
নিজস্ব প্রতিবেদক | বুধবার, ২৫ মার্চ ২০২৬ | প্রিন্ট | ৬৪ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

মধ্যপ্রাচ্যের টানা যুদ্ধে এলোমেলো দেশের জ্বালানি আমদানির সূচি। যুদ্ধ শুরুর পর এখন পর্যন্ত জ্বালানি তেল ও গ্যাসবোঝাই ২৫টি জাহাজ নোঙর করেছে চট্টগ্রাম বন্দরে। পাইপলাইনে আছে আরও পাঁচটি। সামনের পাঁচ দিনে এসব জাহাজ বন্দরে নোঙর করলেও মার্চেই ঘাটতি থাকবে চাহিদার অর্ধেক। বিকল্প উৎস থেকে আমদানির পাশাপাশি বর্তমান মজুত দিয়ে মার্চে কোনো রকম সামাল দেওয়া গেলেও জ্বালানি তেল ও গ্যাস নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়বে এপ্রিল ও মে মাসে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) আগামী দুই মাসের জন্য আগাম পরিকল্পনা নিয়েছে। তবে তারা এখন পর্যন্ত নিশ্চিত করতে পেরেছে চাহিদার মাত্র এক-চতুর্থাংশ তেল।
চলতি মার্চে ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল নিয়ে ১৭টি জাহাজ আসার কথা ছিল। তবে গত ২৪ দিনে এসেছে আটটি; যেগুলোতে তেল ছিল মাত্র দুই লাখ টন। মোট ৫১ হাজার টন ডিজেল বোঝাই আরও তিনটি জাহাজ আছে পাইপলাইনে। কিন্তু অনিশ্চয়তায় পড়েছে দেড় লাখ টন জ্বালানি তেলের বাকি ছয়টি জাহাজ। অভিন্ন চিত্র আছে এলপিজি নিয়েও। চলতি মাসে ৯টি এলপিজি বোঝাই জাহাজ আসার কথা থাকলেও এসেছে মাত্র পাঁচটি। প্রায় আড়াই লাখ টনের চারটি এলপিজির জাহাজ পড়েছে অনিশ্চয়তায়।
নতুন পরিকল্পনায় বিপিসি
ঘাটতি কমাতে আগামী এপ্রিলের জন্য প্রাথমিক আমদানি সূচি তৈরি করেছে বিপিসি। সমুদ্রপথে এপ্রিলে ১৪টি জাহাজ এবং পাইপলাইনে তিনটি পার্সেলের মাধ্যমে মোট তিন লাখ টন ডিজেল, ৫০ হাজার টন জেট ফুয়েল, ২৫ হাজার টন অকটেন এবং ৫০ হাজার টন ফার্নেস তেল আমদানির পরিকল্পনা করেছে তারা। তবে এখন পর্যন্ত জাহাজে করে মাত্র এক লাখ ১০ হাজার টন ও পাইপলাইনে ২০ হাজার টন ডিজেল পাওয়ার নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে। এটি চাহিদার এক-চতুর্থাংশ হলেও মে মাসের জন্য মেলেনি এমন নিশ্চয়তা।
খোঁজা হচ্ছে বিকল্প উৎস
এলএনজি ও এলপিজির ঘাটতি মেটাতে খোঁজা হচ্ছে বিকল্প উৎস। মধ্যপ্রাচ্যের দরজা বন্ধ থাকায় মালয়েশিয়া থেকে একটি এলপিজি ও ইন্দোনেশিয়া থেকে বেশি দামে কেনা হচ্ছে একটি এলএনজি বোঝাই জাহাজ। আগামী পাঁচ দিনে এসব জাহাজ নোঙর করলে মার্চের পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে বাংলাদেশ। জ্বালানির যে মজুত আছে, তা দিয়ে পার করা যাবে মধ্য এপ্রিল পর্যন্ত। এর মধ্যে বিকল্প উৎস থেকে পর্যাপ্ত তেল ও গ্যাসবোঝাই জাহাজ না এলে এপ্রিলের শেষ প্রান্তিকে ও মে মাসে দেশে ভোগান্তি বাড়বে।
এসেছে ২৫ জাহাজ
চট্টগ্রাম বন্দরের ‘ভেসেল অ্যারাইভাল লগ’ অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ২৫টি জাহাজের পণ্য খালাস করেছে তারা। এর মধ্যে এলপিজি বোঝাই ছয়টি, এলএনজির সাতটি, গ্যাস অয়েলের ছয়টি, এইচএসএফও বোঝাই তিনটি, বেস অয়েলের একটি, ক্রুড অয়েলের একটি ও এমইজি বোঝাই জাহাজ ছিল একটি। এর মধ্যে কাতার, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের জাহাজ ছিল মাত্র ৯টি। তবে এগুলো যুদ্ধ শুরুর আগেই হরমুজ প্রণালি পার হতে পেরেছিল। যুদ্ধ শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্য থেকে কোনো জাহাজ আসেনি বাংলাদেশে।
