মঙ্গলবার ৭ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৩শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম
শনিবারের মধ্যে সব ক্লিনিকে লেবার রুম স্থাপন না করলে লাইসেন্স বাতিল: স্বাস্থ্যমন্ত্রী কক্সবাজারে পাহাড়ধসের বিভীষিকা, একরাতেই প্রাণ গেল ৯ জনের জনগণের বিশ্বাস ও ভালোবাসার ওপর নির্ভরতা বজায় রাখতে চাই: প্রধানমন্ত্রী সরকারি অনুষ্ঠানের ব্যানার-বিলবোর্ডে প্রধানমন্ত্রীর থ্রিডি ছবি ব্যবহার নিষিদ্ধ শাহ আমানতে কার্গো ফ্লাইট চালুর উদ্যোগে ভাটা পড়েছে জুলাই অভ্যুত্থানে হতাহতদের ন্যায়বিচার এদেশের মাটিতেই হবে : প্রধানমন্ত্রী বেনাপোল কাস্টম হাউসে ৪ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা রাজস্ব ঘাটতি জুলাই-আগস্টে দেশে রয়েছে বন্যার আশঙ্কা রংপুরে সড়ক দুর্ঘটনা: দাদা-বাবার ১০ ঘণ্টা পর না ফেরার দেশে চলে গেল বন্ধন রপ্তানি আয়ে লক্ষ্য পূরণ হয়নি,কমেছে আয়
Advertise with us

ব্যাংকে টাকা রাখবেন, নাকি বাসায় নগদ রাখবেন—বর্তমান বাস্তবতায় কোনটি বেশি নিরাপদ?

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ৮৪ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

ব্যাংকে টাকা রাখবেন, নাকি বাসায় নগদ রাখবেন—বর্তমান বাস্তবতায় কোনটি বেশি নিরাপদ?

দেশের ব্যাংক খাত, মূল্যস্ফীতি ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে চায়ের আড্ডা—সবখানেই এখন একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, “টাকা কোথায় নিরাপদ—ব্যাংকে, নাকি বাসায়?”

বিশেষ করে কয়েকটি দুর্বল ব্যাংকের তারল্য সংকট, উচ্চ খেলাপি ঋণ, বাজারে নগদ টাকার ঘাটতি, ঈদ সামনে রেখে ব্যাংকগুলোতে অর্থ উত্তোলনের চাপ এবং মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। অনেকে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে বাসায় রাখছেন, আবার কেউ কেউ ব্যাংকের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।

তবে অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হলেও আতঙ্কের মতো নয়। বরং বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “সব টাকা বাসায় তুলে রাখা” যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি “চোখ বন্ধ করে যেকোনো ব্যাংকে টাকা রাখাও” বুদ্ধিমানের কাজ নয়। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—ঝুঁকি বুঝে সচেতনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া।

কেন বাড়ছে মানুষের উদ্বেগ

গত কয়েক বছরে দেশের ব্যাংক খাতে একের পর এক অনিয়ম, উচ্চ খেলাপি ঋণ, দুর্বল ব্যাংকের তারল্য সংকট এবং কিছু ব্যাংকে গ্রাহকদের টাকা উত্তোলনে সীমাবদ্ধতার খবর মানুষের আস্থায় বড় ধাক্কা দিয়েছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংকে টাকা রেখে যে সুদ পাওয়া যাচ্ছে, তা মূল্যস্ফীতির তুলনায় কম। ফলে ব্যাংকে টাকা রেখেও প্রকৃত অর্থে সঞ্চয়ের মূল্য কমে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সাধারণ মানুষ।

অপরদিকে, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ডলার বাজারের চাপ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজবও মানুষের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে “ব্যাংকে টাকা নেই” বা “নগদ সংকট” ধরনের খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে।

