সোমবার ১৮ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৪ঠা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

Advertise with us

সংকটে ২০ ব্যাংক, মূলধন ঘাটতি ২ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   সোমবার, ১৮ মে ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ১৬ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

সংকটে ২০ ব্যাংক, মূলধন ঘাটতি ২ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা

অনিয়ন্ত্রিত ঋণ বিতরণ, দুর্বল তদারকি আর লাগামহীন লুটপাটের কারণে দেশের ব্যাংক খাতে মূলধন সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। পরিস্থিতি এমন উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, একের পর এক ব্যাংক আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রয়োজনীয় মূলধন ধরে রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে। এর সঙ্গে খেলাপি ঋণের লাগামহীন বৃদ্ধি এই সংকটকে আরও বিপজ্জনক পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর প্রান্তিক শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত, বিশেষায়িত ও বেসরকারি মিলিয়ে দেশের মোট ২০টি ব্যাংক বড় ধরনের মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে। এসব ব্যাংকের সম্মিলিত মূলধন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা।

যদিও তিন মাস আগে পরিস্থিতি আরও নাজুক ছিল। একই বছরের সেপ্টেম্বর প্রান্তিক শেষে মূলধন ঘাটতিতে থাকা ব্যাংকের সংখ্যা ছিল ২৩টি এবং সম্মিলিত ঘাটতি ছিল ২ লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকা। সেই তুলনায় শেষ প্রান্তিকে ঘাটতির পরিমাণ কিছুটা কমেছে। তবে অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকারদের মতে, এটি ব্যাংক খাতের প্রকৃত কোনো উন্নতি নয়; বরং নীতিগত বিশেষ সহায়তার কারণেই কাগজে-কলমে এই ঘাটতি কিছুটা কম মনে হচ্ছে।

একটি ব্যাংকের নিজস্ব মূলধন ও সংরক্ষিত তহবিল যখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত ন্যূনতম সীমার নিচে নেমে যায়, তখন তাকে মূলধন ঘাটতি বলা হয়। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, ব্যাংকের ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ মূলধন সংরক্ষণ করা আইনি বাধ্যবাধকতা।

তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ খাতের চরম ভঙ্গুর চিত্র ফুটে উঠেছে। ব্যাংক খাতের আর্থিক সক্ষমতার প্রধান সূচক ক্যাপিটাল টু রিস্ক ওয়েটেড অ্যাসেটস রেশিও বা সিআরএআর গত ডিসেম্বর শেষে ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে নেমে এসেছে। অথচ আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মানদণ্ড অনুযায়ী, এই হার ন্যূনতম ১২ দশমিক ৫ শতাংশ থাকা বাধ্যতামূলক।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ভয়াবহ মূলধন সংকটের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ লাগামহীন খেলাপি ঋণ। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের মোট বিতরণকৃত ঋণের রেকর্ড ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। বিপুল এই খেলাপি ঋণের কারণেই ব্যাংকগুলো তাদের প্রয়োজনীয় মূলধন সংরক্ষণে ব্যর্থ হচ্ছে।

ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ অনুমোদন, আগ্রাসী ঋণ বিতরণ, দুর্বল পরিচালনা ব্যবস্থা এবং খেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণেই ব্যাংক খাতে আজ এই বিপর্যয় নেমে এসেছে। একের পর এক ঋণ কেলেঙ্কারি ও লুটপাটের কারণে অনেক ব্যাংক ভেতর থেকে একবারে দুর্বল হয়ে পড়েছে, যার ফলে তারা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ন্যূনতম মূলধন সংরক্ষণে ব্যর্থ হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর প্রান্তিক শেষে দেশের চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মোট মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৭ হাজার ৩৬৪ কোটি ৮২ লাখ টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি জনতা ব্যাংকের, যার পরিমাণ ২২ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা। এছাড়া অগ্রণী ব্যাংকের ৬ হাজার ৫৩৪ কোটি টাকা, রূপালী ব্যাংকের ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা এবং বেসিক ব্যাংকের ঘাটতি ৪ হাজার ১৫৮ কোটি টাকা।

একই সময়ে ইসলামী ধারার সাতটি ব্যাংকের মোট মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭৪ হাজার ৫৭ কোটি টাকা। এই ধারার ব্যাংকগুলোর মধ্যে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ঘাটতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক, যার পরিমাণ ৬৪ হাজার ১৬২ কোটি টাকা। এছাড়া সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ৩০ হাজার ৫৩ কোটি টাকা, ইউনিয়ন ব্যাংকের ২৯ হাজার ৬৫৩ কোটি টাকা, এক্সিম ব্যাংকের ২৫ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ১৫ হাজার ৬৯৩ কোটি টাকা, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের ৬ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা এবং আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ১২ কোটি টাকা।

রাষ্ট্রায়ত্ত ও ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি বেসরকারি খাতের সাতটি ব্যাংকেও বড় ধরনের মূলধন সংকট দেখা দিয়েছে। গত ডিসেম্বর প্রান্তিক শেষে এই সাত ব্যাংকের মোট মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ১৩৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি রয়েছে ন্যাশনাল ব্যাংকের, যার পরিমাণ ৯ হাজার ৩২ কোটি টাকা। এছাড়া এবি ব্যাংকের ৬ হাজার ৫৫১ কোটি টাকা, পদ্মা ব্যাংকের ৫ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা, প্রিমিয়ার ব্যাংকের ৪ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা, আইএফআইসি ব্যাংকের ৪ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ২ হাজার ৬৫ কোটি টাকা এবং সিটিজেনস ব্যাংকের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৮১ কোটি ৭০ লাখ টাকা।

অন্যদিকে, বিশেষায়িত খাতের দুটি সরকারি ব্যাংকও বড় অঙ্কের মূলধন সংকটে ভুগছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা এবং রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ঘাটতি ২ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা।

তবে তিন মাসের ব্যবধানে ব্যাংকিং খাতে সামগ্রিক মূলধন ঘাটতি কিছুটা কমার পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ পুনঃতফসিল নীতি।

অর্থনীতিবিদদের মতে, পুনঃতফসিল বা বিশেষ নীতিমালার মাধ্যমে কাগজে-কলমে পরিস্থিতির সাময়িক উন্নতি দেখানো গেলেও ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক স্বাস্থ্যের কোনো পরিবর্তন হয় না। খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর ও কঠোর আইনি পদক্ষেপ ছাড়া এই গভীর সংকট থেকে উত্তরণ কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

এদিকে ব্যাংকাররা সতর্ক করে বলেছেন, ক্রমাগত মূলধন সংকটের কারণে ব্যাংকগুলোর নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। এর ফলে দেশের বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্পায়ন বাধাগ্রস্ত হওয়াসহ সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা নেমে আসতে পারে। পাশাপশি, আন্তর্জাতিক লেনদেন ও বৈদেশিক অর্থায়নের ক্ষেত্রেও দেশের ব্যাংকগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা কমে নতুন চাপ তৈরি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পুনঃতফসিলের মাধ্যমে খেলাপি ঋণের একটি অংশ নিয়মিত দেখানো হয়েছে। এতে এসব ঋণের বিপরীতে প্রভিশন বা সঞ্চিতি সংরক্ষণের প্রয়োজন কমেছে। যেহেতু মূলধন থেকেই প্রভিশন রাখতে হয়, তাই চাপ কমায় মূলধন ঘাটতিও কিছুটা কমেছে।

Facebook Comments Box
Advertise with us
Advertise with us
Advertise with us

ফলো করুন দেশবার্তা-এর খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক
মো: সামসুদ্দীন চৌধুরী
সম্পাদকীয় কার্যালয়