাপনার আওতায় চলে গেছে।

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন বিভিন্ন সময়ে করতোয়া দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নিলেও এখনো নদীর অনেক গুরুত্বপূর্ণ অংশ বেদখল অবস্থায় রয়েছে। দখলের পাশাপাশি দূষণ এখন করতোয়ার আরেক বড় সংকট। বগুড়া শহরের বিভিন্ন এলাকার ড্রেনের ময়লা সরাসরি গিয়ে পড়ছে নদীতে। বাজারের বর্জ্য, প্লাস্টিক ও গৃহস্থালি আবর্জনাও নিয়মিতভাবে ফেলা হচ্ছে নদীতে। শুষ্ক মৌসুমে নদীর অনেক অংশে কালো পানি ও পচা বর্জ্যের স্তর দেখা যায়।

পরিবেশবাদীদের ভাষ্য, নদীতে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় স্বাভাবিক আত্মশোধন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে দূষণ জমে থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।

পরিবেশ আন্দোলন বগুড়া জেলার সভাপতি সাহাবুদ্দিন সৈকত বলেন, আশির দশকে এই স্লুইচগেটের কারণে নদীর উৎসমুখ বালুতে ভরাট হয়ে যায়। এরপর ধীরে ধীরে প্রবাহ কমতে থাকে। এখন আবার শহরের প্রায় সব ড্রেন গিয়ে পড়ছে নদীতে। দুর্গন্ধের কারণে অনেক জায়গায় নদীর পাড়ে দাঁড়ানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। এর কারণে প্রবাহ কমেছে, দখল বেড়েছে, দূষণ জমেছে। এই তিন সংকট একে অপরকে আরও তীব্র করছে।

নদী সংকটে রেখে প্রকল্প
করতোয়া পুনরুদ্ধারে গত এক যুগে একাধিক প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড করতোয়া, ইছামতি ও গজারিয়া নদী উন্নয়নে প্রায় ২ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব করে। পরে সংশোধিত আকারে প্রায় ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকার নতুন প্রস্তাব তৈরি হয়। কিন্তু বিভিন্ন জটিলতায় সেসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়নি। এরপর ২০২৪ সালে জেলা প্রশাসক অফিস সংলগ্ন এলাকায় ৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে পুনঃখনন, তীর সংরক্ষণ, ওয়াকওয়ে নির্মাণ ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ করে পাউবো। ১৭ কিলোমিটার নদী খননের পাশাপাশি নদীতীরে ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হয়। কিন্তু নদীর প্রবাহ ফেরেনি।

এদিকে বর্তমান সরকার করতোয়া পুনঃখননের জন্য ১ হাজার ১২২ কোটি টাকার নতুন প্রকল্প গ্রহণ করেছে। পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, একনেক সভায় প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হয়। এটি যাচাই বাছাইয়ের জন্য একটি কমিটি কাজ করছে। অনুমোদন হলে ২০৩০ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ করা হবে। প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২৩০ কিলোমিটার গতিপথ পুনঃখনন করা হবে। এরসঙ্গে ইছামতি ও গজারিয়া নদীর পানিপ্রবাহ উন্নয়নের উদ্যোগও রয়েছে।

প্রকল্পের জন্য ২৪ হেক্টর ভূমি অধিগ্রহণ, ছয় কিলোমিটার স্লোপ প্রটেকশন, সাড়ে তিন কিলোমিটার নদীতীর রক্ষা এবং প্রায় এক কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২৩ সালে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে বগুড়ার শিবগঞ্জ, সদর, শাজাহানপুর, দুপচাঁচিয়া, আদমদীঘি, গাবতলী, ধুনট, শেরপুর এবং গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলায়।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সচিব এস এম শাকিল আখতার জানান, মরা নদীটি থেকে এখন দুর্গন্ধ ছড়ায়। এতে এলাকার মানুষের শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। তাই মানুষের উপকারের জন্য প্রকল্পটি নেওয়া হচ্ছে। প্রকল্পের আওতায় নদীটি পুনঃখনন করে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনা হবে। নদীর দুই পাশে পাড় বেঁধে কিছু জায়গায় শিশুদের খেলার মাঠও তৈরি করা হবে।

বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান মাহমুদ বলেন, করতোয়ার সংকট শুধু একটি কারণে তৈরি হয়নি, দীর্ঘদিনের পলি জমা, উৎস পরিবর্তন, দখল, ভরাট ও দূষণের কারণে নদীর নাব্যতা কমেছে। নতুন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নদীর পানিধারণ ক্ষমতা বাড়বে এবং প্রবাহ উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। আর স্লুইচগেট খোলা অথবা সম্প্রসারণ করার ব্যাপারে তারাও মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছে।

আন্দোলনকারীরা যা বলছেন
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক ফজলে রাব্বি ডলার বলেন, নদীর প্রাণ যদি পানিপ্রবাহ হয়, তাহলে সেই প্রবাহ নিশ্চিত করার বিষয়টি কেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নেই? গোবিন্দগঞ্জের স্লুইচগেটের কারণে ভাটিতে প্রবাহ কমে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে এখন সবার আগে সমীক্ষা হওয়া দরকার। কারণ নদীর উৎসমুখে পানি পৌঁছানোর ব্যবস্থা না করে শুধু খনন করলে সেই নদী কোনোদিন টিকবে না। একইসঙ্গে শহরের মধ্যে বেদখল নদীভূমি উদ্ধার করা প্রয়োজন। কারণ পৃথিবীর কোনো নদী শুধু খননের মাধ্যমে বাঁচে না। নদী বাঁচে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ, দখলমুক্ত তীর এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে।

তিনি বলেন, শুধু এই করতোয়া রক্ষায় আমরা সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে ১২৩ কিলোমিটার দীর্ঘ মানববন্ধন করেছি। এখন সরকারকে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

Facebook Comments Box
Advertise with us

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

Advertise with us
আরও
Advertise with us

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

রবিসোমমঙ্গলবুধবৃহশুক্রশনি
 
১০১১১৩
১৫১৬১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
৩০ 

ফলো করুন দেশবার্তা-এর খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক
মো: সামসুদ্দীন চৌধুরী
সম্পাদকীয় কার্যালয়