ঈদের আগে নগদ টাকার চাপ বাড়ছে

পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে বাজারে নগদ টাকার চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। গরুর হাটে বড় অঙ্কের নগদ লেনদেন, শ্রমিকদের বেতন-বোনাস পরিশোধ এবং ব্যক্তিগত খরচ বৃদ্ধির কারণে ব্যাংকগুলোতে নগদ উত্তোলনের চাপ তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এবার ঈদের আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংক টাঁকশালের কাছে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকার নতুন নোট চেয়েছিল। তবে কাগজ ও কালি সংকটের কারণে সর্বোচ্চ আট হাজার কোটি টাকার নোট সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, এটি মূলত “ছাপানো নোটের সংকট”, “তারল্য সংকট” নয়। অর্থাৎ ব্যাংক ব্যবস্থায় সামগ্রিক অর্থের ঘাটতি তৈরি হয়নি; বরং বাজারে পর্যাপ্ত নতুন ও ফ্রেশ নোট সরবরাহে সমস্যা হচ্ছে।

বর্তমানে দেশে মোট মুদ্রার পরিমাণ প্রায় ২৪ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে ছাপানো নগদ টাকার পরিমাণ প্রায় সাড়ে তিন লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি। ঈদের সময় সাধারণত এই নগদ চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায়।

কেন নতুন নোটের সংকট

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বঙ্গবন্ধুর ছবিযুক্ত পুরোনো নকশার নোটের পরিবর্তে নতুন ডিজাইনের নোট বাজারে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে নতুন নোটের নকশা, কাগজ ও কালি সংগ্রহ এবং ছাপানোর পুরো প্রক্রিয়ায় সময় লাগছে।

ফলে দীর্ঘ সময় ধরে পুরোনো নকশার নোট বাজারে ছাড়া হয়নি। এতে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে।

যদিও বর্তমানে সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনে বঙ্গবন্ধুর ছবিযুক্ত প্রায় ১৫ হাজার ৮০০ কোটি টাকার অর্ধপ্রস্তুত নোট মজুত রয়েছে। চাইলে সেগুলো দ্রুত বাজারে ছাড়া সম্ভব। কিন্তু আপাতত কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেসব নোট ছাড়তে অনাগ্রহী।

কলমানি সুদহার ১১ শতাংশ ছাড়িয়েছে

নগদ টাকার বাড়তি চাহিদার প্রভাব পড়েছে আন্তব্যাংক মানি মার্কেটেও। সাম্প্রতিক সময়ে আন্তব্যাংক কলমানি সুদহার ১১ শতাংশ অতিক্রম করেছে।

ব্যাংকাররা বলছেন, ঈদের আগে নগদ উত্তোলন বৃদ্ধি এবং ট্রেজারি বিলের বিপরীতে বড় অঙ্কের অর্থ পরিশোধের কারণে ব্যাংকগুলোর ওপর চাপ বেড়েছে। ফলে স্বল্পমেয়াদি অর্থের চাহিদা বাড়ছে।

তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। প্রয়োজনে রেপো সুবিধার মাধ্যমে তারল্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

বাসায় নগদ টাকা রাখা কতটা নিরাপদ

বিশেষজ্ঞদের মতে, আতঙ্কে ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের টাকা তুলে বাসায় রাখা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর একটি হতে পারে।

কারণ বাসায় নগদ টাকা রাখলে—

চুরি, ডাকাতি বা অগ্নিকাণ্ডে পুরো অর্থ হারানোর ঝুঁকি থাকে;

কোনও ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক বা আইনি সুরক্ষা থাকে না;

দীর্ঘদিন পড়ে থাকলে মূল্যস্ফীতির কারণে টাকার ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়;

জরুরি প্রয়োজনে বড় অঙ্কের নগদ ব্যবস্থাপনা কঠিন হয়ে পড়ে;

মানসিক চাপ ও নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়ে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধও বাড়ছে। অনেক সময় পরিচিতজনের মাধ্যমেও বাসায় নগদ অর্থ বা স্বর্ণ থাকার তথ্য ফাঁস হয়ে যাচ্ছে। শহরাঞ্চলে বাসাবাড়িতে বড় অঙ্কের নগদ অর্থ রাখার ঝুঁকি আগের চেয়ে বেড়েছে বলেও মনে করছেন তারা।

তাহলে কি ব্যাংকই সবচেয়ে নিরাপদ?

