মঙ্গলবার ৪ঠা আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২০শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

Advertise with us

২১ বছরের ইতিহাসে দুদকের কার্যক্রম অভিভাবকশূন্য, হাল ধরবে কে?

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   মঙ্গলবার, ০৪ আগস্ট ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ১০ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

২১ বছরের ইতিহাসে দুদকের কার্যক্রম অভিভাবকশূন্য, হাল ধরবে কে?

প্রায় নয় দশক আগে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘প্রশ্ন’ কবিতায় লিখেছিলেন ‘আমি যে দেখেছি প্রতিকারহীন শক্তের অপরাধে, বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে’। বিচারপ্রাপ্তিতে দীর্ঘসূত্রতা ও অবিচারের বেদনা তুলে ধরতে তিনি এই পংক্তি লিখেছিলেন বলে মনে করা হয়। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদেও আইনের আশ্রয় ও আইনানুগ বিচারপ্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ বিচারপ্রার্থীর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব।

তবে দেশে একটি স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন থাকা সত্ত্বেও দুর্নীতির শিকার হওয়া বিচারপ্রার্থীরা তাদের সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। দীর্ঘ প্রায় ৫ মাস ধরে দুর্নীতি দমন কমিশন বলতে দেশে আসলে ‘কার্যত’ কিছু নেই। সংস্থাটির মূল ভিত্তি একজন চেয়ারম্যানের নেতৃত্বাধীন ‘কমিশন’, সেটি গঠন করা যায়নি গত ৫ মাসেও। ফলে অভিভাবকহীন এ সংস্থা নখদন্তহীন বাঘে পরিণত হয়েছে। কোনো কাজে আসছে না।

প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ ২১ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে কমিশনশূন্য থাকায় দুদকের দুর্নীতি দমন কার্যক্রম একেবারেই মুখ থুবড়ে পড়েছে। এতে অপরাধীরা লাই পাচ্ছে আর বিচারপ্রার্থীরা বঞ্চিত হচ্ছেন।

এ বছরের ৩ মার্চ তৎকালীন চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন কমিশন পদত্যাগ করে। এর পর থেকে আজ পর্যন্ত (৪ আগস্ট) নতুন কমিশন গঠন করা সম্ভব হয়নি। ফলে দেশের প্রধান দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাটি এখন অভিভাবকশূন্য।

এই সময়ে দুর্নীতি ও অনিয়মের প্রায় ১৩ হাজার অভিযোগ জমা পড়েছে, যেগুলোর কোনো প্রতিকার মিলছে না। দিন দিন অভিযোগের স্তূপ আরও বেড়ে চলেছে। একই সঙ্গে আসামি গ্রেপ্তার, দুর্নীতিবিরোধী অভিযান, অপরাধ সংশ্লিষ্ট সম্পদ জব্দ কিংবা অপরাধীর বিদেশ যেতে নিষেধাজ্ঞা প্রদান– সবই কার্যত বন্ধ হয়ে আছে।

শুধু তাই নয়, এ পরিস্থিতিতে অনেক নিরপরাধ মানুষও ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। কমিশন থাকলে হয়ত এতদিনে তাদের অভিযোগ থেকে রেহাই পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু সেটি হয়নি, তারা ঝুলে আছেন অভিযুক্ত হিসেবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কমিশন গঠনের পর দীর্ঘ সময় কমিশনশূন্য থাকার ঘটনা এবারই প্রথম। যদিও এর আগেও দুদকের শুরুর দিকে ভিন্ন ভিন্ন কারণে প্রাতিষ্ঠানিক স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল। সেগুলো বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।

কমিশন গঠনের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে দুদকের নবনিযুক্ত সচিব মো. সাইদুর রহমান খান বলেন, আমি যতটুকু জানি সার্চ কমিটি মিটিং করে প্রায় ফাইনাল করে ফেলেছেন। এখন সরকারের পক্ষ থেকে যে প্রসিডিউর আছে, সেটা মেইনটেইন করে যতটুকু জানি খুব শিগগিরই কমিশন গঠন হবে।

