সোমবার ৬ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম
শনিবারের মধ্যে সব ক্লিনিকে লেবার রুম স্থাপন না করলে লাইসেন্স বাতিল: স্বাস্থ্যমন্ত্রী কক্সবাজারে পাহাড়ধসের বিভীষিকা, একরাতেই প্রাণ গেল ৯ জনের জনগণের বিশ্বাস ও ভালোবাসার ওপর নির্ভরতা বজায় রাখতে চাই: প্রধানমন্ত্রী সরকারি অনুষ্ঠানের ব্যানার-বিলবোর্ডে প্রধানমন্ত্রীর থ্রিডি ছবি ব্যবহার নিষিদ্ধ শাহ আমানতে কার্গো ফ্লাইট চালুর উদ্যোগে ভাটা পড়েছে জুলাই অভ্যুত্থানে হতাহতদের ন্যায়বিচার এদেশের মাটিতেই হবে : প্রধানমন্ত্রী বেনাপোল কাস্টম হাউসে ৪ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা রাজস্ব ঘাটতি জুলাই-আগস্টে দেশে রয়েছে বন্যার আশঙ্কা রংপুরে সড়ক দুর্ঘটনা: দাদা-বাবার ১০ ঘণ্টা পর না ফেরার দেশে চলে গেল বন্ধন রপ্তানি আয়ে লক্ষ্য পূরণ হয়নি,কমেছে আয়
Advertise with us

চীনে বাংলাদেশের রপ্তানিতে বড় লাফ

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ১৫ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

চীনে বাংলাদেশের রপ্তানিতে বড় লাফ

দেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয় কমলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চীনের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানিতে বড় উল্লম্ফন হয়েছে। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চীনে রপ্তানি বেড়ে ৮২১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১৮ দশমিক ২৪ শতাংশ বেশি।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) সূত্রে জানা যায়, গত পাঁচ অর্থবছরের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ রপ্তানি আয়। ২০২১-২২ অর্থবছরে যেখানে রপ্তানি ছিল ৬৮৩ মিলিয়ন ডলার, সেখানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে ৮২১ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ, পাঁচ বছরে মোট ১৩৮ মিলিয়ন ডলার বা ২০ দশমিক ১৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে।

২০২৫–২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের অর্থবছরের ৪৮ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলার থেকে ০ দশমিক ৫৮ শতাংশ কম।

বিশ্লেষকদের মতে, চীনের বাজারে তৈরি পোশাক, নিটওয়্যার, চামড়াজাত পণ্য, কৃষিপণ্য ও পাটজাত পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি, শুল্ক-সুবিধার কার্যকর ব্যবহার, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি ও নতুন ক্রেতা যুক্ত হওয়ায় এই প্রবৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে। এছাড়া রপ্তানিকারকদের মানোন্নয়ন ও প্রতিযোগিতামূলক মূল্য নির্ধারণও ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে।

তবে চীনের বাজারের বিশাল আকার ও শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধার কথা বিবেচনা করলে বাংলাদেশের বর্তমান রপ্তানির পরিমাণ এখনো খুবই কম। ফলে এ বাজারে রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর জন্য রয়েছে বিপুল সম্ভাবনা ও সুযোগ।

দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য

বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চীন থেকে বাংলাদেশ ১ হাজার ৮২০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে।

আর রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বলছে, একই সময়ে চীনে বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ ছিল মাত্র ৬৯ কোটি ৪৫ লাখ ডলার। ফলে দুই দেশের মধ্যে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭৫১ কোটি ডলারে।

চীনা বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের শতভাগ শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার রয়েছে। ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে এ সুবিধা কার্যকর হয়। এর আগে ২০২০ সালে বাংলাদেশের ৯৭ শতাংশ পণ্য এ সুবিধার আওতায় ছিল।

বাংলাদেশের শিল্প ও উৎপাদন তথা কাঁচামালের অন্যতম প্রধান উৎস চীন। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পে ব্যবহৃত ওভেন কাপড়, সুতা, রাসায়নিকসহ বিভিন্ন কাঁচামালের বড় অংশই আসে দেশটি থেকে।

এছাড়া শিল্পযন্ত্র আমদানির বড় অংশ ও নানাবিধ পণ্য আমদানি করা হয় চীন থেকে। দেশের মোট আমদানির ২৫ শতাংশেরও বেশি আসে দেশটি থেকে। তবে দেশটিতে বাংলাদেশের রপ্তানি খুবই কম এবং বিলিয়ন ডলারের নিচে।

রপ্তানি বৃদ্ধি ইতিবাচক সংকেত

বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিসিআই) সভাপতি মোহাম্মদ খোরশেদ আলম জাগো নিউজকে বলেন, চীনে বাংলাদেশের রপ্তানি ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রপ্তানি বেড়ে প্রায় ৮২ কোটি ১০ লাখ ডলারে পৌঁছেছে, যা ইতিবাচক সংকেত দেয়।’

তবে চীন থেকে বাংলাদেশের প্রায় ১৯ বিলিয়ন ডলারের আমদানির তুলনায় এই রপ্তানি এখনো খুবই সামান্য বলে মনে করেন তিনি।

চীন বাংলাদেশের জন্য শতভাগ শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা দিয়েছে উল্লেখ করে খোরশেদ আলম বলেন, ‘এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই সুবিধার কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা। এজন্য চীনের বাজারে কোন পণ্যের চাহিদা রয়েছে, কোন খাতে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতামূলক হতে পারে- এসব বিষয়ে নিয়মিত বাজার গবেষণা, ব্যবসায়িক জরিপ ও তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা প্রয়োজন।’

