
নিজস্ব প্রতিবেদক | রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬ | প্রিন্ট | ২০ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দরে আমদানিকৃত পণ্য খালাস ও পরিবহনে নানা জটিলতায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। ওয়্যারহাউজ না থাকা, শুল্কায়ন প্রক্রিয়া ও নথিপত্র যাচাইয়ে বিলম্ব, ট্রাক টার্মিনালের অভাব, ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত ট্রাকজট, লোড-আনলোডে ধীরগতি, শ্রমিক সংকট, স্থানীয় চাঁদাবাজি, শ্রমিক ও পরিবহন ধর্মঘটসহ নানা কারণে বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
এছাড়া বাংলাদেশ ও ভারতের কাস্টমস নীতিমালার অমিলের কারণেও পণ্য পরিবহনে ধীরগতি দেখা দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ভোমরা স্থলবন্দর সম্ভাবনাময় হলেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধার অভাবে বন্দরের কার্যক্রম কাঙ্ক্ষিত গতি পাচ্ছে না। একটি পণ্য বন্দরে আসার পর দ্রুত খালাস না হলে অতিরিক্ত ট্রাকভাড়া, শ্রমিক খরচ, বন্দর চার্জসহ নানা ব্যয় বেড়ে যায়। এতে ব্যবসায়ীরা লোকসানের মুখে পড়ছেন। ফলে অনেক আমদানিকারক ভোমরা বন্দর ছেড়ে অন্য বন্দরের দিকে ঝুঁকছেন।
ভোমরা স্থলবন্দরের আমদানিকারক আনোয়ার হোসেন বলেন, ভোমরা স্থলবন্দর সম্ভাবনাময় একটি বন্দর হলেও দীর্ঘদিন ধরে নানা অব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোগত সংকটে এখানকার ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাহত হচ্ছে। বন্দরে পর্যাপ্ত ওয়্যারহাউজ না থাকা, পণ্য খালাসে ধীরগতি, ট্রাক রাখার জায়গার সংকট, লোড-আনলোডে শ্রমিক সমস্যা- সব মিলিয়ে আমদানিকারকদের প্রতিনিয়ত ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
তিনি বলেন, একটি পণ্য বন্দরে আসার পর দ্রুত খালাস না হলে ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত খরচ গুনতে হয়। এতে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এবং অনেকেই এই বন্দর ব্যবহারে আগ্রহ হারাচ্ছেন। বন্দরের সার্বিক উন্নয়ন, কাস্টমস কার্যক্রমে গতি এবং আধুনিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে ভোমরা বন্দরের মাধ্যমে আবারো ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি ফিরবে।
আরেক আমদানিকারক মো. মোহসিন বলেন, ভোমরা বন্দর দিয়ে আমদানি কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো এখানে পণ্য খালাসে নানা জটিলতা ও অতিরিক্ত খরচ। ব্যবসায়ীরা যেখানে দ্রুত পণ্য খালাস, কম খরচ ও সহজ প্রক্রিয়া পাবেন, স্বাভাবিকভাবেই সেখানে যেতে চাইবেন। কিন্তু ভোমরায় ট্রাকজট, শ্রমিক সংকট, লোড-আনলোডে বিলম্ব, কাস্টমস ও নথিপত্র যাচাইয়ে সময়ক্ষেপণসহ নানা কারণে ব্যবসায়ীদের ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে। এ কারণে অনেক আমদানিকারক অন্য বন্দরের দিকে ঝুঁকছেন।
তিনি দাবি করেন, বন্দরে আধুনিক স্ক্যানিং ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত ওয়্যারহাউজ, ট্রাক টার্মিনাল, শ্রমিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং কাস্টমস কার্যক্রমে দ্রুততা আনতে পারলে ব্যবসায়ীরা আবার এই বন্দর ব্যবহারে আগ্রহী হবেন।
ভোমরা বন্দরের শীর্ষ আমদানি-রপ্তানিকারক দীপঙ্কর ঘোষ জানান, ভোমরা বন্দরে এখন সবচেয়ে জরুরি হলো আধুনিকায়ন। অটোমেশন চালু না থাকায় এখনও অনেক কাজ ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে করতে হচ্ছে, এতে সময় বেশি লাগছে। পণ্য খালাসের জন্য আধুনিক ক্রেনের অভাব রয়েছে, ট্রাক রাখার জন্য পর্যাপ্ত শেড নেই, ফায়ার সার্ভিস, আবাসিক ব্যবস্থা ও চিকিৎসা সুবিধারও ঘাটতি রয়েছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থলবন্দরে এসব মৌলিক সুবিধা না থাকলে ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বাভাবিক গতি ধরে রাখা কঠিন।
তিনি মনে করেন, দ্রুত অটোমেশন চালু, আধুনিক ক্রেন স্থাপন, ট্রাক শেড নির্মাণ, নিরাপত্তা ও জরুরি সেবা নিশ্চিত করা গেলে পণ্যজট কমবে। এতে ব্যবসায়ীদের আস্থা ফিরবে এবং বন্দরের রাজস্ব আয়ও বাড়বে।