তিনি আরও বলেন, আপনি নিশ্চয়ই জানেন যে সার্চ কমিটি কাজ করছে, সেখানে দুদকের কোনো প্রতিনিধি নেই। সুতরাং আমরা ভেতরের খবর জানি না, জানার কথাও না। এটুকু বলতে পারি প্রসিডিউর অলমোস্ট ফাইনাল স্টেজে আছে। আমরা খুব দ্রুত এটার ফলাফল পাবো।

২০০৪ সালের ২১ নভেম্বর প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন দুদকের প্রথম চেয়ারম্যান বিচারপতি সুলতান হোসেন খান থেকে সর্বশেষ মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন কমিশন পর্যন্ত মোট সাতটি কমিশন দায়িত্ব পালন করে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনসহ নানা জটিলতায় মাত্র তিনটি কমিশন পুরো মেয়াদ পূর্ণ করতে পেরেছিল। বাকি চার কমিশন মেয়াদ পূর্ণ করার আগে বিদায় নিতে হয়। সর্বশেষ মোমেন কমিশন মেয়াদ পূরণ না করেই বিদায় নিয়েছে।

সর্বশেষ কমিশনের কর্মকর্তাদের পদত্যাগের পাঁচ মাস অতিক্রান্ত হলেও দুদকে কমিশন গঠন না হওয়াকে খুবই অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুঃখজনক ঘটনা উল্লেখ করে দুদকের সাবেক মহাপরিচালক মইদুল ইসলাম বলেন, দুদকের মতো একমাত্র ক্ষমতাবান ও এখতিয়ারবান একটা প্রতিষ্ঠানকে পাঁচ মাস ধরে অচল করে রাখা হয়েছে। নিয়ম হচ্ছে, আগের কমিশন পদত্যাগের পর ৩০ দিনের মধ্যে শূন্য পদ পূরণ করতে হবে। যা সরকারের দায়িত্ব। সরকার এমন উদ্যোগ নিতে দেরি করছে। বাছাই কমিটির কার্যক্রমও ৩০ দিনের বেশি হয়ে গেছে। কেউই সময়ের দিকটা খেয়াল করছে না। বিধানটাকে কেউই পাত্তা দিচ্ছে না। যা আইনের লঙ্ঘন।

তিনি বলেন, কমিশন না থাকার ফলে দুর্নীতি দমনের সব কাজই বন্ধ। কমিশন ছাড়া সিদ্ধান্ত হবে না। আগের সিদ্ধান্তগুলোর আলোকে অনুসন্ধান বা তদন্ত কাজ চলছে। তবে যেহেতু কমিশন নাই সেজন্য ওইগুলোও ঢিলাঢালা কাজ হচ্ছে। কর্মকর্তারা প্রতিবেদন তৈরি করলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেউ নাই। সবদিক থেকে দুর্নীতি দমনের কাজ খুবই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ঘুষ গ্রহণের ফাঁদ মামলার কার্যক্রম বন্ধ, আসামি গ্রেপ্তার হচ্ছে না। নতুন অনুসন্ধানের কাজ হচ্ছে না। এমনকি কোনো আসামির জামিন যদি হয়, তার বিরুদ্ধে আপিলে করার সিদ্ধান্ত পর্যন্ত নেয়ার উপায় নেই। কাজেই সব দিক থেকেই দুর্নীতি দমন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আর যারা দুর্নীতি করেছে তারা ফাঁকফোকর দিয়ে বের হয়ে যাবে। কাজেই এখানে দুর্নীতিবাজরা লাভবান হচ্ছে। এর ফলে আলটিমেটলি আমাদের দুর্নীতির ধারণা সূচকে অবস্থান ভালো করার সুযোগটা আমরা হাতছাড়া করছি।