তার মতে, শুধু শুল্ক-সুবিধা পেলেই রপ্তানি বাড়ে না। চীনের বিভিন্ন প্রদেশে রোডশো, বাণিজ্য মেলা, ক্রেতা-বিক্রেতার সরাসরি (বি-টু-বি) বৈঠক ও পণ্যের সক্রিয় প্রচারণা চালাতে হবে।

‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডকে চীনা ভোক্তাদের কাছে পরিচিত করতে দীর্ঘমেয়াদি বিপণন কৌশল গ্রহণেরও তাগিদ দেন তিনি।

বিসিসিসিআই সভাপতি জানান, বিসিসিসিআই চীনের বিভিন্ন শহরে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ নামে স্থায়ী প্রদর্শনী ও বিক্রয়কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছে। এসব কেন্দ্রের মাধ্যমে বিভিন্ন বাংলাদেশি পণ্যের বাজার যাচাই, ক্রেতাদের পছন্দ বোঝা ও সম্ভাবনাময় পণ্য শনাক্ত করা সহজ হবে।

খোরশেদ আলম বলেন, সরকার ও বেসরকারি খাত সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে চীনে বাংলাদেশের রপ্তানি অন্তত ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব।

‘রপ্তানি ঝুড়ি এখনো বৈচিত্র্যপূর্ণ নয়’

এই প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক বার্তা হলেও এটিকে স্থায়ী করতে হবে। শুধু তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভর না করে উচ্চ মূল্য সংযোজিত পণ্য, কৃষি-প্রক্রিয়াজাত পণ্য, ওষুধ ও প্রকৌশল পণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে চীনের বাজারে ভোক্তাদের চাহিদা অনুযায়ী নতুন পণ্য উন্নয়ন ও ব্র্যান্ডিং কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, চীনের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও তা এখনো সম্ভাবনার তুলনায় অত্যন্ত সীমিত। সবশেষ তথ্যে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাইরে নন-ট্রাডিশনাল বাজার হিসেবে চীনে রপ্তানি কিছুটা বাড়ছে, যা একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

চীনে বাংলাদেশের রপ্তানির বড় অংশই মূলত তৈরি পোশাক খাতনির্ভর। তবে অন্য পণ্যের অংশগ্রহণ এখনো সীমিত, ফলে রপ্তানি ঝুড়ি এখনো বৈচিত্র্যপূর্ণ নয় বলে মনে করেন গোলাম মোয়াজ্জেম।

মোয়াজ্জেমের মতে, চীনের মতো বিশাল বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানির সম্ভাবনা অনেক বেশি হলেও বাস্তবে অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম। এর প্রধান কারণ বিদ্যমান বাণিজ্য শর্তাবলি, যা অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য অনুকূল নয়। বিশেষ করে রুলস অব অরিজিন, ন্যাশনাল ট্রিটমেন্ট ও বিভিন্ন নন-ট্যারিফ বাধা রপ্তানি সম্প্রসারণে চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

যদি দুই দেশ আলোচনার মাধ্যমে বাণিজ্য শর্তগুলো আরও সহজ ও নমনীয় করতে পারে, তাহলে চীনে বাংলাদেশের রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

এজন্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) বা অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য কাঠামো নিয়ে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ ও নীতিগত সমন্বয় জোরদার করা প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

তার মতে, নীতিগত বাধা দূর করতে পারলে এবং বাজার প্রবেশের শর্তগুলো সহজ হলে চীনের বাজার বাংলাদেশের জন্য একটি বড় রপ্তানি গন্তব্যে পরিণত হতে পারে।

যা করা প্রয়োজন

খাত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চীনের বিশাল বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানির সম্ভাবনা থাকলেও সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে কয়েকটি ক্ষেত্রে সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

প্রথমত, শুধু স্বল্পমূল্যের প্রচলিত পণ্যের ওপর নির্ভর না করে উচ্চ মূল্য সংযোজিত ও প্রযুক্তিনির্ভর পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে হবে। এতে রপ্তানির বহুমুখীকরণ হবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে।

কৃষি ও খাদ্যপণ্যের রপ্তানি বাড়াতে হলে আন্তর্জাতিক মান, খাদ্যনিরাপত্তা এবং স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি (এসপিএস) শর্ত কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। এসব মান পূরণ করতে না পারলে চীনের মতো বড় বাজারে প্রবেশ ও অবস্থান ধরে রাখা কঠিন হবে।

বন্দর, কাস্টমস ও লজিস্টিকস ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানোও অত্যন্ত জরুরি। পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতা, পরিবহন ব্যয় ও সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা কমানো গেলে রপ্তানিকারকদের খরচ কমবে এবং সময়মতো পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

চীনা আমদানিকারক, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। শুধু এককালীন রপ্তানির পরিবর্তে স্থায়ী ব্যবসায়িক সম্পর্ক তৈরি করা গেলে বাংলাদেশের পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ ও রপ্তানি প্রবৃদ্ধি টেকসই হবে।

সবশেষে বাংলাদেশকে দেওয়া শতভাগ শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য কূটনীতি ও সরকারি সহায়তার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।

সরকারি-বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে নতুন পণ্যের বাজার সৃষ্টি, বাণিজ্য প্রচার কার্যক্রম জোরদার ও চীনের বাজার সম্পর্কে উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করেন খাত সংশ্লিষ্টরা।

Facebook Comments Box
Advertise with us
Advertise with us
আরও
Advertise with us

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

রবিসোমমঙ্গলবুধবৃহশুক্রশনি
 
১০১১
১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭৩০৩১ 

ফলো করুন দেশবার্তা-এর খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক
মো: সামসুদ্দীন চৌধুরী
সম্পাদকীয় কার্যালয়