তিনি আরও বলেন, ব্যবসায়ীদের দাবি বেনাপোল বা নাভারণ থেকে সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দর পর্যন্ত নতুন রেললাইন স্থাপন করা গেলে এ বন্দরের পণ্য পরিবহনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। রেলপথে পণ্য পাঠানোর সুযোগ হলে পরিবহন ব্যয় কমবে, সময় সাশ্রয় হবে এবং পণ্যজট অনেকাংশে কমে যাবে। এতে ভোমরা বন্দরের ব্যবসায়িক গতি ও রাজস্ব আয় দুটোই বাড়বে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভোমরা বন্দরে ব্যবসার খরচ তুলনামূলক বেশি। অন্য বন্দরে কিছু পণ্যে ছাড় বা সুবিধা থাকলেও ভোমরায় সে ধরনের সুবিধা নেই। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ট্রাকভাড়া, শ্রমিক খরচ ও বন্দর খরচ। এতে কাঁচা পণ্যসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানিতে ব্যবসায়ীদের ঝুঁকি আরও বাড়ছে।
ভোমরা বন্দরের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট শাহিনুর ইসলাম বলেন, দেশের অন্য অনেক বন্দরে কাঁচা পণ্যসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানিতে ব্যবসায়ীরা কিছু ছাড় বা সুবিধা পান। কিন্তু ভোমরা বন্দরে ব্যবসায়ীরা সে ধরনের সুবিধা পাচ্ছেন না। এর ওপর ট্রাকভাড়া বেশি, শ্রমিক খরচ বেশি, বন্দর খরচও তুলনামূলক বেশি।
তিনি বলেন, সব মিলিয়ে অনেক সময় ব্যবসায়ীদের লোকসান গুনতে হচ্ছে। ব্যবসা করে যদি লাভের পরিবর্তে ক্ষতির মুখে পড়তে হয়, তাহলে আমদানিকারকরা স্বাভাবিকভাবেই অন্য বন্দরের দিকে চলে যাবেন। ভোমরা বন্দরকে টিকিয়ে রাখতে হলে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে, খরচ কমাতে হবে এবং পণ্য খালাসে দ্রুততা নিশ্চিত করতে হবে।
ভোমরা বন্দর আমদানি-রপ্তানিকারক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি রামকৃষ্ণ চক্রবর্তী বলেন, ভোমরা বন্দরের বর্তমান পরিস্থিতি শুধু ব্যবসায়ীদের জন্য নয়, সরকারের রাজস্ব আয়ের জন্যও উদ্বেগজনক। বাণিজ্য খাতে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, তা কাটাতে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। বর্তমানে ব্যবসা-বাণিজ্যে চরম মন্দাভাব চলছে।
তিনি আরও বলেন, আমদানি-রপ্তানি কমে যাওয়ায় রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, বিনিয়োগ কমছে, কর্মসংস্থানের সুযোগও সংকুচিত হচ্ছে। ব্যবসায়ী সম্প্রদায় কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের টানাপোড়েনের প্রভাবেও আগের তুলনায় বাণিজ্য কমে গেছে। ফলে সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। আমরা চাই, দ্রুত নীতিগত সিদ্ধান্ত ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে ভোমরা বন্দরের বাণিজ্যিক পরিবেশ স্বাভাবিক করা হোক।
ভোমরা বন্দরের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আবু মুসা জাগো নিউজকে জানান, ভোমরা বন্দরের ব্যবসায়ীরা এখন বর্তমান সরকারের দিকে আশাবাদ নিয়ে তাকিয়ে আছেন। তাদের বিশ্বাস, সরকার বাণিজ্যের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।
তিনি বলেন, এই বন্দরে ব্যবসার বিশাল সম্ভাবনা আছে, কিন্তু অবকাঠামোগত সংকট, পণ্য খালাসে বিলম্ব, অতিরিক্ত খরচ ও নানা প্রশাসনিক জটিলতার কারণে সেই সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। দ্রুত ওয়্যারহাউজ, ট্রাক টার্মিনাল, আধুনিক যন্ত্রপাতি, অটোমেশন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে ভোমরা বন্দর আবারও সচল হয়ে উঠবে। এতে ব্যবসায়ীরা লাভবান হবেন, শ্রমিকদের কর্মসংস্থান বাড়বে এবং সরকারের রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধি পাবে।
এ বিষয়ে ভোমরা কাস্টমস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো কর্মকর্তা বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
তবে ভোমরা বন্দরের সহকারী পরিচালক (ট্রাফিক) মো. আতিকুল ইসলাম জানান, বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে প্রায় ১১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে উন্নয়নকাজ চলমান রয়েছে। এরই মধ্যে নতুন করে জমি অধিগ্রহণ ও বালু ভরাটের কাজ শেষ হয়েছে। অর্থছাড় সংক্রান্ত জটিলতায় কিছু কাজ থমকে আছে। তবে ওয়্যারহাউজসহ নতুন কিছু অবকাঠামোর কাজ দ্রুত শুরু হবে।
তিনি বলেন, এসব উন্নয়নকাজ সম্পন্ন হলে বন্দরে পণ্য খালাসে আর বড় ধরনের সমস্যা থাকবে না। ব্যবসায়ীরা আরও সহজে ও দ্রুত পণ্য আমদানি-রপ্তানি করতে পারবেন। আমরা আশা করছি, চলমান উন্নয়ন প্রকল্প শেষ হলে ভোমরা বন্দরের কার্যক্রমে গতি আসবে এবং ব্যবসায়ীরা এর সুফল পাবেন।