এদিকে, নতুন কমিশন গঠনের প্রত্যাশা সম্পর্কে জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দুদক আইন, ২০০৪ অনুযায়ী কমিশন গঠনের লক্ষ্যে যে সার্চ কমিটি গঠিত হয়েছে, তা নিয়ে কিছু আইনি প্রশ্ন রয়েছে। দুদকের প্রতি জনমানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে রাজনৈতিক বা দলীয় বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা জরুরি। যদিও ক্ষমতাসীনদের কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিরাই সাধারণত নিয়োগ পেয়ে থাকেন। তবুও এমন ব্যক্তিদের বেছে নেওয়া উচিত, যারা দলীয় বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করার সৎ সাহস রাখেন। নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের অবশ্যই দুর্নীতিমুক্ত, দক্ষ এবং অতীতে যেকোনো ধরনের ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’বা স্বার্থের দ্বন্দ্বমুক্ত থেকে কাজ করার ট্র্যাক রেকর্ড থাকতে হবে। বিশেষ করে দুদকের শীর্ষ পদ তিনটির জন্য এমন যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তি প্রয়োজন, যারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন ও কঠোর অবস্থান নিতে পারেন।

গত ২২ জুন দুদকের চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগে আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. রেজাউল হককে সভাপতি করে সার্চ কমিটি গঠিত হওয়ার পর আবেদন আহ্বান করলে তিন শতাধিক বায়োডাটা জমা নেওয়া হয়। যেখানে সাবেক আমলা, সাবেক সেনা কর্মকর্তা, আইনজীবী ও বিচার বিভাগের বেশকিছু নাম আলোচনায় রয়েছে। যদিও নিয়োগের আলামত নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কমিশন গঠিত না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করে নাম প্রকাশ না করে দুদকের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, কমিশন নেই পাঁচ মাস হলো। কমিশন না থাকলে দুদকে কোনো কাজ হবে না, এটাই স্বাভাবিক। কারণ সব সিদ্ধান্ত দেয় কমিশন। দুদকের ইতিহাসে এত দীর্ঘদিন চেয়ারম্যান ও কমিশনার অনুপস্থিত ছিল না। যত দ্রুত সম্ভব কমিশন গঠন জরুরি। সার্চ কমিটি গঠন হতেই চার মাস লেগেছে। এরপরও পেরিয়ে গেছে আরও এক মাস। স্বাভাবিকভাবেই সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

কমিশন গঠন প্রক্রিয়ায় আলোচনায় যারা

নতুন কমিশনে চেয়ারম্যান ও কমিশনার পদে গত পাঁচ মাস ধরে সাবেক আমলা, বিচারপতি কিংবা অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের নাম ঘুরেফিরে আলোচনায় এসেছে। যদিও সার্চ কমিটির সুপারিশের আলোকে প্রেসিডেন্ট চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। সার্চ কমিটি প্রতিটি পদের বিপরীতে দুটি নাম সুপারিশ করবে। যেখান থেকে রাষ্ট্রপতি তিনজনকে নিয়োগ দেবেন।

দুদক, জনপ্রশাসন ও জুডিশিয়াল সার্ভিস সূত্রে পাওয়া তথ্যানুসারে, চেয়ারম্যান ও কমিশনার হিসেবে শুরু থেকে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৩ এর সাবেক বিচারক মোতাহার হোসেনের নাম। সর্বশেষ পাওয়া তথ্যানুসারে এখনও আলোচনার প্রথম সারিতে তিনি আছেন।

এছাড়া বিচারালয় থেকে সাবেক বিচারপতি আসাদুজ্জামান, সাবেক সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ ড. আবুল হোসেন খন্দকার ও সাবেক জেলা জজ রুহুল ‍কুদ্দুসের নামও আলোচিত হচ্ছে জোরেশোরে।

এর মধ্যে সাবেক বিচারক মোতাহার হোসেন ঢাকা মহানগর আদালতে সিনিয়র স্পেশাল জজ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিশেষ আদালতের বিচারক হিসেবে তিনি দুর্নীতি, আর্থিক অপরাধ এবং রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ মামলার বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। প্রসঙ্গত, ২০১৩ সালে বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে করা বিদেশে অর্থপাচার সংক্রান্ত দুর্নীতি মামলার রায় ঘোষণা করেন। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় রায়ে তাকে বেকসুর খালাস দেন। মোতাহার হোসেনের বিরুদ্ধেও দুদকে অনুসন্ধান ছিল। পরে তা নিষ্পত্তি হয়।

