সোমবার ২রা নভেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৭ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম
মেঘনাতে জেলের জালে ধরা পড়া এক পাঙ্গাস বিক্রি হলো ৯ হাজার টাকা ৩ নভেম্বর সোলার এক্সপো উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শ্রমিক বিক্ষোভে বাতিল শ্রমমন্ত্রীর বিদেশ সফর পোশাক শ্রমিক আন্দোলন নিরসনে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে বৈঠক শুরু ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে ৬ ঘণ্টা পর যান চলাচল শুরু হয়েছে মেহেরপুরে ৩২ স্বর্ণের বারসহ ২ পাচারকারী আটক করেছে বিজিবি শ্রমিকদের চলমান আন্দোলনে, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নাশকতা, গ্রেপ্তার ১১ এআইয়ের ব্যবহার বাড়ছে, তবে তাকে ভালো কাজে ব্যবহার করতে হবে: খাদ্যমন্ত্রী এবার রিকশা চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্সের আওতায় আনা হবে চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়েছে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস ওয়ারিয়র
Advertise with us

৫০০ কোটি টাকার ধান পানিতে নষ্ট,পথে বসার শঙ্কায় লাখো কৃষক

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   রবিবার, ০৩ মে ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ১২২ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

৫০০ কোটি টাকার ধান পানিতে নষ্ট,পথে বসার শঙ্কায় লাখো কৃষক

অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জের হাওরে বোরো ধান ডুবে গিয়ে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কৃষকরা। দুই জেলায় অন্তত এক লাখ ১২ হাজারের বেশি কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এর মধ্যে সুনামগঞ্জে ১৬ হাজার হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে অন্তত ৩০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। আর কিশোরগঞ্জে নয় হাজার ৪৯ হেক্টর জমির ধান ডুবে অন্তত ২০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে কৃষকদের।

পাকা ধান নষ্ট হওয়ায় এসব কৃষকের পথে বসার উপক্রম হয়েছে। বিশেষ করে হাওরে এখন শুধুই হাহাকার। চোখের সামনে তলিয়ে গেছে কষ্টের ফসল। কীভাবে সংসার চালাবেন আর ঋণ পরিশোধ করবেন; তা নিয়ে চোখেমুখে অন্ধকার দেখছেন লাখো কৃষক। কেউ কেউ ডুবেচুবে ধান কাটলেও আশার আলো দেখছেন না।

সুনামগঞ্জে ৩০০ কোটি টাকার ধান নষ্ট

অতিবৃষ্টি ও উজানের ঢলে সুনামগঞ্জে ১৬ হাজার হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৮০ হাজারের বেশি কৃষক। ফলে পুরো হাওরজুড়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা ও হাহাকার দেখা দিয়েছে। বৃষ্টির মধ্যে বজ্রপাতে মৃত্যুর ভয়ে হাওরে ধান কাটতে যান না তারা।

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পাহাড়ি ঢলের পানির চাপে ফসলরক্ষা বাঁধ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কায় এখনও যে সামান্য ফসল হাওরে টিকে আছে, তা নিয়েও দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে কৃষকদের। কষ্ট করে ফলানো ফসল রক্ষায় হাওরপাড়ের কৃষক পরিবারগুলোর চোখেমুখে এখন শুধু উৎকণ্ঠা আর হতাশার ছাপ।

তাদের অভিযোগ, বিভিন্ন বাঁধ নির্মাণে অনিয়মের কারণে এগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে। যেকোনো সময় ভেঙে যেতে পারে। হাওরপাড়ের কৃষক ও বাঁধসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, পরিস্থিতি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, জেলার বিভিন্ন হাওরে ১৬ হাজার হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। এসব জমি থেকে অন্তত ৭৫ হাজার মেট্রিক টনের বেশি ধান উৎপাদনের আশা ছিল। প্রায় সব ফসলই নষ্ট হয়ে গেছে, যার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। প্রতি হেক্টরে পাঁচ জন করে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সবমিলিয়ে ১৬ হাজার হেক্টরে ৮০ হাজার কৃষক ফসল হারিয়েছেন।

জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার জানান, ভারতের চেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টির কারণে সীমান্ত নদী দিয়ে নেমে আসা পানিতে জেলার নদীগুলোর পানি বেড়েছে। ফলে হাওরের জলাবদ্ধ পানি নদীতে নামানোর সুযোগও সীমিত হয়ে পড়েছে। নদীর পানি ধনু হয়ে মেঘনায় নামতে শুরু করলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। তবে এতে অন্তত এক সপ্তাহ সময় লাগবে। এরপর হাওরের পানি নামা শুরু করবে।

এদিকে আবহাওয়া পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে এবং চেরাপুঞ্জি ও সুনামগঞ্জে আগামী আরও সাত দিন বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান তিনি। তাই ক্ষেতের পাকা ধান দ্রুত কাটতে কৃষকদের বলা হয়েছে।

ধান কাটার শ্রমিক আব্দুল খালেক বলেন, ‘ঝোড়ো বাতাস, বৃষ্টি ও বজ্রপাতের মধ্যে কোমর সমান পানিতে দাঁড়িয়ে ধান কাটা যায় না। শরীর হিম হয়ে আসে। এক ঘণ্টাও ধান কাটার সুযোগ নেই। শরীর ঠান্ডা হয়ে যায়। তখন হাত দিয়ে কাঁচি ধরা যায় না। এ অবস্থায় তলিয়ে থাকা ধানের বদলে অনেকের আঙুলে কেটে যায়।’

শনির হাওরের কৃষক রুবেল মিয়া জানান, কোমর সমান পানিতে নেমে নিজেরাই ধান কাটছেন। শ্রমিক সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। বেশি মজুরি দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। হারভেস্টার মেশিন জমিতে বেশি পানির কারণে কাজ করতে পারছে না। এ অবস্থায় বেশিরভাগ জমির ধান পচে নষ্ট হয়ে গেছে।