ব্যাংকারদের মতে, সব ব্যাংককে একইভাবে দেখা ঠিক নয়। দেশের সব ব্যাংক সংকটে নেই। এখনও অধিকাংশ ব্যাংক নিয়মিত লেনদেন করছে এবং গ্রাহকদের আমানত নিরাপদ রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তুলনামূলক শক্তিশালী, ভালো আর্থিক ভিত্তিসম্পন্ন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারিতে থাকা ব্যাংকে টাকা রাখা এখনও সবচেয়ে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত।

কারণ—

ব্যাংকে অর্থের একটি প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা থাকে; ডিজিটাল লেনদেন সহজ হয়; চুরি বা দুর্ঘটনায় পুরো অর্থ হারানোর ঝুঁকি কম; সুদ বা মুনাফা পাওয়া যায়; দীর্ঘমেয়াদে অর্থ ব্যবস্থাপনা সহজ হয়।

তবে তারা এটাও বলছেন, একটি ব্যাংকে সব টাকা না রেখে একাধিক ব্যাংকে ভাগ করে রাখা ভালো। বিশেষ করে বড় অঙ্কের সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে ঝুঁকি ভাগ করা গুরুত্বপূর্ণ।

কোন ব্যাংক বেছে নেবেন

অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংকে টাকা রাখার আগে কয়েকটি বিষয় খেয়াল করা জরুরি— ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদন; খেলাপি ঋণের হার; দীর্ঘদিনের সুনাম; তারল্য সক্ষমতা; বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি পরিস্থিতি; গ্রাহকসেবার মান।

সরকারি ব্যাংকের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় সমর্থনের কারণে সাধারণ মানুষের আস্থা তুলনামূলক বেশি। আবার কিছু বেসরকারি ব্যাংকও শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তির কারণে নিরাপদ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

নগদ কতটা রাখা উচিত

বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরো অর্থ কখনও বাসায় রাখা উচিত নয়। তবে জরুরি প্রয়োজনে কিছু নগদ অর্থ হাতে রাখা বাস্তবসম্মত।

তাদের পরামর্শ হলো— এক থেকে তিন মাসের প্রয়োজনীয় খরচের সমপরিমাণ নগদ বা সহজে উত্তোলনযোগ্য অর্থ রাখা যেতে পারে; বাকি অর্থ ব্যাংক, সঞ্চয়পত্র বা অন্যান্য নিরাপদ বিনিয়োগ মাধ্যমে রাখা ভালো; ডিজিটাল ব্যাংকিং ও মোবাইল আর্থিক সেবা ব্যবহারের পরিমাণ বাড়ানো উচিত।

মানুষের মনস্তত্ত্বেও পরিবর্তন

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময় মানুষ দৃশ্যমান নগদ অর্থের ওপর বেশি নির্ভর করতে চায়। হাতে টাকা থাকলে মানসিকভাবে নিরাপদ মনে হয়।

কিন্তু বাস্তবে সেটি সবসময় নিরাপদ নয়। বরং গুজব বা আতঙ্কে হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেওয়া অনেক সময় ক্ষতির কারণ হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো তথ্য যাচাই না করে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।

কী বলছেন অর্থনীতিবিদরা

অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের ব্যাংক খাতে সংস্কার জরুরি। খেলাপি ঋণ কমানো, দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যকর নজরদারি এখন সময়ের দাবি।

তবে তারা মনে করেন, পুরো ব্যাংক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার মতো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি। বরং মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং গ্রাহকদের সঙ্গে বাস্তবভিত্তিক যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমান বাস্তবতায় প্রশ্নটি শুধু “ব্যাংক নাকি বাসা”—এত সরল নয়। বরং মূল প্রশ্ন হলো, “কোথায় কত টাকা রাখা হবে এবং কীভাবে ঝুঁকি কমানো যাবে।”

বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, বাসায় কিছু জরুরি নগদ রাখা যেতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়ের জন্য ব্যাংকিং ব্যবস্থার বিকল্প এখনো তৈরি হয়নি। তাই আতঙ্ক নয়, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্তই হতে পারে সবচেয়ে নিরাপদ পথ।

Facebook Comments Box
Advertise with us
Advertise with us
আরও
Advertise with us

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

রবিসোমমঙ্গলবুধবৃহশুক্রশনি
 
১০১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭৩০
৩১ 

ফলো করুন দেশবার্তা-এর খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক
মো: সামসুদ্দীন চৌধুরী
সম্পাদকীয় কার্যালয়