আলোচনায় আসা সাবেক সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ ড. আবুল হোসেন খন্দকার একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ২ নম্বর সেক্টরে সম্মুখ সমরে অংশ নেন। পেশাগত জীবনে ১৯৮৪ সালে বিসিএস (জুডিশিয়ারি) ক্যাডারে যোগ দেন। অবসরে যান ২০২০ সালে। পারিবারিকভাবে বিএনপি রাজনীতির সংশ্লিষ্টতা থাকায় আওয়ামী সরকারের সময় রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কর্মজীবনে তিনবার পদোন্নতিও বঞ্চিত হয়েছেন। বিগত সরকারের সময় নবাবগঞ্জের পৈতৃক বাসভবন থেকেও তার পরিবারকে তৎকালীন প্রভাবশালী সালমান এফ রহমানের নির্দেশে উচ্ছেদ করা হয়েছিল বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়।

অন্যদিকে সাবেক আমলাদের মধ্যে অবসরপ্রাপ্ত সাবেক মুখ্য সচিব এ এস এম আব্দুল হালিম, সাবেক সচিব আবদুল বাকি (বাকী বিল্লাহ), সাবেক সচিব আবু বকর মো. শাহজাহান, বর্তমান মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনি কিংবা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব আবদুস সাত্তারের নামও বেশ আলোচিত হচ্ছে বলে জানা গেছে।

এদের মধ্যে এ এস এম আব্দুল হালিম কৃষি মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিপরিষদের সাবেক সচিব হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ২০০৫-০৬ সালে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ছিলেন। এর আগে পাট মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয় এবং তদানীন্তন সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

আর বাকী বিল্লাহ ১১তম ব্যাচের বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা। তিনি রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে ২০২৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সচিব পদমর্যাদায়) হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন বলে জানা গেছে।

আবু বকর মো. শাহজাহান প্রশাসন ক্যাডারের ১৯৮২ ব্যাচের কর্মকর্তা। তিনি বিআরটিএ‘র চেয়ারম্যানসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘদিন পদোন্নতি বঞ্চিত ও বৈষম্যের শিকার হওয়ার কারণে ২০২৫ সালে তাকে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দিয়ে সচিব ও সিনিয়র সচিব করা হয় বলে জানা গেছে।

মুখ্য সচিব আবদুস সাত্তার বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এবং চেয়ারম্যান তারেক রহমানের একান্ত সচিব হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। বগুড়ায় জন্ম নেওয়া এই সচিব ১৯৮২ সালে সিভিল সার্ভিসে কর্মজীবন শুরু করেন। চাকরিজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি সচিব, অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্ম সচিব হিসেবে জনপ্রশাসন, শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করেন।

অন্যদিকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনি এর আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ছিলেন। তিনি বিসিএস ১৯৮২ ব্যাচের প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৩ সালে তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের আগস্টে পটপরিবর্তনের পর তাকে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের জনবিভাগের সচিব এবং পরে স্বরাষ্ট্র সচিব করা হয়।

এছাড়া আলোচনায় আছেন সাবেক সচিব আবদুস সবুর ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব তাহসিনুর রহমান, ফাইনান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের (এফআরসি) চেয়ারম্যান ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন।

সেনাবাহিনীর প্রধান ও ব্রিগেডিয়ার পদমর্যাদার সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তার নামও রয়েছে আলোচনার টেবিলে। এছাড়া দুদকের সাবেক কমিশনার মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দী, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও দুদকের সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) প্রশাসন ক্যাডার মুনীর চৌধুরীর নাম এসেছে কোথাও কোথাও।

যদিও দুদক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, যাদের নাম শোনা যায়, তাদের কমিশনে আনা হয় না। বরাবরের মতো প্রশাসন ক্যাডারও তাদের প্রভাব ধরে রাখবে বলেই মনে হচ্ছে।

সার্চ কমিটির নিয়োগ কার্যক্রম

দুদক আইন, ২০০৪-এর ধারা ৭ অনুযায়ী কমিশনার পদে নিয়োগের জন্য গত ২২ জুন সার্চ কমিটি গঠন করা হয়। আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. রেজাউল হককে সার্চ কমিটির সভাপতি করা হয়। সদস্য হিসেবে রয়েছেন হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি রাজিক আল জলিল, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি), সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিব।