জেলা কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, জেলায় এবার ১৩৭টি হাওরে দুই লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন। যা পূরণ হওয়া সম্ভব নয়। হাওরে বোরো ধান কাটায় এখন কৃষকরা হারভেস্টার মেশিনের ওপর বেশি নির্ভর করেন। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে হাওরে পানি থাকায় অনেক স্থানে মেশিন চালানো যাচ্ছে না। পানি না নামলে আরও জমির ধান পচে নষ্ট হবে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত উপপরিচালক মো. ওমর ফারুক বলেন, ‘জেলার ছোট-বড় ১৩৭টি হাওরের ১৬ হাজার হেক্টর জমির ধান তলিয়ে গেছে। ইতিমধ্যে এসব ক্ষেতের পাকা ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেছে। শনিবার পর্যন্ত এক লাখ ৩২ হাজার ৪১৮ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে।’

কিশোরগঞ্জে ২০০ কোটি টাকার ধান ক্ষতিগ্রস্ত

কিশোরগঞ্জে গত দুদিন আবহাওয়া কিছুটা ভালো থাকলেও সোমবার সকাল থেকে আবার শুরু হয়েছে বৃষ্টিপাত। এ ছাড়া উজানের ঢল অব্যাহত থাকায় গত ২৪ ঘণ্টায় হাওরাঞ্চলের নদ-নদীর পানি বেড়ে গেছে। বৃষ্টি ও উজানের ঢলে নতুন করে আরও দুই হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান তলিয়ে গেছে। সবমিলিয়ে নয় হাজার ৪৫ হেক্টর জমির ধান পানির নিচে চলে গেছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর জানায়, বৃষ্টি ও ঢলে শনিবার বিকাল পর্যন্ত নয় হাজার ৪৫ হেক্টর জমির ধান পানির নিচে চলে গেছে। এতে অন্তত ৩২ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বেশি ক্ষতি হয়েছে বিশেষ করে গত দুই দিনে ইটনা উপজেলার হাওরে। সেখানে দুদিনে প্রায় তিন হাজার হেক্টর জমির ধান তলিয়ে গেছে। প্রতি পাঁচ হাজার হেক্টরে গড়ে ২৫ হাজার মেট্রিক টন পর্যন্ত ধান উৎপাদনের আশা ছিল। প্রায় সব ফসলই পানিতে নষ্ট হয়ে গেছে। হিসাবে নয় হাজার ৪৫ হেক্টরে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২০০ কোটি টাকা।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মোহাম্মদ সাদিকুর রহমান শনিবার সন্ধ্যায় বলেন, ‘এবার হাওরে বোরো আবাদ হয়েছে এক লাখ ৪ হাজার ৫৮১ হেক্টর জমিতে। শনিবার বিকাল পর্যন্ত মাঠপর্যায়ের তথ্যমতে, নয় হাজার ৪৫ হেক্টর জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। এর মধ্যে ইটনা ও অষ্টগ্রাম উপজেলায় ক্ষতির পরিমাণ বেশি। যার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৯০ থেকে ২০০ কোটি টাকা।’

তিনি বলেন, ‘প্রকৃতির ওপরে তো কারও হাত নেই। তবে বৃষ্টিপাত ও উজানের পানি না বাড়লে ক্ষতি কিছুটা হলেও কমবে। এ ছাড়া আমরাও জেলা প্রশাসনের সহায়তায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা তৈরি করছি। সরকারের পক্ষ থেকে আগামী তিন মাস তাদের জন্য বিশেষ সহায়তার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।’

নিকলী আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা যায়, শনিবার সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত ৪৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। তবে সামনে আরও কয়েকদিন থেমে থেমে বৃষ্টি ও কালবৈশাখী ঝড় হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এ সময় কৃষকদের ধান কাটায় সাবধানতা বজায় রাখতে বলা হয়েছে।

কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘জেলার অধিকাংশ নদ-নদীর পানি বেড়েছে। ইটনা পয়েন্টে ধনু-বৌলাই নদীর পানি ৩.০৬, চামড়াঘাটে মেঘনা নদীর পানি ২.৭৩ এবং অষ্টগ্রামের কালনী নদীর পানি ২.৪৫ মিটার বেড়েছে। তবে ভৈরব বাজার পয়েন্টে মেঘনার পানি কিছুটা কমে ১.৮০ মিটারে নেমেছে, যা গতকালের তুলনায় ৭ সেন্টিমিটার কম। এখনও সবকটি নদীর পানি বিপদসীমার নিচ দিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ১০৯ থেকে ৪০০ সেন্টিমিটার নিচে রয়েছে। তবে বৃষ্টিপাত ও উজানের ঢল অব্যাহত থাকলে নদীর পানি আরও বাড়তে পারে।’

ইটনা উপজেলার কৃষক মতি মিয়া বলেন, ‘আমার প্রায় সব ধান পানির নিচে। দুদিন বৃষ্টি ছিল না। তাই কিছু অংশ কাটতে পেরেছি। কিন্তু শনিবার বৃষ্টি ও বজ্রপাতের ভয়ে আর ধান কাটতে পারিনি।’

Facebook Comments Box
Advertise with us
Advertise with us
আরও
Advertise with us

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

রবিসোমমঙ্গলবুধবৃহশুক্রশনি
 ১২
৩৪৫৭৮৯
১০১১১১৩৪১৫১৬
১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৯৩০
৩১ 

ফলো করুন দেশবার্তা-এর খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক
মো: সামসুদ্দীন চৌধুরী
সম্পাদকীয় কার্যালয়