বুকিং থাকার পরও আসেনি জাহাজ
বিপিসি জানায়, চীনের ইউনিপেক ও মালয়েশিয়ার পেটকো ট্রেডিং বিপিসির বড় দুই সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান। তারা বলছে, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে নির্ধারিত সময় মেনে তেল সরবরাহ করতে পারছে না। মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে অপরিশোধিত তেলের চাহিদাও অর্ধেক পূরণ হয়নি। ৩ মার্চ সৌদি আরবের রাস তানুরা টার্মিনাল থেকে এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল আনার কথা থাকলেও জাহাজটি আটকে আছে হরমুজ প্রণালিতে। আবার আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি (অ্যাডনক) থেকে তেল আনার জন্য ভাড়া করা ‘এমটি ওমেরা গ্যালাপি’ নামে জাহাজটির চুক্তিও বাতিল হয়েছে। এ জন্য চলতি মাসে অপরিশোধিত তেলের নতুন কোনো চালান দেশে আর আসছে না।
হরমুজ প্রণালিতে বাধা পাওয়ায় বুকিং থাকার পরও মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসতে পারছে না চার জাহাজ এলএনজি। ‘লিব্রেথা’ নামে একটি জাহাজ এলএনজি লোড করার পরও আসতে পারছে না চট্টগ্রামে। ‘ওয়াদি আল সেইল’ নামে আরেকটি জাহাজ এলএনজি লোড করার জন্য হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে যেতে পারছে না টার্মিনালে।
জ্বালানি তেলের চাহিদা কত
বিপিসির হিসাবে, দেশে বছরে ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়। এর মধ্যে প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল, যা মূলত সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আসে। মোট চাহিদার ২০ শতাংশ অপরিশোধিত আকারে এনে দেশে পরিশোধন করা হয়, বাকি ৮০ শতাংশ পরিশোধিত অবস্থায় আমদানি করা হয়। যুদ্ধের কারণে এই সরবরাহ ব্যবস্থা এলোমেলো হয়ে গেছে।
যা বলছেন দায়িত্বশীলরা
বিপিসির মহাব্যবস্থাপক মুহাম্মদ মোরশেদ হোসাইন (বাণিজ্য ও অপারেশন) বলেন, ঘাটতি পোষাতে ভারত থেকে পাইপলাইনে ১০ হাজার টন তেল এনেছে বিপিসি। আরও পাঁচ হাজার টন আসবে চলতি মাসে। ডিজেল বোঝাই আরও তিনটি জাহাজ আসবে আগামী পাঁচ দিনে। এসব জাহাজের প্রতিটিতে আছে ২৭ হাজার টন ডিজেল। তিনি জানান, অপরিশোধিত তেল নিয়ে সমস্যা বেশি হলেও এপ্রিলে সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে ২৫ সেন্ট বেশি খরচ করে এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল আনার নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে।
এলএনজি আমদানির স্থানীয় প্রতিনিধি প্রতিষ্ঠান ইউনি গ্লোবাল বিজনেস লিমিটেডের সিনিয়র ডিজিএম মো. নুরুল আলম বলেন, যুদ্ধ শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্য থেকে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে এলএনজি বোঝাই কোনো জাহাজ দেশে আসেনি। যে চারটি জাহাজ মধ্যপ্রাচ্য থেকে এলএনজি এনেছে, সেগুলো যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ প্রণালি পার হয়েছিল। বিকল্প উৎস থেকে একটি এলএনজি ও একটি এলপিজি বোঝাই জাহাজ আসবে আগামী পাঁচ দিনে। এর একটি আসবে মালয়েশিয়া থেকে। আরেকটি আসবে ইন্দোনেশিয়া থেকে।