আইন অনুযায়ী, সার্চ কমিটি দুদকের চেয়ারম্যান ও কমিশনারের প্রতিটি শূন্য পদের বিপরীতে ন্যূনতম দুইজন করে প্রার্থীর নামের তালিকা প্রস্তুত করে রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করবে। পরে রাষ্ট্রপতি সেখান থেকে চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগ দেবেন।

সার্চ কমিটির কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় প্রথমবারের মতো নিয়োগের জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। গত ২ জুলাই থেকে আবেদন জমা নেওয়া হয় এবং জমা দেওয়ার শেষ দিন ছিল ১৩ জুলাই। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, চেয়ারম্যান ও কমিশনার পদে নিয়োগের জন্য তিন শতাধিক আবেদন জমা হয়। আবেদনকারীদের মধ্যে রয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, সাবেক সচিব, অবসরপ্রাপ্ত সামরিক ও সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আইনজীবী, প্রশাসনের অভিজ্ঞ কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন পেশাজীবী।

সর্বশেষ পাওয়া তথ্যানুসারে প্রাথমিকভাবে যাচাই-বাছাই করে ১৮-২০ জনের সংক্ষিপ্ত তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানা যায়, সার্চ কমিটি প্রার্থীদের পেশাগত অভিজ্ঞতা, সততা, প্রশাসনিক দক্ষতা, দুর্নীতি দমনের বিষয়ে অবস্থান, নেতৃত্বের সক্ষমতা এবং জনস্বার্থে কাজের রেকর্ডসহ বিভিন্ন বিষয় যাচাই-বাছাই করছে।

চলতি বছরের ১৫ জুন জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দুদক গঠনে সার্চ কমিটি গঠনের বিষয়টি অবহিত করেছিলেন।

দুদক আইনে চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগ, তাদের মেয়াদ এবং অপসারণ সংক্রান্ত বিষয়গুলো সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে। আইনের ৫ (১) ও (২) ধারায় কমিশন একজন চেয়ারম্যান এবং দুইজন কমিশনারের সমন্বয়ে গঠিত হবে। ২০০৪ সালের মূল আইন অনুসারে কমিশনের সদস্য সংখ্যা তিনজন।

আইনের ৬ ধারা অনুযায়ী সার্চ কমিটির সুপারিশের প্রেক্ষিতে চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের নিয়োগ দেবেন রাষ্ট্রপতি। যার মেয়াদ হবে ৫ বছর।

যোগ্যতার বিষয়ে বলা হয়েছে, আইনের ধারা-৮ অনুযায়ী, চেয়ারম্যান বা কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পেতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সততা, সুনাম ও পেশাগত দক্ষতার অধিকারী হতে হবে। প্রশাসন, বিচার বিভাগ, আইন, পুলিশ, রাজস্ব, হিসাব নিরীক্ষা বা সমজাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ২০ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের মধ্য থেকে নিয়োগ দেওয়ার কথা বলা হয়। যদিও নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে দণ্ডিত কোনো ব্যক্তি এ পদে নিয়োগের যোগ্য হবেন না। আর আইনের ১০ ধারায় চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের পদত্যাগ বা অপসারণ ও ১১ ধারায় শূণ্য পদে ৩০ দিনের মধ্যে নিয়াগ দানের বিষয়টি বলা আছে।

দুদকের ইতিহাস

এক সময়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন ‘দুর্নীতি দমন ব্যুরো’ বিলুপ্ত করে ২০০৪ সালের ২১ নভেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয় স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন। প্রথম চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সুলতান হোসেন খান। চার বছরের মেয়াদ পূরণের আগেই ২০০৭ সালে ‘এক-এগারোর’ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে পদত্যাগ করে তাকে চলে যেতে হয়।

২০০৭ সালেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সাবেক সেনাপ্রধান হাসান মশহুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে পুনর্গঠিত হয় কমিশন। তৎকালীন সময়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে সরব হতে দেখা গেছে। তার সময়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দুই নেত্রীসহ শীর্ষ অধিকাংশ রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীকে দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার করে আলোচনার জন্ম দিয়েছিলেন। দুর্নীতি বিরোধী এমন ভূমিকায় সমালোচনা ও বিতর্ক তৈরি করে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালের ২রা এপ্রিল চৌধুরীকে পদত্যাগ করেন। অর্থাৎ মেয়াদ পূরণের আগেই ফিরে যেতে হয়।

এরপর ২০০৯ সালে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান সাবেক সচিব গোলাম রহমান। তৎকালীন সময়ে চার বছরের মেয়াদ শেষে তিনি ২০১৩ সালের ২৩ জুন দায়িত্ব শেষ করেন। তার সময়ে আলোচিত হলমার্ক কেলেঙ্কারি, ডেসটিনি কেলেঙ্কারি, পদ্মা সেতুর দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে কাজ হয়েছিল। অনেকটাই সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা সংস্থাটির চেয়ারম্যান গোলাম রহমানের আলোচিত বক্তব্য ছিল দুদককে নখ-দন্তহীন বাঘের সঙ্গে তুলনা করা।

গোলাম রহমানের পর দুদক কমিশনার মো. বদিউজ্জামানকে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রথমে ভারপ্রাপ্ত হিসাবে ও পরবর্তীতে ২০১৩ সালের ২৬ জুন তাকে পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তার স্থলে দুদকের কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন আহমেদকে।

২০১৬ সালের ১৩ মার্চ পর্যন্ত দুদক চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন বদিউজ্জামান। তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক ছিলেন। বিলুপ্ত দুর্নীতি দমন ব্যুরোর মহাপরিচালকও ছিলেন।

এরপর ২০১৬ সালের মার্চে নিয়োগ পান অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ সচিব ইকবাল মাহমুদ। ২০১৬ সালের ১০ মার্চ যোগ দিয়ে ২০২১ সালের ১৪ মার্চ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ওই কমিশনের দুর্নীতির আসামিদের গ্রেপ্তারের বড় অভিযান করা হয়েছিল।

ইকবাল মাহমুদের মেয়াদ শেষে ২০২১ সালের মার্চে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পান সাবেক সচিব মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ। তার সঙ্গে কমিশনার হিসেবে যোগ দেন সাবেক জেলা জজ মো. জহুরুল হক। আর ইকবাল মাহমুদের কমিশনের সঙ্গে নিয়োগ পাওয়া কমিশনার মোজাম্মেল হক খানের মেয়াদ পূর্ণ হলে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সে পদে স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন সাবেক সচিব মোছা. আছিয়া খাতুন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মাত্র তিন মাসে আওয়ামী লীগের প্রায় দেড় শতাধিক মন্ত্রী, এমপি ও আমলার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে আস্থায় আসার চেষ্টা ছিল ওই কমিশনের। অথচ তার আমলে প্রায় দুই শতাধিক আওয়ামী মন্ত্রী, এমপিকে দায়মুক্তি দেন বলে জানা গেছে। তবে শেষ রক্ষা হয়নি, ৩০ অক্টোবর দুপুর ২টার দিকে তারা পদত্যাগ করেন।

সর্বশেষ ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর পাঁচ বছরের মেয়াদে দুদক চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান। তার সঙ্গেই কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পাওয়া মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী ১১ ডিসেম্বর এবং হাফিজ আহসান ফরিদ ১৫ ডিসেম্বর দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর মোমেন কমিশন নিয়ে নানা গুঞ্জন ছিল। শেষ পর্যন্ত ১৫ মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করে পুরো কমিশন।

Facebook Comments Box
Advertise with us
Advertise with us
আরও
Advertise with us

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

রবিসোমমঙ্গলবুধবৃহশুক্রশনি
 
১০১১১৩১৫
১৬১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭
৩০৩১ 

ফলো করুন দেশবার্তা-এর খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক
মো: সামসুদ্দীন চৌধুরী
সম্পাদকীয় কার্যালয়